জয়নুলের ‘সংগ্রাম’

আড্ডা

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত সংগ্রামের ইতিহাস। এই সংগ্রাম যেমন ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনের দ্বান্দ্বিক দিকগুলোকে উন্মোচন করে, একইসঙ্গে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যৌথ চেতনার সংগ্রামের আখ্যান হয়ে ওঠে। একজন একক মানুষ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে। আবার সমাজের সম্মিলিত অধিকারের সংগ্রামে কিছু ব্যক্তি তাঁদের ব্যক্তিগত স্বার্থকে অতিক্রম করে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। দেশের আধুনিক শিল্পচর্চার পথিকৃৎ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্ম পর্যবেক্ষণ করলে মানব ইতিহাসের এই সংগ্রামের বিভিন্ন দিক প্রকাশ পায়।
সাত দশক ধরে সংগৃহীত ও সংরক্ষিত শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের বিভিন্ন উপাদান-উপকরণ ও তাঁর আঁকা ১২৫টি চিত্রকর্ম নিয়ে রাজধানীর ধানমন্ডির গ্যালারি চিত্রকে ‘সংগ্রাম’ শীর্ষক প্রদর্শনী চলছে। ১৩ ডিসেম্বর প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হয়। চলবে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এতে দেখা মিলবে দুর্ভিক্ষ, জীবন সংগ্রাম, প্যালেস্টাইনি মুক্তি সংগ্রাম, মনপুরা ‘৭০ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম সিরিজের ছবি। ১৯৩৯ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিন দশকের অধিক সময়ে আঁকা ছবি স্থান পেয়েছে এ প্রদর্শনীতে। প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে প্রদর্শনীটি।
প্রদর্শনীর কিউরেটর সুমন ওয়াহিদ জানান, ‘আবেদিন স্যারের চিত্রকর্ম নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। কাজের মধ্য দিয়েই মনে হলো, মানুষটি গোটা জীবনই সংগ্রামের ছবি এঁকেছেন। ভাবলাম, এ কনসেপ্ট থেকেই তো একটা প্রদর্শনী হতে পারে। এমন অনেক কাজই এর আগে প্রদর্শিত হয়নি। মানুষের নানাবিধ সংগ্রাম আবেদিন স্যারের কাজে ফুটে উঠেছে। বিভিন্ন সময়ের এ কাজগুলোকে পাশাপাশি রেখে দেখা যেতে পারে। এ ভাবনা থেকেই এ প্রদর্শনী আয়োজন করার চিন্তা করি। তারপর এ বিষয়ে অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আসে- কোন ধরনের কাজগুলোকে নিতে পারি, প্রদর্শনীতে আর কী কী থাকতে পারে। আবার আমরা তো স্বাধীনতার ৫০ বছরও পার করেছি। এ নিয়ে স্যারের (জয়নুল আবেদিন) কিছু কাজ রয়েছে, যা এর আগে কখনও প্রদর্শিত হয়নি। সেগুলোও সংগ্রামের ইতিহাস। এ ছাড়া জয়নুল আবেদিনের বেশ কিছু অদেখা চিত্রকর্মকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছে। রয়েছে শিল্পীর অনুশীলনভিত্তিক কাজ; যা কিনা একই ছবি একাধিকবার আঁকার মাধ্যমে শিল্পীর কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর ইঙ্গিত দেয়। সব মিলিয়ে জয়নুলের শৈল্পিক সংগ্রামের ধারাভাষ্য দেবে এই প্রদর্শনী। দর্শক কিংবা শিল্পরসিকদের জন্য এই প্রদর্শনীটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।’
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের চিত্রকর্মে ১৯৪৩ সালের মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের বিপরীতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম দেখা যায়। আবার ‘মনপুরা ৭০’ প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবকিছু হারিয়েও মানুষ আশার প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার সংগ্রামকেও তিনি মহিমান্বিত করেছেন তাঁর সৃষ্টিতে। বিশেষ করে তিনি অনন্য প্রতিভার আলোকে শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও সংগ্রামকে উদযাপন ও উদ্ভাসিত করেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ হওয়ার সাংস্কৃতিক সংগ্রামে জয়নুল ছিলেন অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। তিনি শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, লোকশিল্প সংরক্ষণ ও প্রসারে সমানভাবে নিবেদিত ছিলেন। বিপুল উৎসাহে বিভিন্ন আন্দোলনের ব্যানারের লেআউটও প্রস্তুত করেছিলেন। শুধু এ দেশেই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরও তাঁর হৃদয় ও তুলিতে ছিল সজীব।
‘গুনটানা’, ‘নিড়েন’, ‘খুঁটিবাঁধা গরু’, ‘কাদায় আটকানো গরুর গাড়ি’র চালকের ও পশু দুটির যৌথ প্রয়াস ইত্যাদিতে স্রোতের বিপরীত একটি মননশক্তির নিরন্তর সংগ্রাম দেখা যায়। দু’জন মানুষ গুন টানছে ও সেই বিপ্রতীপ টানের সংগ্রামে তাঁদের শরীর ধনুকের ছিলার মতো তীব্র টানে তির্যক। সেই বিপ্রতীপ টানের ব্যাপারটাই তাঁদের দেহে সঞ্চারিত। একটি খুঁটিবাঁধা গরু মাথা নিচু করে শরীরের সমস্ত শক্তিকে কেন্দ্রীভূত করে খুঁটির বাঁধন ছিঁড়ে নিজেকে মুক্ত করতে চাইছে। এসবই সংগ্রামের চিত্র। আবার নারী-অবয়বী ছবিতেও তিনি সংগ্রামের রূপ তুলে ধরেছেন।
সুমন ওয়াহিদ বলেন, “এ প্রদর্শনীর মূল লক্ষ্য হলো, জয়নুল আবেদিনের সৃষ্টির আলোকে মানুষের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনের বিভিন্ন বৈচিত্র্যের প্রকাশ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ‘সংগ্রাম’ প্রদর্শনীর মাধ্যমে আমরা দর্শকদের কাছে সেই সংগ্রামকে নতুন করে তুলে ধরতে চাই।”
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন দেশভাগের পর ফিরে এসেছিলেন বলে অনেক শিল্পী তৈরি হয়েছিল। তিনি শুধু নিজে শিল্পী নন, ছিলেন শিল্পী তৈরির কারিগর। তাঁর আঁকা ছবিতে মানুষের পাশাপাশি রয়েছে রাজনৈতিক এবং একজন শিল্পীর অনুশীলনের সংগ্রামের গল্প। ‘সংগ্রাম’ প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে এসব কথা।
প্রদর্শনীর ১২৫টি চিত্রকর্মের মধ্যে ১২২টি নেওয়া হয়েছে শিল্পীর পরিবারের কাছ থেকে। আর তিনটি চিত্রকর্ম সংগ্রহ করা হয়েছে একজন সংগ্রাহকের কাছ থেকে। প্রদর্শনীতে একটি খেরোখাতা ও শিল্পীর অঙ্কনের উপকরণও উঠে এসেছে। জয়নুল আবেদিনের ছেলে প্রকৌশলী মইনুল আবেদিন জানান, বাড়ির বিভিন্ন ট্রাংকে, শিল্পাচার্যের খেরোখাতায় পাওয়া গেছে অনেক দুর্লভ ছবি। মুক্তিযুদ্ধের সময় যাত্রাপথে খাতা কিনেও তিনি ছবি এঁকেছেন। এসব ছবি স্থান পেয়েছে এ প্রদর্শনীতে। তিনি আরও বলেন, ‘এই কৃতিত্ব সম্পূর্ণই আমার মায়ের। তিনি খুব যত্ন করে বাবার অনেক কাজ ও যাবতীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে রেখেছিলেন বলে এগুলো এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক জানান, জয়নুল আবেদিন তাঁর ছবিতে মানুষ, রাজনীতি ও শিল্পীর অনুশীলন- এই তিন ধরনের সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন।
বিশ শতকের ত্রিশের দশকে এক নিম্ন মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলিম পরিবার থেকে শিল্পের পথে যাত্রার যে সাহস জয়নুল আবেদিন দেখিয়েছিলেন, তার মধ্যেই তাঁর সংগ্রামী মানসিকতার প্রকাশ ঘটে। সেই সংগ্রাম যেমন ছিল নিজ দারিদ্র্যের সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে, তেমনি ছিল চারুশিল্প সম্পর্কে ধর্মীয় নানা বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যার বৃত্ত ভেঙে শিল্পে লগ্ন হওয়ার মধ্যেও। মফস্বল শহর ময়মনসিংহ থেকে মহানগরী কলকাতার বান্ধবহীন পরিবেশে যাওয়ার সংকল্পের মধ্যে যেমন ছিল অনিরাপত্তার বোধ, তেমনি ছিল ভবিষ্যৎ জীবন-জীবিকা সম্পর্কেও ঘোরতর অনিশ্চয়তার উপলব্ধি। এসব বাস্তব ও কাল্পনিক বাধা অতিক্রম করে কলকাতার আর্ট স্কুলে আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামও তাঁর জন্য কম বন্ধুর ছিল না।
১৯৪৭ সালের রাষ্ট্রীয়-রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর ঢাকা আগমন আরেক সংগ্রামের ক্ষেত্র তৈরি করে। এই সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল একটি জাতিকে শিল্পের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট করার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ সংগ্রামের রূপটি আরও কঠিন, ব্যাপক ও বিস্তৃত। এই সংগ্রামে শিল্পী হিসেবে নিজের ত্যাগ স্বীকার ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নটি সামনে আসে। আধুনিক শিল্পবোধের সঙ্গে লোকশিল্পের সংযুক্তি ও সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে তিনি আধুনিক শিল্পকে নতুন মাত্রায় উন্নীত করেন। তিনি শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, লোকশিল্প সংরক্ষণ ও প্রসারে সমানভাবে নিবেদিত ছিলেন, তিনি বিভিন্ন আন্দোলনের ব্যানারের লেআউটও প্রস্তুত করেছিলেন।
শিল্পী হওয়ার জন্য তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছে কঠিন পথ। নিজ জীবনের সংগ্রাম স্পর্শ করেছে শিল্পীসত্তাকে। যে কারণে তাঁর ছবিতে উঠে এসেছে নিরন্তর সংগ্রাম- কখনও বেঁচে থাকার তাগিদে, কখনও দৈনন্দিন জীবন, আবার কখনও সামষ্টিক অধিকারের সংগ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *