ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ওয়ারশ যাওয়ার ট্রেনে

শিল্প ও সাহিত্য

ঘুরে বেড়ানোর জন্য হাতে আরও সপ্তাখানেকের মতো অবসর আছে। কিন্তু জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে আমি আর থাকতে চাচ্ছি না। ভাবছি পোলান্ডের দিকে যাব। ওয়ারশ শহরে জাহাজি শ্রমিকদের আন্দোলনের বিষয়ে খানিক খোঁজখবর নেব। কোনো এজেন্ডা ছাড়া হাঁটব ফুটপাতে। এখন সামার চলছে, রোডসাইড ক্যাফেতে বসে একটু জিরিয়ে নিয়ে ঢুঁ মারব শিপ-ইয়ার্ডে; মওকা পেলে খালাসিদের পানশালায় বসে চুটিয়ে শুনে নেব জাহাজিদের পছন্দসই ব্যান্ডের বাজনা। 

না, ফ্লাই করার মতো অর্থবল নেই, আবার সাততাড়াতাড়ি উড়ে গিয়ে ওয়ারশতে ল্যান্ড করার কোনো প্রয়োজনও আমার নেই। তাই ট্রেনের টিকিট কেনার জন্য চলে আসি মস্ত এক রেলওয়ে স্টেশনে। কিছুদিন হলো আমি ইউরোপে ট্রাভেল করছি, কিন্তু যানবাহন কীভাবে ম্যানেজ করতে হবে, কোথায় টিকিট কাটতে হবে, কোন জায়গায় পাতালরেল থেকে বেরিয়ে ট্রাম ধরতে হবে; বিষয়গুলো কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। তাই রেলওয়ে স্টেশনে এসে টিকিট কাউন্টার খুঁজে পেতে আমার বিস্তর সময় লাগে। 

ইন্টারনেট আবিষ্কৃত হলেও তখনো জার্মানিতে আজকালকার মতো অনলাইনে টিকিট কেনার বিষয়টি চালু হয়নি। কাউন্টারের কাছাকাছি আমি এক মহিলাকে কুঁজো হয়ে রেলওয়ে ম্যাপ ও টাইমটেবিল ঘাঁটতে দেখি। মহিলার বয়স হয়েছে বিস্তর, তাঁর চুলের রং পিজিওন ডাভ নামক এক ধরনের পাখির পালকের মতো রুপালি মেশানো ধূসর। 

মাত্র মিনিট কয়েক আগে আমি কাউন্টারে নীল-চোখা গাবদাগোবদা এক ক্লার্কের সঙ্গে ওয়ারশর টিকিট কেনা বাবদে কথা বলেছি। তাঁর জার্মান ভাষা আমি একেবারেই বুঝতে পারিনি, তাই সবিনয় অনুরোধে, ক্লার্ক ওভারকোট মোছার ব্রাশ দিয়ে ঘন দাড়ি আঁচড়াতে আঁচড়াতে ইংরেজিতে টিকিটের দাম ইত্যাদি বুঝিয়ে বলেছেন। তাঁর ইংরেজি বুলিতে নাখটে-মুখটেজাতীয় উচ্চারণ বিভ্রাট থাকায় আমি তাঁরও বিশেষ কিছু বুঝতে পারিনি। তাই তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে সরে এসেছি কাউন্টার থেকে। এবার এক বৃদ্ধা মহিলাকে ম্যাপ ঘাঁটতে দেখে ভাবি, কথাবার্তা বলে দেখি, যদি তিনি ইংরেজি বুঝতে পারেন, তাহলে তাঁর কাছে সাহায্য চাইব। 

মহিলাও নাকের ব্রিজে হাই পাওয়ারের রিডিং-গ্লাস ঝুলিয়ে আমাকে খুঁটিয়ে দেখেন। দিন কয়েক হলো, ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলি হামলা বেড়েছে বিঘতভাবে। বোমা বর্ষণে মৃত্যু হচ্ছে নারী ও শিশুসহ বেসমারিক আমজনতার। ফিলিস্তিনিরা গড়ে তুলছে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা প্রতিরোধ আন্দোলন। এগিয়ে আসা ইসরায়েলি ট্যাংকের দিকে তারা ছুড়ছে পাথরের ঢেলা। আমি ইন্তিফাদার প্রতি সংহতি প্রকাশ করে গলায় পেঁচিয়েছি কেফ্যিয়া বা সাদাকালো চেককাটা স্কার্ফ। আমার হ্যাট ও গালফশার্টে গাঁথা বেশ কয়েকটি বোতাম; তার প্রতিটিতে ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদ জানিয়ে লেখা একাধিক স্লোগান। হাই পাওয়ারের গ্লাসের ওপর দিয়ে মহিলার চোখের দৃষ্টিকে উদাসীন দেখালেও স্পষ্টত তিনি স্লোগানের বাণীগুলো নিরিখ করে দেখছেন। 

তাঁর সঙ্গে কথা বলার এবং সম্ভব হলে টিকিট কেনা বাবদে তাঁর সাহায্য চাওয়ার প্রয়োজন আমার আছে। সুতরাং, এগিয়ে যেতে যেতে বৃদ্ধার মুখের এক্সপ্রেশন নিয়ে দ্রুত চিন্তা করি। না, ওখানে করুণা কিংবা সহনুভূতির ছিটেফোঁটাও নেই, তবে আছে শত বছরের পুরোনো কোনো বইয়ের জরাজীর্ণ পাতার মতো এক ধরনের উদাসীন ভাবগাম্ভীর্য। পাতাটি যেন বিবর্ণ হতে হতে ঝাপসা হয়ে এসেছে, তাই আমি তাঁর অভিব্যক্তিতে বিশেষ কিছু পড়তে পারি না। 

তবে তিনি ‘হোয়াটস্ আপ?’ বলে একটু পজ নিয়ে ‘হাউ আর ইউ ডুয়িং টুডে?’ বললে, আমি যেন তৃষ্ণায় বরফ দেয়া সোডাজলের তালাশ পাই। তাঁর ইংরেজি বাগবিধিটি স্পষ্টত আমেরিকান। তিনি হেসে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে নিজেকে মিসেস এলিশেভা গারফিংকেল বলে পরিচয় দেন। 

আমি হাত মেলাতে গেলে, তাঁর গলার লকেটে পাঁচ আঙুলের পাঞ্জার ডিজাইনটি নজরে পড়ে। নকশার ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট ডায়মন্ড দিয়ে আঁকা কিং ডেভিডের নক্ষত্র প্রতীক ঝলসে ওঠে। আশকানাজি গোত্রের সেকেলেপন্থী ইহুদি মহিলারা এ ধরনের জমকালো জুইশ সিম্বলঅলা অলংকার পরে থাকেন, এ ব্যাপারে আমি সচেতন। 

 আজ আমি ফিলিস্তিনিদের আন্দোলনের সমর্থক হিসেবে টিশার্টে পিনওয়ালা বোতাম গেঁথে গলায় কেফ্যিয়া পেঁচিয়ে সড়কে বেরিয়েছি। এখন একজন ইহুদি মহিলার কাছে হেল্প চাইতে এসেছি, মনের ভেতর একটু বিব্রতভাব মাথা চাড়া দেয়। 

কিন্তু মিসেস এলিশেভা ‘হাউ মে আই হেল্প ইউ?’ বললে, ওয়ারশ যাওয়ার টিকিটের প্রসঙ্গটি সংক্ষিপ্তভাবে তাঁকে জানাই। তিনি খুব সুন্দর করে হাসেন। তাঁর হাসিটি যেন কচুরিপানার ঝোপের আড়ালে লুকানো জলপদ্মের মতো স্নিগ্ধতা ছড়ায়। বলেন, ‘গোয়িং টু ওয়ারশ বাই ট্রেন ইজ ভেরি ইজি, জাস্ট এ পিস অব কেইক। ইউরো-রেলের ট্রেন চালানো কোম্পানিটি আজকাল এত ইউজার ফ্রেন্ডলি হয়েছে যে এতে চড়ে বসলে অনায়াসে যাওয়া যায় চব্বিশটি দেশের পনেরো হাজার শহরের যেকোন একটায়। তোমার সমস্যা হচ্ছে কোথায়? কোন ট্রেনটি ধরতে চাও?’ 

একটু পজ নিয়ে বৃদ্ধা ফের কথা বলেন, ‘অপসন ওয়ান হচ্ছে—প্রথমে ইউরো রেল ধরে যাবে ফ্রাঙ্কফুর্ট টু বার্লিন। ৭০০ কিলোমিটারের ধাক্কা। সময় লাগবে চার ঘণ্টার মতো। বার্লিনে একটু জিরিয়ে-জুরিয়ে ধরতে পারো ওয়ারশ যাওয়ার ট্রেন। বার্লিন-ওয়ারশ এক্সপ্রেস কোম্পানি জয়েন্টলি এ ট্রেনের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে। টিকিট একটু এক্সপেনসিভ হলেও খুবই ওয়েল ম্যানেজড। মাত্র সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার ভেতর পোল্যান্ডের বর্ডার ছাড়িয়ে পৌঁছে যাবে ওয়ারশ সিটিতে।’ 

‘মিসেস গারফিংকেল, আমি একটু সস্তায় যেতে চাচ্ছি। তাড়াতাড়ি ওয়ারশ পৌঁছার আমার কোনো প্রয়োজন নেই। অন্য অপশন আর কী আছে?’ 

তিনি জার্মান ভাষায় লেখা টাইমটেবিলের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বলেন, ‘তাহলে চলো আমার সঙ্গে। আমিও ওয়ারশতে ফিরে যাচ্ছি, অনেক বছর পর, ৬০ কিংবা ৭০ বছর আগে আমি যখন ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ওয়ারশতে রাতের ট্রেনে চড়ে যাই, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। দ্যাটস অ্যা লং লং টাইম এ গো। সে ওভারনাইট ট্রেনটি এখনো চালু আছে। ফ্রাঙ্কফুর্টের এ সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে ছাড়বে রাত ১০টার দিকে। পরদিন বেলা ১১টা নাগাদ পৌঁছাবে ওয়ারশতে। উড ইউ লাইক টু গো উইথ মি?’ আমি ঘাড় হেলিয়ে তাঁর প্রস্তাবে সায় দিই। 

কাউন্টারে আমি নাইট ট্রেনের টিকিট কিনতে আসি। মিসেস এলিশেভা গারফিংকেলও আমার সঙ্গে সঙ্গে আসেন। এমনি আমার অগোছালো স্বভাব, কিছুতে ব্যাকপ্যাকে পাসপোর্ট, আইডি ইত্যাদি খুঁজে পাই না। একটি ফোল্ডার থেকে অবশেষে ট্রাভেলার চেক বের করতে গেলে, এক তাড়া পত্রিকার কাটিং ছড়িয়ে পড়ে ফ্লোরে। মিসেস এলিশেভা কুঁজো হয়ে তা কুড়িয়ে তোলেন। টিকিট কাটা হয়ে যেতেই দেখি, তিনি কাটিংগুলো গোছাতে গোছাতে চশমা চোখে তা খুঁটিয়ে দেখছেন। 

পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন আমাকে পীড়া দিচ্ছে। নিউইয়র্ক টাইমসের ইন্টারন্যাশনাল এডিশন থেকে কিছু তথ্য ও ফিলিস্তিনি নিপীড়নের ছবি আমি কেটে রেখেছি। ভাবছি, একটু প্রতিফলন করে এ বিষয়ে একটি লেখা তৈরি করব। 

আমরা হেঁটে টার্মিনালের এক প্রান্তে এসে একটি বেঞ্চে বসি। মিসেস এলিশেভা ফোল্ডারে কাটিংগুলো গুছিয়ে দিতে দিতে বলেন, ‘আই সি, ইউ আর থিংকিং অ্যাবাউট প্যালেস্টাইন ইস্যু।’ আমি জবাব দিই, ‘আই অ্যাম এফরেইড, উই মে হ্যাভ অ্যা ডিফরেন্ট পজিশনস্। মনে হয়, আমরা দুই বিপরীত দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি দেখছি।’ 

তিনি খুব নির্লিপ্তভাবে জানান, ‘ইয়েস, অ্যাজ অ্যা জু, আমি ইসরায়েলের রাষ্ট্র হিসেবে একজিস্ট করার অধিকারকে সমর্থন করি।’ আমি কোনো জবাব না দিয়ে ব্যাকপ্যাক থেকে বের করি ছোট্ট শর্টওয়েভ রেডিও। মিনিট দুয়েকের ভেতর তাতে ‘এন-পি-আর’ বা ‘ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও’র বার্লিন থেকে প্রচারিত ইংরেজি নিউজ শুনতে পাওয়া যায়। 

নিউজ-কাস্টার দ্বিতীয় ইন্তিফাদার ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে বলেন যে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন আল আকসা মসজিদসংলগ্ন টেম্পল মাউন্টেন ভিজিট করতে আসলে জেরুজালেমে রায়টের সূত্রপাত হয়। গেল পাঁচ দিনের সংঘাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন ৪৭ জন, আর আহত হয়েছেন ১ হাজার ৮৮৫ জন ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষ। আহত-নিহতদের বেশির ভাগই বয়সের দিক থেকে তরুণ ও কিশোর। এদের অনেকে প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ইসরায়েলি সৈনিকদের দিকে পাথর ছুড়তে গিয়ে লাইভ বুলেটের আঘাতে খুন কিংবা জখম হয়। 

বিবরণের শেষ দিকে নিউজ-কাস্টার আজকের একটি ঘটনার ওপর বিশেষভাবে ফোকাস করেন। পশ্চিম তীরের রামাল্লা শহরে বাজার থেকে সওদাপাতি নিয়ে বাবার সঙ্গে ফিরছিল আট বছরের বালক মোহাম্মদ আল ডোরাহ। সড়কে প্রতিবাদী মিছিল চলছে। ইসরায়েলি হেলিকপ্টার উড়ে আসলে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। 

হেলিকপ্টারের জানালা থেকে স্নাইপাররা দালানকোঠা, ঘরদুয়ারের আড়ালে আশ্রয় নেয়া তরুণদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ছে। মোহাম্মদ আল ডোরাহের বাবা ল্যাম্পপোস্টের আড়ালে দাঁড়িয়ে পড়েন। হেলিকপ্টার উড়ে আসে তাঁর মাথার ওপর। আল ডোরাহ তার বাবার পেছনে কোটের প্রান্ত খামচে ধরে মাথা নিচু করে লুকানোর চেষ্টা করে, কিন্তু স্নাইপারের গুলি এসে তার ঘাড়ে লাগে। শিশুটির ললিপপ কামড়ে থাকা নিহত দেহের ছবি ছাপা হয়েছে ইউরোপের পত্রপত্রিকায়। 

সংবাদভাষ্যটি শেষ হওয়ার আগেই ধড়মড় করে উঠে পড়েন মিসেস এলিশেভা গারফিংকেল। তিনি রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে অকওয়ার্ডভাবে বিদায় নিলে আমি বলি, ‘সরি, মিসেস গারফিংকেল, আশা করি এ ধরনের সেনসেটিভ নিউজ শুনিয়ে আমি আপনাকে আপসেট করে দিইনি।’ 

তিনি আমার মন্তব্যের কোনো জবাব না দিয়ে চলে যেতে থাকেন টার্মিনালের অন্যদিকে। খানিক পর দেখি, মিসেস এলিশেভা আবার ফিরে আসছেন আমার বেঞ্চের দিকে। তাঁকে আরও বয়স্ক দেখায়। নড়বড়ে ফার্নিচারের মতো ঝুরঝুরে দেহকাঠামো নিয়ে তিনি আমার পাশে বসেন, কাঁপা দুই হাত নিয়ন্ত্রণ করতে করতে বলেন, ‘সরি ফর শোয়িং ইমোশন। তুমি কিছু মনে না করলে তোমাকে একটা বিষয় কিন্তু বলতে হয়।’ 

আমি নীরবে তাঁর কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করি। তিনি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে নাৎসি জার্মানরা ইহুদিদের সঙ্গে যে আচরণ করেছিল, ঠিক একইভাবে বর্তমানে ইসরায়েল রাষ্ট্র ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন চালাচ্ছে।’ 

আমি এবার জানতে চাই, ‘মিসেস গারফিংকেল, জার্মানিতে হলোকাস্টের সময় ইহুদিদের জীবনে যা ঘটেছিল, সে সম্পর্কে প্রচলিত অথেনটিক কোনো কাহিনি আপনি কারও কাছে শুনেছেন কি?’ তিনি জবাব দেন, ‘এ বিষয়কে ঠিক কাহিনি বলা যায় না। আমার জীবদ্দশায়ই তো এসব ঘটেছিল। ১৯৩৩ সালে যে বছর নাৎসিরা ইহুদিদের দোকানপাট বয়কট করল, সে বছর আমার জন্ম হয় এ ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে। আমার গ্র্যান্ডফাদারের ছিল জুয়েলারির দোকান, গারফিংকেলরা শত বছর ধরে ডায়মন্ডের ব্যবসা করে আসছে। আমার গ্র্যান্ডফাদার ছিলেন প্লাটিনাম বা হোয়াইট গোল্ডে ডায়মন্ড সেটিংয়ের ব্যাপারে স্পেশালিস্ট। আমার বাবা ও কাকা ছিলেন যথাক্রমে ডাক্তার ও আইনজীবী। তাঁরা পরিবারের বংশগত জুয়েলারি ব্যবসায় যাননি। ১৯৩৬ সালে জার্মানিতে ইহুদিদের পেশাগত চাকরি-বাকরি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। তো দুজনে বেকার জীবনযাপন শুরু করেন।’ 

মিসেস এলিশেভা এবার বোতলের জল দিয়ে ক্লনোপিন বলে একটি ট্র্যাংকুলাইজার ট্যাবলেট নেন। তারপর দীর্ঘ পজ নিয়ে আমার দিকে তাকান। আমি জানতে চাই, ‘আপনার পরিবারের সবাই কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হওয়ার পর অবধি বেঁচে ছিলেন?’ 

যেন খুব স্টুপিড ডাম্ব একটি প্রশ্ন করেছি, এমন ভঙ্গিতে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৩৩ সালে জার্মানিতে নাগরিক হিসেবে বসবাস করত জুইশ সম্প্রদায়ের ৫ লাখ ২২ হাজার মানুষ। ১৯৪৩ সালে নাৎসিরা জুডেনরেইন বা ক্লিনিং অব জুজ অভিযান শুরু করলে, কেবল ২ লাখ ১৪ হাজার ইহুদি জার্মানি থেকে পালিয়ে ইউরোপের অন্যান্য দেশ বা আমেরিকায় শরণার্থী হওয়ার সুযোগ পায়। বাকিদের কেউই গ্যাস চেম্বারে মৃত্যুর নিয়তি থেকে রেহাই পায়নি। আমার বাবা-কাকা-মা-মাসি সবাই এ পরিসংখ্যানের অন্তর্গত।’ 

মিসেস এলিশেভা গারফিংকেল এবার উঠে পড়তে পড়তে বলেন, ‘আই হোপ নাউ ইউ উড আন্ডারস্ট্যান্ড… ইহুদি সম্প্রদায় কেন মরিয়া হয়ে একটি রাষ্ট্র চায়, ইসরায়েলের অস্তিত্ব না থাকলে আমাদের যাওয়ার যে আর কোনো স্থান নেই। উই আর সো ভেরি মাচ ডেসপারেট!’ তিনি গুডবাই না বলে বেঞ্চ ছেড়ে চলে যান এক্সিট সাইনের নিশানা ধরে। 

ওয়ারশ যাওয়ার নাইট ট্রেনে বসে আমি মনে মনে মিসেস এলিশেভা গারফিংকেলের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। খুব নার্ভাস লাগছিল। অনেক দিন ধরে আমি ট্রাভেল করছি, কিন্তু নতুন কোনো দেশে যেতে হলে আমার অস্থির লাগে, বর্ডার ক্রসিং ম্যানেজ করতে পারব কি না তা ভেবে তীব্র আত্মবিশ্বাসের অভাব বোধ করি। 

বিকেলে একটি নির্জন লাইব্রেরিতে বসে ফিলিস্তিনি প্রসঙ্গ নিয়ে একটি আর্টিকেল লিখতে চেষ্টা করেছি। ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিষয়টি হাইলাইট করতে গিয়ে মনে জলছাপের মতো ভেসে গেছে মিসেস গারফিংকেলের করুণ—বয়সের ভারে জীর্ণ মুখাবয়ব। তাঁর সঙ্গে একত্রে ওয়ারশ অবধি ট্রাভেল করা সহজ নাও হতে পারে? 


এসব উদ্বেগ থেকে মনকে অন্যদিকে ফেরানোর জন্য, আমি ম্যাক্স আরন্সট্ বলে এক পরাবাস্তববাদী চিত্রকরের পেইন্টিংঅলা বইয়ের পাতা উল্টাই। শিল্পী শুধু কয়েকটি টপ-হ্যাট দিয়ে তৈরি করেছেন বিচিত্র মনুষ্য ফিগার, আমি তার দিকে তাকিয়ে থাকি। অভিজ্ঞতায় দেখেছি, তীব্র স্ট্রেসের সময় পরাবাস্তবাদী কোনো চিত্র অবলোকন করলে তা খানিকটা লাগব হয়। সুতরাং, আমি পাতা উল্টিয়ে তেলের পিপা ব্যবহার করে তাঁর আঁকা ‘মেকানিক্যাল হাতি’র ছবির পাতায় জন্তুটির হোজ পাইপের মতো শুঁড় আঙুল দিয়ে বারবার স্পর্শ করি। 

 তখনই মিসেস গারফিংকেল এসে লাইব্রেরির রিডিংরুমে ঢোকেন। তো আমি চিত্রকলার বইখানা শোল্ডারব্যাগের নিচে ঠেলে দিয়ে লুকিয়ে ফেলি। কেন জানি মনে হয়—আমি মেকানিক্যাল হাতির অদ্ভুত আকৃতির দিকে তাকিয়ে আছি দেখতে পেলে, হয়তো মিসেস এলিশেভা আমাকে রীতিমতো উইয়ার্ড বা কিম্ভূত রুচির লোক বলে ভাববেন। 

মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে খুব মিষ্টি করে হাসেন। আবার কচুরিপানার আড়ালে লুকিয়ে থাকা পদ্ম ফুলের স্নিগ্ধ ইমেজের কথা মনে পড়ে। তিনি জানতে চান, ‘তুমি কি আমাদের পারিবারিক কয়েক পুরুষের বসতবাড়ির ছবি দেখবে?’ 

ঘাড় হেলিয়ে সায় দিই। তিনি ব্যাগের জিপার খুলে বের করেন বেলারুশিয়ার ইহুদি চিত্রশিল্পী মার্ক শ্যাগালের ছবির রঙিন প্লেটওয়ালা একটি বড়সড় পেইন্টিংয়ের বই। তার ভেতরে বুকমার্কের মতো গুঁজে রাখা দুটি সাদাকালো ফটোগ্রাফ। তা বের করে আমাকে দেখিয়ে বলেন, ‘এ তিনতলা বাড়িটি আমার গ্র্যান্ডফাদারের আগের প্রজন্মের পূর্বপুরুষ ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে তৈরি করান ১৮৩২ সালে।’ 

আমি বিশাল ঝাড়বাতিওয়ালা হলকামরার ইনটেরিওরের ছবিটি হাতে নিয়ে, তাতে রাখা ঝাপসা হয়ে আসা গ্র্যান্ড পিয়ানোর দিকে তাকাই। জানতে চাই, ‘বাড়িটি এখনো আছে কি?’ তিনি জবাব দেন, ‘১৯৪৩ সালের মে মাস অবধি এ বাড়িতে আমার গ্র্যান্ডফাদার বসবাস করতেন। জুলাই মাসে পরিবারের সবাইকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে নেয়া হয়। তার পরের বছর মিত্রশক্তির বোমাবর্ষণে বাড়িটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়।’ লাইব্রেরিতে নীরবতা বজায় রাখতে হয়। তো কথাবার্তা না বলে অতঃপর নীরব ইশারায় গুডবাই বলে উঠে যান মিসেস গারফিংকেল। 

সন্ধ্যার পর, আলাদা আলাদাভাবে আমরা এসে পৌঁছাই স্টেশনে। একটি ডাবল কুপের রিজার্ভ করা কামরায় টিকিটের নাম্বার মিলিয়ে আমরা বসি। ‘হ্যালো, হাউ আর ইউ ডুয়িং’ বলে মহিলা খুলে বসেন মার্ক শ্যাগালের চিত্রকলার বইটি। তিনি মনোযোগ দিয়ে ছবিগুলো দেখছেন। গ্রন্থটি আকারে বিশাল, সিটে পৃষ্ঠা দুটি ছড়িয়ে দেয়ায় আমিও চিত্রের কালার-প্লেটগুলো দেখার সুযোগ পাই। ‘দ্য পোয়েট’, এবং ‘ফিডলার’ বা ‘বেহালাবাদক’ শিরোনামের ছবিগুলোর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে ‘কাউ উইথ প্যারাসল’, বা ‘ছাতা মাথায় গরু’র ছবির পাতায় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে তাকিয়ে থাকেন তিনি। পরাবাস্তববাদী কেতার এ চিত্রটি সত্যিই বিচিত্র। একটি গরু তার নীল বর্ণের মুখমণ্ডলে তীব্র বিষাদ ফুটিয়ে, সামনের পা বাঁকা করে খুরে ধরে আছে কারুকাজ করা একটি ছাতা। 

তার দিকে তাকাতে তাকাতে মিসেস এলিশেভা যেন জনান্তিকে কথা বলেন, ‘আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগে আমি এ ট্রেনে চড়ে ওয়ারশতে যাই। তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। খুব স্ট্রেস হচ্ছিল। কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলাম না। আমার জার্মান ন্যানি বা আয়া আমাকে স্লিপিং পিল দিয়ে ঘুম পাড়াতে চাচ্ছিল। এ ট্রেনের কথা ভাবলেই কেমন জানি উদ্বেগ লাগে।’ 

মহিলা বোতল থেকে গলায় জল ঢেলে ক্লনোপিন বলে একটি অ্যান্টি অ্যাংজাইটি পিল নেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বলেন, ‘মনে দুশ্চিন্তা হলে, মার্ক শ্যাগালের চিত্রের মতো উপকারী আর কিছু নেই।’ 

আমি জানালার কাচে তাঁর প্রতিফলনের দিকে তাকাই। ওখানে আমাদের দুজনের ছায়া প্রতিবিম্বিত হচ্ছে। আমাদের চেহারাসুরত, বয়স ও জেন্ডারে বিস্তর পার্থক্য। কিন্তু কোথায় যেন—আত্মবিশ্বাসের অভাবে, কিংবা চিত্রকলার রুচিতে খানিকটা মিল আছে। এ বিষয়টা অনুধাবন করতে পেরে আমি খুব অবাক হই! 

একটু রাত হলে মহিলা তাঁর নড়বড়ে শরীর নিয়ে আপার বার্থে উঠতে যান। পা ফসকে পড়ে গিয়ে যদি হাত-পা ভাঙেন, এ আতঙ্কে আমি বলি যে ‘মিসেস গারফিংকেল, আপনি কাইন্ডলি নিচে ঘুমান, আমি ওপরের বার্থে উঠছি।’ কিন্তু কিছুতেই তিনি তাতে রাজি হন না। পা বাঁকিয়ে-চুরিয়ে বাতব্যাধিগ্রস্ত মহিলা কাতরানোর ধ্বনি করে, ওপরের বার্থে কোনোক্রমে উঠে শুয়ে পড়ে মৃদুস্বরে কোঁকান। 

 বেশ রাতে ট্রেন থামে। বর্ডার পুলিশের বুটের শব্দে ঘুম ভাঙে। মনে হয়, পুলিশ যুগলের একজন জার্মান আর অন্যজন পোলিশ। তাঁরা আমার পাসপোর্ট চেক করে মিসেস এলিশেভাকে জাগাতে যান। কিন্তু । অ্যান্টি অ্যাংজাইটি পিল খেয়ে মহিলা ঘুমিয়েছেন। জার্মান কিংবা পোলিশ ভাষার ডাকাডাকিতে তাঁর ঘুম ভাঙে না। আমার টেনশন লাগে। আমি নিচের বার্থে জড়সড় হয়ে বসে তাঁর নাক ডাকার শব্দ শুনি। 

মহিলা তাঁর বালিশের পাশে আমেরিকান পাসপোর্ট রেখে ঘুমিয়েছেন। পুলিশ তা তুলে নিয়ে খুলে দেখে তা বালিশের পাশে রেখে বেরিয়ে যায়। বর্ডার চেকিং সারা হলে—ট্রেন ছেড়ে দেয়ার পর আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসেন মিসেস এলিশেভা। পরিষ্কার বুঝতে পারি, তিনি এতক্ষণ মটকা মেরে পড়ে ছিলেন। 

আমাকে ডেকে তিনি তাঁর ব্যাগ থেকে জলের বোতল বের করে দিতে বলেন। পানি দিতে গেলে তিনি ফিক করে হেসে বলেন, ‘১০ বছর বয়সে যখন জার্মান ন্যানির সঙ্গে এ ট্রেনে করে ওয়ারশতে পালিয়ে যাই, তখনও ঘুমের ভান করে এ রকম আপার বার্থে শুয়েছিলাম। ন্যানি বর্ডার-পুলিশকে বোঝায় যে—আমার শরীর খারাপ। ন্যানি চাচ্ছিল না যে আমার সঙ্গে পুলিশের সরাসরি কোনো কথা হোক। কারণ আমার চেহারা দেখে যদি নাৎসি পুলিশ আমাকে জুইশ গার্ল বলে সন্দেহ করে!’ তিনি বোতলের জল দিয়ে আবার একটি অ্যান্টি অ্যাংজাইটি পিল নেন। 

ওয়ারশতে নেমে আমি তাঁর কাছে বিদায় নিতে গেলে তিনি আমার দিকে একটুক্ষণ নিরিখ করে তাকিয়ে থাকেন। তারপর বিদায় সম্ভাষণের কোনো জবাব না দিয়ে, তাঁর নড়বড়ে শরীরে ভারী ব্যাগ জাপটে ধরে সোজা হেঁটে যান ট্যাক্সির দিকে। আমি ওয়ারশ স্টেশনে অসহায় হালতে দাঁড়িয়ে থাকি। 

 (চলবে)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *