যানজটের ক্ষতি নিরসনে সমন্বয় দরকার

মতামত

ঢাকা মহানগরের জীবনযাত্রা ক্রমেই জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে। সবচেয়ে প্রকট সমস্যাটি হলো যানজট। যানজট নিরসনে অনেক কথা বলা হচ্ছে, নানা রকমের উদ্যোগের কথাও শোনা যায়; কিন্তু সমাধান হচ্ছে না। যানজট শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোয় নয়, ছোট ছোট শহরেও ধীরে ধীরে প্রকট আকার ধারণ করছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও নিবন্ধনহীন যানবাহনের কারণে যানজট ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ২০২২ সালে ঢাকার সড়কে প্রতিদিন ৮০ লাখের বেশি কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়েছে, যা ২০১৭ সালে ছিল দিনে ৫০ লাখ। যানজটের কারণে প্রতিদিন যে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, তার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৪০ কোটি টাকা। এসব ক্ষতির কথা মাথায় রেখে ২০৩০ সাল নাগাদ ১২৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে মোট ছয়টি মেট্রো লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর মধ্যে এমআরটি-৬ এর আওতায় উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার লাইন উন্মুক্ত করা হবে ২৮ ডিসেম্বর। এতে ক্ষতি কমবে ৯ শতাংশ।

মেট্রোরেল যানজট নিরসনে কতটা ভূমিকা রাখবে সেটাও দেখার বিষয়। ঢাকায় অনেক মেগাপ্রজেক্ট করা হলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সেগুলো কোনো কাজে আসছে না। যানজট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। বিশেষ করে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিপণিবিতান প্রভৃতি জায়গায় যাতায়াত করা এক দুঃসহ যন্ত্রণা। রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহন প্রতিদিন যানজটের কারণে প্রায় সাড়ে ৭ ঘণ্টা আটকে থাকে। তাতে শ্রমঘণ্টা অপচয়জনিত জাতীয় উৎপাদনশীলতার ক্ষতি হচ্ছে। এখনই এর থেকে বের হওয়ার পথ বের করতে হবে। না হয় এ শহর দিন দিন মানুষের বসবাসের অযোগ্য শহরে পরিণত হবে। ট্রাফিক পুলিশ, নগরবিদ, গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমন্বয়হীনতার কারণে রাজধানীর যানজট নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না। এক সংস্থা রাস্তা খুঁড়ছে, আরেক সংস্থা গ্যাস লাইন ঠিক করছে। সমন্বয় করে কাজ করলে যানজট অনেকাংশে কমে আসবে। যানজট এখন রাজধানীর প্রধান সমস্যা। এ সমস্যা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। নগরীর লোক সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যাও। সে তুলনায় বাড়েনি সড়কের সংখ্যা ও পরিধি। যেখানে একটি নগরীর মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ এলাকা সড়ক থাকা দরকার, সেখানে ঢাকায় রয়েছে মাত্র ৭-৮ শতাংশ। সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকায় নগরীতে গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও গণপরিবহন সংকট হয়েছে তীব্র। গণপরিবহনের সংখ্যা ও সেবার মান বাড়লে এবং এ খাতে অরাজকতা বন্ধ হলে রাজধানীর সড়কে বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি নামানোর প্রয়োজন হতো না। দুর্নীতি যেমন অর্থনীতির জন্য ব্যাপক ক্ষতিকর, তেমনিভাবে যানজট কুঁড়ে কুঁড়ে দেশের অর্থনীতির বিরাট ক্ষতি করে চলছে।

যানজট এক নীরব দানব এবং এর থেকে উত্তরণ দরকার। ঢাকা মহানগরের যানজট নিয়ন্ত্রণে ক্ষমতা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বিকেন্দ্রীকরণ করা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *