মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্তৃত্ব

মতামত

বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছে মেহনতি মানুষেরা। তাদের শ্রমেই রাষ্ট্রটি তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হওয়া থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু এই রাষ্ট্রে ওই মেহনতিদের দশাটি কেমন? দেড়শ বছর আগে হৃদয়বান মানুষেরা মন্তব্য করে গেছেন- এ দেশে শতকরা ৯৫ জন মানুষই বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। দেড়শ বছরে কত কী ঘটল! কত রকমের বিপ্লবই না সংঘটিত হলো! কিন্তু ওই শতকরা ৯৫ জনের ভাগ্য আর ফিরল না। তারা কেবল বঞ্চনা নয়; শোষণেরও শিকার হয়ে রইল। এমনকি স্বাধীনতা যুদ্ধে যাঁরা প্রাণ দিলেন, তাঁরাও যথাযথ স্বীকৃতি পেলেন না।
আমাদের ওই যুদ্ধটা ছিল একটি জনযুদ্ধ। জনগণ লড়েছে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। যুদ্ধে নিয়মিত বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন। বিদ্রোহ করে তাঁরাও যুদ্ধে যুক্ত হয়েছেন; প্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু যুদ্ধকালে তাঁরা কেউই পেশাদার সৈনিক ছিলেন না; পরিণত হয়েছিলেন জনযোদ্ধাতে। যুদ্ধ শেষে হিড়িক পড়ে গেল মুক্তিযোদ্ধাদের সার্টিফিকেট প্রদানের। অযোদ্ধা ও ভুয়া যোদ্ধারাও সার্টিফিকেট ও তদ্‌জনিত সুযোগ-সুবিধা হাতিয়ে নিল। সাধারণ যোদ্ধারা কে কোথায় হারিয়ে গেলেন, কেউ তার খোঁজ করল না।
বীরত্বের জন্য অনেক যোদ্ধাকেই পদক দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই পদক তালিকায় প্রধানত রয়েছেন সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। সর্বোচ্চ পদক বীরশ্রেষ্ঠ- পেয়েছেন সাতজন। তাঁরা সবাই সামরিক বাহিনীতে ছিলেন। ৬৮ জন বীরউত্তমের মধ্যে দু’জন ছাড়া সবাই সামরিক বাহিনীর। বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক হচ্ছে নিচের দুটি পদক। ওই প্রাপ্তিতে বেসামরিক যোদ্ধারাও কিছু সংখ্যায় আছেন, তবে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিই অধিক। ১৭৫ জন বীরবিক্রমের মধ্যে ১৪৫ জনই সামরিক বাহিনীর। ৪২৬ জন বীরপ্রতীকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ৩০৫ জনই সামরিক বাহিনীর সদস্য।
সবচেয়ে বড় অন্যায় করা হয়েছে নারীদের প্রতি। তাঁরা দু’ভাবে উপেক্ষিত- প্রথমত নারী হিসেবে, দ্বিতীয়ত মেহনতি শ্রেণির মানুষ হিসেবে। তাঁদের এমনকি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যথার্থ স্বীকৃতিই দেওয়া হয়নি। সম্মান জানানোর জন্য যাঁদের ‘বীরাঙ্গনা’ বলে আলাদা করা হয়েছে, সেটি প্রদানও পদবিপ্রাপ্তদের জন্য সম্মানের না হয়ে সামাজিক অসম্মানের কণ্টক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওদিকে যাঁদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ বলা হয়েছে, তাঁদের জন্য ওই পদবি পর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়নি। যে জন্য এখন ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ বলার রেওয়াজ চালু হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা যেন যথেষ্ট পরিমাণে বীর ছিলেন না।
মস্ত বড় ইতিহাস বিকৃতি ঘটেছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে যারা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে তাদের হাতে। পাকিস্তানি হানাদাররা তো শুরু থেকেই বলে আসছিল, মুক্তিযোদ্ধারা আসলে ভারতের সাহায্যপ্রাপ্ত দুস্কৃতকারী ভিন্ন অন্য কিছু নয়। শেষদিকে তারা চেষ্টায় ছিল বাংলাদেশের জনযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হিসেবে চালিয়ে দিতে। এ ব্যাপারে তাদের শত্রুপক্ষ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের যে অসম্মতি ছিল, তাও নয়। ভারতীয় ইতিহাস লেখকদের অনেকেই যুদ্ধটাকে ওভাবেই চিহ্নিত করার চেষ্টা নিয়েছেন। তাঁদের লেখা পড়লে ধারণা জন্মে- মুক্তিযোদ্ধাদের কাজ খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় বাহিনীকে পথঘাট চিনিয়ে দেওয়াসহ নানাভাবে সহায়তা দান করেছেন; এটা খুবই সত্য। কিন্তু যুদ্ধটা আসলে করেছে ভারতের নিয়মিত বাহিনীই। ঢাকায় পাকিস্তানি সেনাপ্রধানের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর প্রধান এমএজি ওসমানী যে উপস্থিত থাকতে পারলেন না, সে ঘটনাকে তাৎপর্যবিহীন মনে করার কোনো কারণ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *