জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা

আড্ডা

মুক্তিযুদ্ধের পর পরিকল্পনা কমিশন থেকে ফুলটাইম শিক্ষকতায় ফিরে এলেন মো. আনিসুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী শিক্ষার হাল খুব একটা ভালো ছিল না। অর্থনীতি বিভাগ থেকে সর্বোচ্চ গ্রেসমার্ক দিয়েও অনেককে পাস করানো গেল না। বিভাগীয় প্রধান বিদেশে গেলে সেই দায়িত্ব তখন পালন করছিলেন মো. আনিসুর রহমান। তিনি পরীক্ষার ফলাফল চূড়ান্ত করে, সিল করে রেজিস্ট্রারের অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

সে সময় হঠাৎ দেখা গেল মো. আনিসুর রহমানের অফিস ঘরের সামনে জটলা পাকিয়ে শিক্ষার্থীরা বলছে, ‘জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলবে না।’

তাঁদের থেকে দুজনকে ডেকে নিলেন ঘরে। ছাত্ররা বলল, ‘রেজাল্ট খারাপ হওয়ার জন্য আমরা দায়ী নই। যুদ্ধ করে আমাদের জীবন কেটেছে, পড়াশোনা করতে পারিনি।’

তাঁদের বললেন, ‘সব দিক বিবেচনা করেই সর্বোচ্চ গ্রেস দিয়ে ফলাফল তৈরি করা হয়েছে। এখন উপাচার্যের কাছে গিয়ে দেখতে পারো।’ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কাছে যাওয়ার পর সব শুনে মো. আনিসুর রহমানকে একটা ব্যবস্থা নিতে বললেন তিনি। আনিসুর রহমান ভাবলেন, যদি সবার খাতাতেই ইন্টারনাল একজামিনাররা এক্সটারনাল একজামিনারের চেয়ে বেশি নম্বর দিয়ে থাকেন, তাহলে শুধু তাদের নম্বরটা রেখেই রেজাল্ট তৈরি করা যাবে। কিন্তু খাতা পরীক্ষা করে দেখলেন, সব ক্ষেত্রে এক্সটারনালরা কম নম্বর দেননি। সুতরাং কিছুই করা সম্ভব নয়।’

ছাত্ররা উপাচার্যের ঘরের সামনে অবস্থান ধর্মঘট করলেন। ক্ষণে ক্ষণে স্লোগান, ‘জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা চলবে না…।’মো. আনিসুর রহমান গেলেন শিক্ষার্থীদের কাছে। বললেন, ‘যেটুকু সাহায্য করা যায়, তা করেছি। এরপরও যদি তোমাদের মনে হয়, আমরা তোমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছি, তাহলে এই আমি তোমাদের সামনে দাঁড়ালাম। তোমরা আমার জীবন নিয়ে নিতে পারো। একাত্তরের পঁচিশে মার্চ তো মরেই গিয়েছিলাম, নিজেকে বাঁচাবার কোনো ক্ষমতাই আমার ছিল না। তোমরা যদি তোমাদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার বদলা নিতে চাও, তাহলে নাও।’ছাত্ররা মাথা নিচু করে বেরিয়ে গেলেন। 

সূত্র: মো. আনিসুর রহমান, পথে যা পেয়েছি, দ্বিতীয় পর্ব, পৃষ্ঠা ১৪৪-১৪৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *