পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগে ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’?

মতামত

কয়েক সপ্তাহের জল্পনা-কল্পনার পর আসিম মুনিরকেই পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে বেছে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তার পরও নতুন করে গুঞ্জন শুরু হয়েছে পাকিস্তানের নাগরিকদের মধ্যে। বিশেষ করে, এই নিয়োগ নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের নেতা ইমরান খানের অপূরিত প্রত্যাশার কথা এবং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ খানের সাফাই গাওয়ার পর তা আরও জোরালো হয়েছে।

এই নিয়োগ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার মধ্যেই পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছিলেন, পরবর্তী সেনাপ্রধান নিয়োগের সারসংক্ষেপ পেয়ে তার দলের নেতা প্রেসিডেন্ট আলভি ‘অবশ্যই তাঁর সঙ্গে পরামর্শ করবেন’ বলে তিনি আশা করেন।

কিন্তু বাস্তবে সম্ভবত তেমনটি ঘটেনি। প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি সেনাপ্রধান নিয়োগ বিষয়ে ইমরান খানের সঙ্গে পরামর্শ করার প্রয়োজন বোধ করেননি। তাঁর দপ্তরে সেনাপ্রধান নিয়োগের সারসংক্ষেপ পৌঁছার পরপরই তিনি কালক্ষেপণ না করে নিয়মানুযায়ী নিয়োগ অনুমোদন করেছেন।

তবে আমজনতার মধ্যেও যে এ নিয়োগ নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় উঠতে পারে, সে সম্পর্কে আগে থেকেই ওয়াকিবহাল ছিল শাহবাজ শরিফের সরকার। সেনাপ্রধান হিসেবে আসিম মুনিরের নাম ঘোষণার পরপরই স্থানীয় একটি গণমাধ্যমকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফের মন্তব্যে তা স্পষ্ট। তবে তিনি যা বলেছেন, তাতে এই নিয়োগের পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে কিছুটা হলেও সংশয়ের কারণ তৈরি হয়েছে।

খাজা আসিফ বলেছেন, ‘আইন ও সংবিধান অনুযায়ী তাঁর (আসিম মুনির) নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আপনারা এই নিয়োগকে রাজনীতির চোখে দেখবেন না, প্লিজ! আমি আশা করি, প্রেসিডেন্টের নিয়োগকে বিতর্কিত করবেন না।’

তাঁর মন্তব্যকে অনেকেই ‘ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না’ প্রবাদের সঙ্গে তুলনা করছেন। কারণ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান নিয়োগের সংস্কৃতি বিবেচনায় নিলে এ নিয়োগ নিয়ে সাধারণ জনতার বাঁকা চোখে দেখার কোনো কারণ নেই। কিন্তু প্রতিরক্ষামন্ত্রীর উপযাচক হিসেবে মন্তব্য শুনে জনতা এখন ভাবছেন, ‘ডাল মে কুছ কালা হ্যায়’!

ডালের মধ্যে কী সেই কালো ব্যাপার? সেটি হচ্ছে রাজনীতি। প্রায় সাত দশক ধরে পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ করার নজির রয়েছে। ব্যাপারটি প্রকাশ্যে স্বীকার্য না হলেও সবাই জানেন যে কোনো না কোনোভাবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র ও রাজনীতি সেনাবাহিনীই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বিদায়ী সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার সর্বশেষ বক্তব্যেও।

গত পরশু তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, সামরিক বাহিনী গত সাত দশক ধরে ‘রাজনীতিতে জড়িত থাকার সমালোচনা’ সহ্য করেছে। কিন্তু সেনাবাহিনী আর রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে না বলে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ তাঁর এই বক্তব্য থেকেই বোঝা যায়, গত বছরের ফেব্রুয়ারির আগে পর্যন্ত সেনাবাহিনী রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করত।

এখন জেনারেল বাজওয়ার উত্তরসূরি হিসেবে আসিম মুনির তাঁর অঙ্গীকার রক্ষা করবেন কি না, সেটিই দেখার বিষয়। যদিও এ বিষয়ে বিশ্লেষকদের যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এসব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ছাড়াও নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে তাঁকে অনেক চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, দেশজুড়ে সীমাহীন অর্থনৈতিক সংকট ও ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা সামলাতে হবে তাঁকে। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের কুখ্যাত বৈরী সম্পর্ক তো রয়েছেই, সেটিও তাঁকে সামলাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্ক ইদানীং খুব একটা ভালো যাচ্ছে না পাকিস্তানের।

২২ কোটি মানুষের দেশ পাকিস্তান এ পর্যন্ত চারজন সামরিক শাসকের মাধ্যমে শাসিত হয়েছে। তিন তিনবার সেনা অভ্যুত্থান ঘটেছে দেশটিতে। ১৯৭৩ সালের পর থেকে বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী কোনো প্রধানমন্ত্রী পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি।

এসব কারণে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী তাদের খ্যাতি হারিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান আটলান্টিক কাউন্সিলের পাকিস্তান ইনিশিয়েটিভের পরিচালক উজাইর ইউনুস। তিনি আরও বলেছেন, ‘নতুন সেনাপ্রধানের সামনে প্রচুর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পাকিস্তানের ইতিহাস থেকে দেখা যায়, সেনাপ্রধান হিসেবে স্থির হতে একজন সেনাপ্রধানের অন্তত তিন মাস সময় লাগে। কিন্তু আসিম মুনির সেই সুযোগ পাবেন বলে মনে হয় না। তাঁর সামনে চলমান রাজনৈতিক মেরুকরণে হস্তক্ষেপ করার প্রলোভন রয়েছে। আসিম মুনির সেই প্রলোভন পাশ কাটাতে পারবেন কি না, তা দেখতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে।’

পাকিস্তানের লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আয়েশা সিদ্দিকা বলেছেন, ‘সেনাবাহিনী রাজনীতির খেলা এখনো চালিয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আসিম মুনিরকে এমন একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে, যাতে রাজনীতির মঞ্চে প্রকাশ্যে না এসেও এ হাইব্রিড সরকারকে চালানো যায়।’

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আরেকটি থিংকট্যাংক উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া ইনস্টিটিউটের পরিচালক মাইকেল কুগেলম্যান বলেছেন, ‘মুনিরের সামনে এখন দুটো চ্যালেঞ্জ। এক. সেনাবাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দুই. সরকার ও ইমরান খানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে কাজ করা।’

প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিজেকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে সেনাবাহিনীর হাত ছিল বলে অভিযোগ করেছিলেন। তারপর প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন শাহবাজ শরিফ। কিন্তু তাঁকে মেনে নিতে পারেননি ইমরান। আগাম নির্বাচনের দাবিসহ নানা ইস্যুতে পাকিস্তানজুড়ে আন্দোলন করে যাচ্ছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ ও ইমরানের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই সম্পর্কের বরফ গলানোও নতুন সেনাপ্রধানের সামনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

আবার তাঁর পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক তিনি কীভাবে সামলাবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তিনি বিদায়ী সেনাপ্রধান বাজওয়ার খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বাজওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের আপাতত নড়বড়ে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা করেছিলেন, ধারণা করা হচ্ছে, আসিম মুনিরও হয়তো তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে সেই পদাঙ্কই অনুসরণ করবেন। ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছিলেন বাজওয়া। সেই উদ্দেশ্যে গত বছর ভারতের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তিও নবায়ন করেছিলেন বাজওয়া। আসিম মুনিরও সেই ধারা অব্যাহত রাখেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এ দিকে ভারত কীভাবে আসিম মুনিরকে গ্রহণ করে, সেটিও দেখার বিষয়। কারণ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলওয়ামা শহরে হামলা করেছিল পাকিস্তান। সে সময় পাকিস্তানের ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) প্রধান ছিলেন আসিম মুনির। তাঁকে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সাবেক প্রধান জাভেদ নাসিরের ভাবাদর্শী মনে করা হয়। ১৯৯৩ সালে জাভেদ নাসির আইএসআইয়ের প্রধান থাকা অবস্থাতেই মুম্বাইয়ে হামলা হয়েছিল, যে হামলার জন্য পাকিস্তানকে বরাবর দোষারোপ করে থাকে ভারত। আসিম মুনিরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে ভারত নিশ্চয় এসব ইতিহাসও আমলে নেবে।

আগামী ১৯ নভেম্বর নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেবেন আসিম মুনির। তারপর থেকে ধীরে ধীরে জানা যাবে, সেনাপ্রধান হিসেবে তিনি পাকিস্তান ও বহির্বিশ্বের জন্য কেমন হবেন।

তথ্যসূত্র: ডন, সিএনএন, রয়টার্স, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *