একাত্তরের বিজয়ের মাস ও ২০২২-এর বাস্তবতা

মতামত

স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের দৃঢ়তায় যেকোনো অপশক্তির ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা পর্যন্ত নতুন প্রজন্মের রাজনীতিসচেতন তরুণদের এগিয়ে আসার শিক্ষা ও প্রেরণা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

আমাদের মহান স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস পৃথিবীর অন্যান্য স্বাধীনতা লাভকারী রাষ্ট্র ও জাতিসমূহের সঙ্গে হুবহু মেলানো যাবে না। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের ধাপ যেমন অনেক, এর গৌরবময় এবং সীমাহীন আত্মত্যাগের ঘটনাবলিও অনেক ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য। এই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষিত হওয়ার আগে থেকেই শুধু স্বাধীনতাকামী মানুষই সংগঠিত হয়েছিল তা নয়, সারা পৃথিবীর গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের দৃষ্টি এই ছোট্ট ভূখণ্ডের ওপর নিবদ্ধ হতে থাকে। অবশেষে বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত স্বাধীনতার প্রতি সারা বিশ্বের শক্তিসমূহের সমর্থন উচ্চারিত হতে থাকে। গোটা বিশ্ব যেন এই রাষ্ট্রের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার কথা শুনতে পাচ্ছিল। সেটি ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। এর বিরুদ্ধেও কোনো কোনো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রও ছিল। ৯ মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শেষে আমরা যে স্বাধীন একটি রাষ্ট্রের বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হব, সেটি প্রথমে কিছুটা অনিশ্চিত থাকলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আত্মত্যাগ, সংগ্রাম, যুদ্ধ পরিচালনা, সরকারব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিকভাবে গণতান্ত্রিক শক্তির সমর্থন ক্রমেই মুক্তিযুদ্ধের শক্তিকে বলীয়ান করতে থাকে। অবশেষে ডিসেম্বরের আগেই অনেকটা নিশ্চিত হওয়া যায় যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয় খুবই আসন্ন। তবে তা ছিল অভ্যন্তরীণ রণনীতি, রণকৌশল, গণতান্ত্রিক শক্তির সম্মিলন এবং পরাশক্তির সব বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করার মতো প্রজ্ঞা ও দৃঢ়তা প্রদর্শন করার এক চূড়ান্ত সাহস, দেশপ্রেম, শৌর্য-বীর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ারও পর্ব। সেটি ডিসেম্বরের আগেই অনেকটা প্রস্তুত হতে থাকে।

ডিসেম্বরের শুরু থেকেই পাকিস্তানি বাহিনীকে ও তাদের সমর্থিত পরাশক্তিকে রণাঙ্গনে ও কূটনীতিতে পরাজিত করার এক অগ্রাভিযান পরিচালিত হয়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের সেই দিনগুলোর কথা এখন যখন জীবিতরা স্মরণ করেন আর আগ্রহী তরুণ প্রজন্ম দলিলপত্রে দেখতে পায়, তখন অবাক বিস্ময়ে ভাবতে হয়, কী অসম্ভবকেই না সেই সময় সম্ভব করে তুলেছিল। সেটি সম্ভব করা না গেলে বিজয় অর্জন করার আকাঙ্ক্ষা পূরণ হতো না, ঘোষিত স্বাধীনতা নিয়েও আমরা বিশ্বের বুকে আত্মপ্রকাশ করতে পারতাম না। ২৬ মার্চ তারিখে ঘোষিত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ধীরে ধীরে একটি বৈধ সরকারের নেতৃত্বে সুসংগঠিত হয়ে অবশেষে সর্বাত্মক বিজয় ডিসেম্বর মাসে নিশ্চিত হয়। সে কারণে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার ঘোষণা ও বিজয়লাভ এক সূত্রে গাঁথা হয়েছে। একাত্তরের ৯ মাসের প্রতিটি দিনক্ষণ আমাদের কেটেছিল একদিকে বীরত্ব ও আত্মত্যাগ, অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচার, নির্যাতন, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধ্বংস ইত্যাদিকে মোকাবিলা করে। এই ইতিহাস জাতির শৌর্য-বীর্যের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিকগুলোকেই ধারণ করে আছে। আমাদের জাতীয় জীবনের পথচলায় নানা উত্থান-পতন, বিপর্যয়, আশা-নিরাশা-হতাশা ইত্যাদির বিপরীতে যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে জনগণের ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য। সেই বিবেচনা থেকেই একাত্তরের শেষ কয়েক দিনের ঘটনাবলি নিয়ে বিজয়ের যে ডিসেম্বর আমরা পেয়েছিলাম, সেটি প্রতিবছরের ডিসেম্বরেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এর ঘটনাবলি স্মরণ করার মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম শুধু একাত্তরের ডিসেম্বরকেই অনুধাবন করবে না, তাদের সময়ের যেকোনো ডিসেম্বরকেও তারা মিলিয়ে দেখতে পারে, আত্মোপলব্ধির অবস্থান থেকে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষা নিতে পারে।

নভেম্বর মাসেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠিত হয়। ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে যৌথ বাহিনী গঠনেরও চুক্তি সম্পাদিত হয়। দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধারা তখন গেরিলাযুদ্ধ ও প্রশিক্ষিত বাহিনীর যুদ্ধ একযোগে চারদিক থেকে চালাতে থাকে। নভেম্বরের শেষ দিকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী একের পর রণাঙ্গনে পরাজিত হতে থাকে। বিশেষত ঠাকুরগাঁও, সিলেট, রংপুর, দিনাজপুর, খুলনা, রাজশাহী ও যশোর অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী, গেরিলা বাহিনী ও যৌথ বাহিনীর সহযোগিতায় বেশ কিছু অঞ্চল থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিতাড়িত হয়।

একই সঙ্গে হতাহতের তালিকার মধ্যেও পাকিস্তানি সেনাদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন দলিলে পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয় আসন্ন বলেও ঢাকা থেকে বার্তা পাঠানো হচ্ছিল। ১ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানি সৈন্য অপসারণই সমস্যার শ্রেষ্ঠ সমাধান।’ অন্যদিকে পাকিস্তান সরকারের মুখপাত্র জানান, ‘ভারত সংঘর্ষ তীব্রতর করে পাকিস্তানকে যুদ্ধের দিকে টেনে আনছে।’ ওই দিন সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ এম কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বেসামরিক সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তাঞ্চল পরিদর্শন করে। দেশের আরও কয়েকটি অঞ্চলে মুক্তাঞ্চল সৃষ্টি হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সেই সব মুক্তাঞ্চলে সাধারণ মানুষের ঘর থেকে বের হয়ে আসার খবর প্রচারিত হতে থাকে। তখন অবরুদ্ধ বাংলাদেশের ভেতরের মানুষ বুঝতে পেরেছিল যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থান দুর্বল হয়ে গেছে, মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান চারদিকেই শক্তিশালী হয়ে উঠতে শুরু করেছে। বলা চলে, ১ ডিসেম্বর মানুষ বিজয়ের বার্তা যেন চারদিক থেকে শুনতে থাকে এবং নতুন শিহরণে বিজয়কে আলিঙ্গন করতে প্রস্তুতি নিতে থাকে।

২ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক সব গণমাধ্যমে মুক্তিবাহিনীর সাফল্যের প্রচার গুরুত্বের সঙ্গে দেওয়া হতে থাকে। ওই দিন দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও মুক্তিবাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত না করতে পেরে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকার দিকে ফিরতে থাকে। বিভিন্ন জায়গায় তারা খণ্ড খণ্ড গণহত্যাও সংঘটিত করে। মুক্তিযোদ্ধারাও তখন পাকিস্তানিদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার মতো বেশ কিছু বীরত্বপূর্ণ আক্রমণ পরিচালনা করেন।

৩ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতায় ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে এক বিশাল জনসভায় বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের পক্ষে তাঁর সরকার ও জনগণের অবস্থানের কথা স্পষ্ট তুলে ধরেন। ওই দিন বিকেলেই পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে আক্রমণ করলে ভারতীয় বাহিনীও এর জবাব দেয়। শুরু হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ। ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অর্জন ম্লান করে দিতে চেয়েছিল পাকিস্তান। এর সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পরাশক্তিকে যুক্ত করে এই অঞ্চলকে উত্তপ্ত করারও পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু পাকিস্তানের সেই হিসাব ও পরিকল্পনা সফল হয়নি। সেই সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘোষণা দেয়—বাংলাদেশ সম্পূর্ণ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত নিরাপত্তা পরিষদে যেকোনো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তারা ভেটো দেবে। এরপর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ফরাসি এক যুবক পাকিস্তানি এয়ারলাইনসের একটি বিমান ছিনতাই করে। বোঝা যাচ্ছিল, বাংলাদেশের প্রতি বিশ্ব জনমত কীভাবে তখন প্রগাঢ় হয়ে ওঠে।

৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি সিনিয়র জর্জ বুশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উত্থাপন করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দেয়। ওই দিন ভারত সরকারের কাছে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি প্রদান করেন। এই বিবৃতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সহায়তাদানকারী শক্তি হিসেবে ভারতীয় বাহিনী অংশগ্রহণ করলে আন্তর্জাতিকভাবে কোনো রাষ্ট্র ও শক্তি তাকে দখলদার বাহিনী হিসেবে অভিহিত করতে পারবে না।

৬ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ভারতীয় লোকসভার অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ওই দিন ভুটানও বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। বিশ্বে এ খবর প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশকে আরও বেশি রাষ্ট্রের স্বীকৃতির দাবি উঠতে থাকে। দেশের অভ্যন্তরে যৌথ বাহিনী চারদিক থেকে পাকিস্তানি বাহিনীকে ট্যাংক ও সামরিক বিভিন্ন অস্ত্রসহ আক্রমণ করতে থাকে। পাকিস্তানি বাহিনী এই আক্রমণ মোকাবিলা করার মতো অবস্থানে ছিল না। একের পর এক সেনানিবাস ছেড়ে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা অভিমুখে পালিয়ে আসতে থাকে। চারদিক থেকে তখন সাধারণ মানুষ মুক্তিবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর অভিযানকে স্বাগত জানায়। একের পর এক দখলদার বাহিনী শহর ছেড়ে আসায় নয় মাস পর মুক্ত অঞ্চলের মানুষ প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করতে থাকে। রাজাকার বাহিনীর সদস্যরাও বিভিন্ন জায়গায় আত্মসমর্পণ করে। সেই পরিস্থিতিতে আলবদর, আলশামস বাহিনীর সহযোগিতায় ঢাকায় নতুন করে বুদ্ধিজীবী হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়। ১০ ডিসেম্বর থেকে অনেক বুদ্ধিজীবীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর ব্যাপকসংখ্যক বুদ্ধিজীবীকে নিয়ে যাওয়ার কারণে দিবসটি ‘শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের’ মর্যাদা লাভ করে। ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৯৩ হাজার সৈন্য আত্মসমর্পণ করলে বিজয়ের কেতন উড়তে থাকে।

প্রতিবছর ডিসেম্বর মাস এলেই আমরা এই ঘটনাগুলোর কথা স্মরণ করি। এ বছর বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকট এই বিজয়ের মাসে আমাদের পার করতে হচ্ছে। দেশকে অস্থিতিশীলতার একটি আশঙ্কাও করা হচ্ছে। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের দৃঢ়তায় যেকোনো অপশক্তির ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা পর্যন্ত নতুন প্রজন্মের রাজনীতিসচেতন তরুণদের এগিয়ে আসার শিক্ষা ও প্রেরণা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। বিগত বছরগুলোতে এভাবেই বিজয়ের মাসে স্বাধীনতার ইতিহাসকে স্মরণ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়েছে। এবারও তাই একাত্তরের বিজয়ের ভাবনাকে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও চূড়ান্ত লক্ষ্যে এগিয়ে নিতে হবে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *