জীবন অগাধ/নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ

আড্ডা মতামত

সত্যজিৎ রায় যে কাণ্ডটি করেছিলেন, তাতে মারলন ব্র্যান্ডোর একটি কাহিনি মনে পড়ে গিয়েছিল সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। ব্যাপারটা ছিল এ রকম: চার্লস চ্যাপলিন ঠিক করলেন, সোফিয়া লরেন আর মারলন ব্র্যান্ডোকে নিয়ে ছবি তৈরি করবেন। ছবিটির নাম ‘কাউন্টেস ফ্রম হংকং’। এ কথা শোনার পর স্টিফেন অলিভিয়ের জিজ্ঞেস করলেন মারলন ব্র্যান্ডোকে, ‘আপনি কি স্ক্রিপ্ট শুনেছেন?’

ব্র্যান্ডোর উত্তর, ‘না। চার্লস চ্যাপলিন ছবিতে আমাকে সুযোগ দিয়েছেন, সেটাই যথেষ্ট। ওর কাছে আবার স্ক্রিপ্ট শুনব কী, উনি যদি টেলিফোন ডাইরেক্টরি খুলে বলেন, এটাই চিত্রনাট্য, আমি সেটাই মেনে নেব।’

কেন সৌমিত্রের সে কথা মনে হলো?

সত্যজিৎ ঠিক করেছিলেন ‘শাখা প্রশাখা’ নামে একটি ছবি করবেন। সেই ছবিতে সৌমিত্রের জন্য রেখেছিলেন ছোট্ট একটি রোল। রোলটা ছিল মানসিকভাবে অসুস্থ একজন মানুষের। সত্যজিৎ সৌমিত্রকে ডেকে বললেন, ‘এই চরিত্রের মুখে হয়তো মাত্র পঁচিশটা সংলাপ থাকবে। কিন্তু চরিত্রটা শক্ত। এই চরিত্রে তোমাকে কিন্তু আমার লাগবে।’

সত্যজিতের এই কাণ্ড দেখে সৌমিত্র তো থ মেরে গেলেন। সত্যজিৎ রায় চাইছেন, আর তাতে না করা! পৃথিবীর যেকোনো অভিনেতাই তো তাঁর ছবিতে যেকোনো চরিত্র পেলে ধন্য হবে। আর তিনি কিনা সৌজন্যবশত সৌমিত্রকে এভাবে অনুরোধ করলেন!

চরিত্রটিকে সত্যজিৎ রায় তৈরি করেছিলেন নিখুঁতভাবে। যেভাবে চিত্রনাট্যে লেখা ছিল, সেভাবেই অভিনয় করেছেন সৌমিত্র। এমনকি টেবিল চাপড়ানোর দৃশ্যটাও লেখা ছিল স্ক্রিপ্টে।

সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে থেকে সৌমিত্রের উপলব্ধি, সত্যজিৎ যদি সৌমিত্রকে এক্সট্রার ভূমিকায়ও নামাতেন, তাহলেও কোনো প্রশ্ন না করে রাজি হয়ে যেতেন তিনি। এর কারণ হলো, সত্যজিৎ রায় কখনোই তাঁর ভাবভঙ্গিতে দেখাতেন না যে তিনি কেউকেটা কেউ। সাধারণ পরিচালকেরা শিল্পীর সঙ্গে যেভাবে কথা বলেন, তাঁর শিডিউল নেন, সত্যজিৎ ঠিক সেভাবেই নিতেন। সবার মতো হয়েই তিনি অনন্য হয়েছিলেন। 

সূত্র: সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, মানিকদার সঙ্গে, পৃষ্ঠা ৩৫-৩৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *