সাক্ষাৎকার: পংকজ ভট্টাচার্য/রাজনীতিতে একটি নতুন মেরূকরণ দরকার

সাক্ষাৎকার

পোড় খাওয়া রাজনীতিক পংকজ ভট্টাচার্য বর্তমানে ঐক্য ন্যাপের সভাপতি, ‘সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডিয়াম সদস্য। ‘সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদবিরোধী মঞ্চ’-এরও অন্যতম সংগঠক তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনী গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সালে পংকজ ভট্টাচার্য ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পংকজ ভট্টাচার্যের জন্ম ১৯৩৯ সালে, চট্টগ্রামে।
সমকাল: আওয়ামী লীগ-বিএনপি বলয়ের বাইরের বাম-প্রগতিশীল দলগুলোকে নিয়ে একটি বিকল্প শক্তি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলবেন?
পংকজ ভট্টাচার্য: আমি যাঁদের সঙ্গে কথা বলেছি, তাঁদের প্রত্যেকেই অনুভব করছেন- রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় নেই। সংবিধান আছে, তবে সংবিধানের মূল সুর, মূল চেতনাবিরোধী কাজকর্ম চলছে। জনগণ ক্ষমতার মালিক। সেই মালিকানা ছিনতাই হয়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে চিন্তাশীল মানুষ, বিবেকবান মানুষ, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে নীতিনিষ্ঠ রাজনীতি করে আসছেন, তাঁদের মধ্যে চিন্তার উদ্রেক ঘটেছে। একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ-রাষ্ট্র গঠনের চেতনা আমরা মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে পেয়েছি। তা রক্ষা করতে হলে রাজনীতিতে একটি নতুন মেরূকরণ দরকার। আজকে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে স্বমহিমায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা; জনগণ তথা কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, যা সংবিধানে বারবার বলা হয়েছে- নিশ্চিত করা; সব মানুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করা; রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত করা; এ কাজগুলো করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চেতনা ধারণকারী বাম-প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তিকে কাছাকাছি এনে একটি প্রতিরোধ দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। এটি হবে বিদ্যমান দুই মেরূকরণের বাইরে আরেকটি নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির মেরূকরণ।

সমকাল: উদ্যোগটি কি আপনার একার, না আরও কেউ আছেন?

পংকজ ভট্টাচার্য: আমি একা নই। আমার সঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির কথা হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের খালেকুজ্জামানসহ নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে কথা হয়েছে। বাংলাদেশ জাসদ- মূলত তার প্রধান নেতা শরীফ নুরুল আম্বিয়ার সঙ্গে কথা হয়েছে। এটি নিয়ে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামের নতুন সাধারণ সম্পাদক এবং তাঁর কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে কথা হয়েছে। এ আলোচনা প্রাথমিকভাবে হয়েছে। এর পর সবাই বসে একটি রূপরেখা, ঘোষণাপত্র ঠিক করা হবে। সেই কাজটি বাকি।

সমকাল: আপনি বলছেন, রাষ্ট্র সংবিধান অনুসারে চলছে না; মানুষের ভোটাধিকার ভূলুণ্ঠিত। এগুলো বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলোও বলছে। তাদের সঙ্গে তাহলে আপনাদের ঐক্য হচ্ছে না কেন?
পংকজ ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, তারাও এসব কথা বলছে। বিএনপি যে ২৭ দফা দিয়েছে, সেখানে অনেক কথা আছে। কিন্তু সেগুলো কি কথার কথা, নাকি আসল কথা? এ ব্যাপারে জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা তাদের অর্জন করতে হবে। অতীতে তারা বহু প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। এ দুটি বিষয় তাদের পরিস্কার করতে হবে। অর্থাৎ জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়তে হবে এবং জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে হবে। জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে- অতীতের অপকর্মগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে না।

সমকাল: ধর্মীয় উগ্রবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অতীতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে আপনাদের ঐক্যও আমরা দেখেছি। এখন কি সে রকম কিছুর প্রয়োজন নেই?
পংকজ ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলছে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথা বলছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ধারায় দেশ কি এখন আছে? আজকে বাংলাদেশকে ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ’ বলে মনে হয়? আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বলছে। কিন্তু উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি হেফাজতের সঙ্গে কৌশলগত ঐক্য গড়ে তুলেছে। এখনও হেফাজত প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে সাক্ষাৎ করে; দাবিদাওয়া পেশ করে। সেই দাবিগুলো আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে, নাকি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চেতনা শিক্ষা দেয়? আজও জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয় না কেন? বিএনপি তাকে লালন করছে, বুঝলাম। কিন্তু তাকে নিষিদ্ধ করতে আপনার অসুবিধা কোথায়? হাইকোর্টের একাধিক রায় থাকার পরও কেন জামায়াত নিষিদ্ধ হচ্ছে না?

সমকাল: ১৪ দলীয় জোট গঠনেও আপনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন?

পংকজ ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, রেখেছিলাম। একসময় আবদুর রাজ্জাক বলে একজন ব্যক্তি ছিলেন; আবদুল জলিল বলে একজন ব্যক্তি ছিলেন। একসময় সৈয়দ আশরাফ বলে এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে মন খুলে দেশের স্বার্থে কথা বলা যেত। আজকে তা পারা যায় না। আজকে তো যে ছাত্রলীগের সঙ্গে একসময় আমরা ঐক্যবদ্ধ লড়াই করেছি, এক বিছানায় ঘুমিয়েছি; সেই ছাত্রলীগ অচেনা হয়ে গেছে!

সমকাল: এরশাদবিরোধী আন্দোলনে পাঁচদলীয় জোটের উত্থান থেকে বিকল্প শক্তি নির্মাণের কথা শুনে আসছি। আপনাদের বিকল্প নির্মাণের উদ্যোগে মানুষ আশাবাদী হবে?

পংকজ ভট্টাচার্য: এটি ঠিক, বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি দাঁড়ায়নি। তবে জাতীয় কিছু বিষয়ে সব রাজনৈতিক শক্তির ঐকমত্য দরকার, যা আমরা ৫১ বছরেও গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের ছোট একটি উদ্যোগ। হয়তো একটি বাতি জ্বালানোর ব্যবস্থা হবে এর মাধ্যমে; যেটি হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাতি; জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার বাতি। রাজনীতি যেন কেনাবেচার সামগ্রী না হয়; তার জন্য আমাদের উদ্যোগ। দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রকে ব্যবহার করার রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ক্ষীণকণ্ঠে হলেও আমরা তা বলে যাব। আমাদের একসঙ্গে হওয়ার মধ্য দিয়েই বিকল্প তৈরি হয়ে গেল- তা বলছি না। দীর্ঘদিন যে নীতিনিষ্ঠ রাজনীতি করেছি, সেই ধারাটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চাই।

সমকাল: বামদের একটি অংশ এখন আছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে, আরেকটি অংশ বিএনপির সঙ্গে। নতুন উদ্যোগে তাদের শামিল করার চেষ্টা কি হবে?

পংকজ ভট্টাচার্য: না। তারা তো স্বাধীনভাবে চিন্তা করে ঠিক করেছে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সঙ্গে কাজ করার। সংসদে দু-একটি আসন পেতে তারা সরকারের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে; কিন্তু তারা কি শক্তিশালী হয়েছে? কখনও কখনও আবার তাদের মধ্যে মতভেদও দেখা যায়। নীতিনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ হিসেবে যাঁরা জনগণের কাছে পরিচিত ছিলেন, তাঁদের কাছে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়।

সমকাল: সামনে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে নতুন নতুন জোট গড়ার প্রয়াস চলছে। আপনাদের উদ্যোগও কি তেমন?

পংকজ ভট্টাচার্য: নির্বাচনকেন্দ্রিক বলতে পারছি না; আবার নির্বাচনশূন্যও বলতে পারছি না। দু-একটি তত্ত্বাবধায়কের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন ছাড়া কোনো নির্বাচনই কারচুপিমুক্ত, গ্রহণযোগ্য হয়নি। সেই ধারায় আরেকটি নির্বাচন কাম্য হতে পারে না। আগামী নির্বাচনে জনগণ যাতে নির্ভয়ে অংশ নিতে পারে, সে রকম পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্র খাদে পড়ে যাবে। অগণতান্ত্রিক শক্তি ক্ষমতা নেবে না বলে কেউ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। নেপাল, ভুটানে দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়। কিন্তু কেউ সেই সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না। নির্বাচন কমিশনকে সবাই শ্রদ্ধা করে সেখানে। আমাদের এখানে নির্বাচন কমিশনের ওপরেও মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায়।

সমকাল: বিএনপি স্পষ্টভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। আপনারা কী প্রস্তাব করবেন?

পংকজ ভট্টাচার্য: এটি অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা হবে। তবে আমার ব্যক্তিগত মত; দলীয়ও বলতে পারেন। তা হলো, তিন জোটের রূপরেখায় তিন মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা বলা হয়েছিল। কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা এটি হতে পারে না। তাহলে দেখা যাবে তিন বছর পরপর ঝগড়া শুরু হবে নির্বাচনকালীন সরকারে কে থাকবেন, তা নিয়ে। ঐকমত্য হলে এখনও তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে পারে। কিন্তু স্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে নির্বাচন কমিশন যাতে গণআস্থায় পূর্ণ থাকে; সংবিধানে স্বীকৃত সব ক্ষমতা স্বাধীনভাবে, নির্ভয়ে প্রয়োগ করতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। আমার মতে, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন ইত্যাদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারলে তত্ত্বাবধায়ক লাগে না। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসের কিনারায় থাকবে, আর আমি সুষ্ঠু নির্বাচন পাব- সে প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *