এখনো অনেক দূর যেতে হবে

মতামত

মহান স্বাধীনতা অর্জনের, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আজ ৫১ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি ৯৩ হাজার সেনাসদস্য তৎকালীন ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ করে। এর ফলে আমরা শুধু ৯ মাসের হানাদার বাহিনীর কবল থেকেই মুক্ত হইনি, সাতচল্লিশ-উত্তর পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকেও চিরকালের জন্য মুক্তি লাভ করেছি। আমাদের নিজস্ব রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার এক অনন্য সুযোগ তৈরি হয়েছে। আমরা পাকিস্তান রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য ২৩ বছর নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম শেষে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের বিশাল গৌরবময় এক অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছি, যা পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য কোনো জাতি ও রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জনে দেখা যায়নি। আমাদের এই স্বাধীনতালাভের পেছনে ছিল একটি শোষণহীন সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য। আমাদের রাজনৈতিক অগ্রসর রাষ্ট্রচিন্তার নায়ক বঙ্গবন্ধু, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীনসহ জাতীয় নেতারা পাকিস্তানি শাসক ও সামরিক বাহিনীকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে পরাস্ত করার যে দূরদর্শিতা ও দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, তার নজির অত্যন্ত বিরল। এই নেতৃত্বের প্রতি আস্থার ফলেই নিরস্ত্র মানুষ সশস্ত্র অবস্থান নিতে দেরি করেনি। সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধে রূপান্তর করতে তাঁদের নেতৃত্ব, মেধা ও দক্ষতার প্রয়োগ ঘটিয়েছিলেন। একই সঙ্গে ভারত ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের সমর্থন ও সহযোগিতাকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন বলেই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী, তাদের এদেশীয় দোসর ও আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহকে ১৬ ডিসেম্বর পরাজিত করতে সক্ষম হন। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমরা এক অপরাজেয় জাতীয় শক্তিরূপে আবির্ভূত হই। মুক্তিযুদ্ধের সীমাহীন ধ্বংস ও ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে একদিন এই রাষ্ট্র মাথা তুলে দাঁড়াবেই—এমন আত্মপ্রত্যয় আমাদের মধ্যে দৃঢ়ভাবে স্থান করে নেয়।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে ফিরে আসার পর নতুন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। তাতে তিনি হাতও দিয়েছিলেন। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়াতে শুরুও করেছিল। দ্রুততম সময়ে দেশের সংবিধান প্রণীত হয়। চারটি মূলনীতি—গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ রাষ্ট্রের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এই চার মূলনীতির ভিত্তিতেই বঙ্গবন্ধু দেশের অর্থনৈতিক ও সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

সাড়ে ৭ কোটি মানুষের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের সংস্থান করা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। তবে বঙ্গবন্ধু আস্থাশীল ছিলেন দেশের উর্বর মাটি ও শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের ওপর। তিনি কৃষি, শিল্প, প্রশাসনিক সংস্কারেরও ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। যুদ্ধ, বন্যা, আন্তর্জাতিক বৈরী পরিবেশ, দুর্ভিক্ষ ইত্যাদি প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করেও ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা লাভ করতে সক্ষম হয়। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নেতৃত্বের অব্যাহত ধারা বজায় থাকলে বাংলাদেশ দেড়-দুই দশকের মধ্যেই অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা-সাংস্কৃতিকভাবে অগ্রগতির ধারায় অনেকটাই এগিয়ে যেতে সক্ষম হতো, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে মুক্তিযুদ্ধকালের মতো জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠেনি। বরং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা শক্তিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র যাতে স্বাধীনভাবে বিকশিত হতে না পারে, সব মানুষের আর্থসামাজিক জীবনমানের উন্নয়ন সুষমভাবে ঘটাতে না পারে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও সংবিধানের বর্ণিত চার মূলনীতি অনুসরণ করতে না পারে, সে জন্য দেশে ও বিদেশে নানা ধরনের অপতৎপরতা, ষড়যন্ত্র ইত্যাদি শুরু হয়। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের বিয়োগান্ত ঘটনা সেই ষড়যন্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। দেশ রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণরূপে উল্টো পথে পরিচালিত করার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা সেই সব অপশক্তির সমর্থকদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন সামরিক ও আধা সামরিক শাসনামলে ছিল। এর রাজনীতি সম্পূর্ণরূপে ঘুরিয়ে দেওয়া হলো। প্রকৃত রাজনীতিবিদেরা রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বে থাকতে পারলেন না। সুবিধাবাদী, আদর্শহীন, সাম্প্রদায়িক ও লুম্পেন এক শোষকগোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্র, রাজনীতি, প্রশাসনসহ সবকিছু চলে যায়। ফলে বাংলাদেশ একটি কল্যাণবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অবস্থা থেকে ছিটকে পড়ে।

বাংলাদেশও অন্য ৮-১০টি সমস্যাপীড়িত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারণা পরিত্যাজ্য হয়। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শও ভূলুণ্ঠিত হয়। এটি একটি শাসন-শোষণব্যবস্থার কাঠামোও তৈরি করে ফেলে। সেখানে নানা সামাজিক, রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান সংহত হয়ে পড়ে। এই ব্যবস্থা ভাঙা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষে বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। তার পরও ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৯ থেকে বর্তমান পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের বেশ কিছু পরিবর্তন অর্জিত হয়। এতে দারিদ্র্যবিমোচনের যেমন নানা কর্মসূচি রয়েছে, আবার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, প্রযুক্তি, ব্যাংকব্যবস্থা ইত্যাদি খাতে একটি উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠারও ব্যবস্থা হয়েছে। সমাজে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অবস্থান দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। মানুষের যেমন আয় বৃদ্ধি ঘটেছে, আবার আয়বৈষম্যও ব্যাপক হারে বেড়েছে।

আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করেছি, উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদাও লাভ করেছি। তবে পুরোনো অর্থনৈতিক শাসন ও শোষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে নতুন বৈশ্বিক উন্নয়নশীলতার ধারণায় ভিন্ন এক পুঁজিবাদী আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় অবস্থান করেছি যেখানে ধনী, দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত নতুন সংজ্ঞায়নে পরিচিতি লাভ করছে।

এ দেশের ১ কোটিরও বেশি মানুষ বিদেশে কাজ করছে, রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে, যাদের একটি বড় অংশই ছিল গ্রামীণ, অদক্ষ ও নিম্নবিত্তের মানুষ। এই জনগোষ্ঠীর জীবনমানে নানা বৈচিত্র্যময় পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষি, মৎস্য, পোলট্রি, যন্ত্রপ্রযুক্তি ইত্যাদি যুক্ত হওয়ায় আর্থিক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। নানা সূচকেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক ধ্যানধারণার বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা বেড়েছে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক আদর্শ বড় ধরনের পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে দেশ যথেষ্ট পরিমাণ অগ্রগতি লাভ করলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বোধ ও চেতনার মান যথেষ্ট পরিমাণ পিছিয়ে আছে। সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে নিয়ম, শৃঙ্খলা, মূল্যবোধ ইত্যাদির চর্চা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় সমাজে একধরনের সাংস্কৃতিক বোধের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। সমাজে দুর্নীতি, অপরাধপ্রবণতা, সাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী মানসিকতা নির্লিপ্তভাবেই যেন বিরাজ করছে।

এরই মধ্যে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করেছি, ৫১ বছর পার করে দিয়েছি। এই দীর্ঘ সময়ে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শাসনতান্ত্রিক বিপর্যয়ও আমাদের হজম করতে হয়েছে। দেশের রাজনীতি পরস্পরবিরোধী দুই মেরুতে অবস্থান করছে। এর একদিকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ, অন্যদিকে বিপক্ষের অবস্থান। পৃথিবীর অন্য কোনো স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশে এমনটি দেখা যায় না। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জনগণ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তার কথা। সেই নেতৃত্বের অভাবেই আমরা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের কল্যাণবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। কিন্তু তেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া আমাদের রাষ্ট্র, সমাজসহ সর্বত্র যে উন্নত জীবন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী জনশক্তি তৈরি করা অপরিহার্য, সেটি বাস্তবে সম্ভব হওয়ার কোনো কারণ নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার যাত্রায় আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি সত্য, কিন্তু তারই দেওয়া এবারের স্মার্ট বাংলাদেশ ধারণায় রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য আমাদের একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও জ্ঞাননির্ভর স্মার্ট সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতেই হবে। সেটিই হোক আমাদের এবারের বিজয় দিবসের নতুন ভাবনার বিষয়। ২০৪১ সালে যদি আমরা তা সম্ভব করতে চাই, তাহলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জনগণকে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ রাষ্ট্র অর্জনের ত্যাগ ও দৃঢ়তায় ঐক্যবদ্ধ হতেই হবে।

লেখক: মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী, অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও কলামিস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *