সাইবার বুলিং থেকে কি নারীদের মুক্তি নেই

মতামত

ঘটনা ১: নোভা (কাল্পনিক নাম) সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছে, প্রথম ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছে। কিন্তু এর পর থেকে নোভার অ্যাকাউন্টে অশ্লীল খুদে বার্তা, ছবি আসছে। এতে সে মানসিকভাবে খুবই বিব্রত হয়ে পড়েছে।

ঘটনা-২: শোভার (কাল্পনিক নাম) নাম ও ছবি ব্যবহার করে কেউ একজন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছে এবং সেই অ্যাকাউন্ট থেকে শোভার আত্মীয়দের বিভিন্ন রকম অশ্লীল ছবি পাঠানো হচ্ছে, শোভার ছবি দিয়ে প্রযুক্তির অপব্যবহার করে অশ্লীল ছবি বানানো হচ্ছে এবং তা ফেসবুকে প্রকাশ করা হচ্ছে। এতে শোভা ও তার পরিবারকে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

আমরা উপরিউক্ত ঘটনা দুটি সাইবার বুলিংয়ের আওতায় ফেলতে পারি। সাইবার বুলিং হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুক্তভোগীর ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া আইডি খুলে তার ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রচার করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইডি হ্যাক করা, পাসওয়ার্ড চুরি করা, পর্নোগ্রাফির ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে কাউকে বিব্রত করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেয়েদের বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা।

প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনে দেখতে পাই, ‘এ বছরের জানুয়ারিতে একটি ছাত্রীর ছবি ও পরিচয় ব্যবহার একটি আইডি খোলা হয় এবং সেই ছাত্রীর ছবি অন্য কারও আপত্তিকর ছবির সঙ্গে সম্পাদনা করে একের পর এক আপলোড করতে থাকে এবং ছাত্রীর আত্মীয়দের আইডিতে ছবিগুলো দেওয়া হয় ও হুমকি দেওয়া হয়।’

এ রকম ঘটনা সমাজে অহরহ ঘটেই চলেছে। আমরা গত দুই বছরে পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেনে (পিসিএসডব্লিউ) আসা অভিযোগ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছবি ও পরিচয় গোপন করে ভুয়া আইডি খুলে ভুক্তভোগীর ছবি, ভিডিও ও তথ্য প্রকাশ করে, এ রকম অভিযোগ এসেছে ৪৩ শতাংশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইডি হ্যাক, পাসওয়ার্ড চুরি করে অ্যাকাউন্টের দখল নেওয়া, এ রকম অভিযোগ ১৩ শতাংশ, পূর্বপরিচয় বা সম্পর্কের জের ধরে অন্য কোনোভাবে প্রাপ্ত ছবি, ভিডিও বা তথ্য প্রকাশের হুমকি দিয়ে টাকা বা সুবিধা আদায় করার অভিযোগ ১৭ শতাংশ।

মুঠোফোনে কল করে বা খুদে বার্তা পাঠিয়ে হয়রানি ১০ শতাংশ; বিভিন্ন মাধ্যমে অশ্লীল শব্দ, লেখা, ছবি বা ভিডিও হয়রানির অভিযোগ ৯ শতাংশ। এর বাইরে অন্যান্য অভিযোগ রয়েছে আরও ৮ শতাংশ।

সাইবার বুলিংয়ে সবচেয়ে বেশি হেনস্তার স্বীকার হন নারীরা। ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর পিসিএসডব্লিউ যাত্রা শুরু করে। তখন থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ২ বছরে ২১ হাজার ৯৪১ নারী এ সংস্থার কাছে হয়রানির অভিযোগ করেছেন। এর মধ্যে এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৭ হাজার ৮৮৯টি অভিযোগ এসেছে। অর্থাৎ গড়ে মাসে ৭৮৯টি অভিযোগ।

এ ছাড়া ৯৯৯–এর উত্ত্যক্ত ও যৌন হয়রানির অভিযোগের গত চার বছরের কল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দিন দিন এমন ঘটনা বেড়ে চলেছে। এই জরুরি নম্বরে ২০১৮ সালে ৬৯২টি, ২০১৯ সালে ৭৩৭টি, ২০২০ সালে ৮৯৫টি এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৭১টি কল এসেছিল। ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৯ মাসে এসেছে ১ হাজার ৪৪৪টি কল। অর্থাৎ মাসে গড়ে ১৪১টি অভিযোগ। অর্থাৎ সাইবার বুলিং দিন দিন বেড়েই চলেছে এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে আরও বেড়ে গেছে।

সাইবার অপরাধ দূর করতে সরকার বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে। সাইবার নিরাপত্তা এবং সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত ও বিচারের উদ্দেশ্যে ২০০৬ সালে প্রণয়ন করা হয় তথ্য ও প্রযুক্তি আইন, যা ২০১৩ সালে আবার সংশোধন করা হয়েছে। ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি বহন, বিনিময়, মুঠোফোনের মাধ্যমে ব্যবহার করা, বিক্রি প্রভৃতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০১৫ সালে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ ও ২০১৮ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণীত হয়। সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার ২০১৩ সালে সাইবার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করে।

সাইবার বুলিংয়ের অপরাধীদের যথাযথ শাস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে ডিজিটাল আইন-২০১৮–তে। ধারা-২৮ মোতাবেক, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করিবার বা উসকানি প্রদানের অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিকস বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করে বা করায়, যাহা ধর্মীয় অনভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের উপর আঘাত করে, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ০৫ বছর কারাদণ্ড বা অন্যূন ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

ধারা-২৯ মোতাবেক, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিকস বিন্যাসে মানহানিকর তথ্য প্রকাশ বা প্রচার করে, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৩ বছর কারাদণ্ডে বা অনধিক ১০ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে।’

ধারা-৩১ মোতাবেক, ‘যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করে বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, যা আইনশৃঙ্খলতার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ০৭ (সাত) হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি অনধিক ০৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত।’

সাইবার বুলিং সমাজকে একপ্রকার অসুস্থ করে দিচ্ছে। প্রতিনিয়তই মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার। তাই সাইবার বুলিং প্রতিকারে সমাজের প্রত্যেক মানুষের সাইবার আইন মেনে চলা উচিত। সমাজে সাইবার বুলিং সম্পর্কে সচেতন করা উচিত, সমাজে সাইবার বুলিংয়ের ক্ষতিকর দিক ও শাস্তি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা উচিত এবং আমাদের সাইবার বুলিং থেকে বেরিয়ে আসা উচিত। দেশ ও সমাজকে এই মানসিক অসুস্থতা থেকে রক্ষা করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *