পুঁজি, হাই-টেক এবং আমাদের ভবিষ্যৎ

মতামত

বাস্তুসংস্থান নীতিগুলো ঠিক না করে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দোহাই দিয়ে করোনাকে পরাজিত করার স্লোগান তুলেছিলাম। দুই বছরেও করোনা আমাদের শেখাতে পারেনি, ভাইরাস আমাদের আক্রমণ করেনি; বরং তাদের জায়গা আমরা দখল করেছি। 

শিকারি জীবনের একাকিত্ব ঘোচানোর জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল মানবের তরে মানবের উন্মোচন। এর মধ্যে রয়েছে—পারস্পরিক বোঝাপড়া, অনুভবের গভীরতা, জীবনকে আরও গভীরভাবে ভাবা। আর তা করতে মানবজাতির প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল খাদ্যের নিশ্চয়তা। বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশে প্রাচীন গুহাচিত্রগুলো যে পথ নির্দেশনা দিয়েছিল তা হলো, অভিজ্ঞতার বিশ্লেষণ, ভবিষ্যতের রূপরেখা, বিমূর্তায়নে চিন্তার জাল বিস্তার করা। সম্ভবত এরই একটা পথ বেয়ে সেই খাদ্যনিশ্চয়তা এনে দিয়েছিল কৃষি উদ্ভাবনের। পথ তৈরি হয়েছিল মহাজাগতিক অভিযানের এবং তা বহির্জাগতিক বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছিল। কারণ ড্রেক সমীকরণ মতে, মিল্কিওয়েতে প্রতি ১০০টি প্রাযুক্তিক সভ্যতার জন্ম হলে একটির বিকাশ ঘটে। যদিও এতটা সীমিত জ্ঞানে অথবা এই মুহূর্তে এ ধরনের যৌক্তিক সিদ্ধান্তে যাওয়া উচিত হবে না।

এখন প্রাযুক্তিক আত্মধ্বংসের কড়া নাড়ার শব্দ যেন আমাদের বলছে, কৃষি উদ্ভাবনে ঘর আর পথের ভাবনায় যে দূরযাত্রার প্রস্তুতি ছিল, সেখানে মারাত্মক কোনো বিচ্যুতি ঘটেছিল। ইতিহাসের প্রারম্ভ থেকে ছুটে চলা মানুষ কেন যাযাবর জীবন থেকে সরে আসতে চেয়েছিল?

আজকের পত্রিকা অনলাইনের সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

ইউভ্যাল হারারি তাঁর ‘সেপিয়েন্স’ বইয়ে একটা কথা লিখেছেন। প্রথমে তা মজাই লেগেছে, পরে তা মারাত্মক হয়ে কানে বেজেছে। মানুষ কি ধান, গম গার্হস্থ্যায়ন করেছে, না ধান, গম মানুষকে গার্হস্থ্যায়ন করেছে। বর্তমান সময়ে কৃষি উদ্ভাবনে যে নিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা সৃজনশীলতাকে বাধা দেয় অথবা শুধু নিজ অস্তিত্বের চিরকালীন অবস্থানের রেশ স্থবিরতায় ফেলে দেয়। প্রথমটি ঠিক মানা যায় না, দ্বিতীয়টাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তা হলো, নির্ভাবনার আশ্রয়ের লোভ কানা গলিতে নিয়ে ফেলছে না তো?

আমাদের এই টিকে থাকাকে কী আরেকটু শান্তিপূর্ণ, সহনশীল করা যেত, নমনীয়তার মধ্য দিয়ে নিয়ে কি যাওয়া যেত? যদিও দ্বিজেন শর্মা বলতেন, অস্বাভাবিক পুঁজির কেন্দ্রীকরণ ছাড়া মহাজাগতিক অভিযানগুলো সম্ভব ছিল না। নিউরোলজিস্ট পল ডি ম্যাকলিনের প্রভোকেটিভ ইনসাইট তত্ত্ব অনুসারে মস্তিষ্ক বিকাশের অসংগতি পুঁজিকেন্দ্রিক এই ব্যবস্থাকে সমাজের প্রবৃত্তিগত রূপ দিয়েছে; যা অধঃপতিত সমাজের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

এমনকি সাংস্কৃতিক বিবর্তনের যাত্রাপথে শুধু টিকে থাকার জন্যই নয়, নিকটতম প্রজাতিগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষভাবে বোঝাপড়ার অভাবে, শ্রেষ্ঠত্বের লোভে একে অপরকে ধ্বংস করেছি, যা এখন আমরা নিজেদের মধ্যে, শিক্ষা থেকে সব কাঠামোয় এটার বিস্তার ঘটিয়েছি, সমাজবিজ্ঞানী ও বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানীরাও তা স্বীকার করেন। আমাদের সেই প্রজাতির ভাইবোনেরা নেই, যাদের সঙ্গে মিশে আমাদের অভিজ্ঞতার পরিসর বাড়াব। তাহলে এমনকি আমাদের রেখে আসা পাথরযুগের স্মৃতিকে যাচাইয়ের শেষ ভরসা হিসেবে নিকটাত্মীয় শিম্পাঞ্জির বিলুপ্তির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই হাই-টেক বা অত্যাধুনিক প্রযুক্তি? এখনো বয়ঃসন্ধিকালকে সামর্থ্য নিয়ে মোকাবিলা করতে পারছি না। ফলে নতুন এই বিপদ (প্রাযুক্তিক বয়ঃসন্ধিকাল) পরস্পরকে মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে তুলছে। 

সোলার ইকোনমি গ্রন্থের লেখক হারম্যান শিয়ারের মতো অনেকেই মনে করেন, জীবাশ্ম শক্তি থেকে সৌরশক্তিতে পদার্পণের ওপর অনেকটাই এ বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এমনকি এই শতাব্দীর প্রারম্ভে অনেক খ্যাতনামা পত্রিকাই দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে পৃথিবী রয়েছে বলে অভিহিত করেছিলেন। অথচ সেসব ভুলে হঠাৎ করেই চতুর্থ বিপ্লবের বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের জয়গান শুরু করল, যাকে নিয়ে মারাত্মক আশঙ্কার কথা স্টিফেন হকিং নিজেই বলেছিলেন। অথচ সৌরশক্তির ব্যবহারে ব্যাপক পুঁজির দরকার নেই; বরং দরকার অগুনতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগ এবং ছোট ছোট মাপের স্থাপনা। এভাবে প্রত্যেক মানুষের অংশগ্রহণে সৌরশক্তির ব্যাপক ব্যবহার সম্ভব। তাই রাজধানীকেন্দ্রিক মনোযোগ এখানে অচল এবং প্রাযুক্তিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো করতে বড় ট্রানজিশনাল বিজনেস গ্রুপ বা মেগা সিটির প্রয়োজন পড়বে না; বরং ছোট ও মধ্যম আকারের ফার্ম এবং পল্লি অঞ্চল থেকে তা সম্পন্ন করা সম্ভব। স্বভাবগত বিকেন্দ্রিক চরিত্রের ডিজিটাল প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হলে বিকেন্দ্রিকতা ত্বরান্বিত হবে। ফলে পুঁজিকেন্দ্রিকতা এখানে নেই। এ ধরনের অগ্রগতি ও সুবিধা সমাজকে নতুন রাজনৈতিক ভিত্তির দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য স্বাভাবিক প্রবণতা তৈরি করতে পারে।

সবচেয়ে বড় কথা, কম বিশৃঙ্খলা ঘটিয়ে শক্তির এই প্রাপ্যতাকে সভ্যতার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি বিবেচনা করা ভীষণভাবেই যৌক্তিক ছিল। এই পদার্পণে কি খুব দেরি করে ফেলেছি? কিছু হিসাব বলছে, অন্তত ৩০ বছর আগেই নিশ্চিতভাবে এটা সম্ভব ছিল। আর্থার সি ক্লার্কের মতো মানুষেরাও তা-ই ভেবেছেন। কিন্তু ক্ষমতালোভ, পুঁজিকেন্দ্রিকতা যারা নিয়ন্ত্রণ করে, বারবারই তাদের নিজস্ব কৌশলে বিষয়টা পিছিয়ে দিচ্ছে। বাণিজ্যিক প্রবণতার ধারকেরা হয়ে উঠছে সমাজের নায়ক।

আমাদের জীবনযাপন ব্যবস্থায় এমন সব ভোগ্যপণ্যের প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছি, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে প্রভাব বিস্তার করেছি এবং গণমাধ্যমগুলোতে আমরা এমন সব উপদেশ বিতরণ করে চলেছি, যেমন কীভাবে নদী-নালা, জীবজগৎ, এমনকি শরীর-স্বাস্থ্য ধ্বংস করে সুখের স্বর্গ গড়ে তুলতে পারি। বাস্তুসংস্থান নীতিগুলো ঠিক না করে ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দোহাই দিয়ে করোনাকে পরাজিত করার স্লোগান তুলেছিলাম। দুই বছরেও করোনা আমাদের শেখাতে পারেনি, ভাইরাস আমাদের আক্রমণ করেনি; বরং তাদের জায়গা আমরা দখল করেছি। আমাদের অনিয়ন্ত্রিত, ভারসাম্যহীন জীবনযাপনের সুযোগ নিয়ে তারা আমাদের ভেতর প্রবেশ করেছে।

সঠিকভাবে স্কুলিং হচ্ছে না, সামাজিক পটভূমি তৈরি হচ্ছে না। ফলে হায়রার্কি বা ক্ষমতার কালচারের বিপক্ষে কিছু দাঁড়াতে পারছে না। পৃথিবীতে একসময় প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা ছিল না।

অপ্রাতিষ্ঠানিক লোকজ ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল জ্ঞানচর্চা। তবে প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা অর্জিত জ্ঞানকে কাঠামো দিয়েছিল, প্রাঞ্জল করেছিল। এটা ডকুমেন্টেশন ও সংরক্ষণেও সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু নতুন নতুন চিন্তা ও ধারণার উদ্ভব ঘটাতে প্রাতিষ্ঠানিকতার পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক চর্চাকে বন্ধ করতে বলেনি। কেননা, এটা বন্ধ হলে একটা পর্যায় নতুন চিন্তার উদ্ভব ও উত্তরণের পথ হারিয়ে ফেলবে এবং একই গোলক ধাঁধায় ধাক্কা খাবে। তাই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন নিজস্ব চর্চার পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক চর্চার সংযোগ সেতু তৈরি করা। এটা নমনীয়তা, সহনশীলতার পাশাপাশি বোঝাপড়ার বিস্তার ঘটায়। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকতার দৃঢ় কাঠামোর বেড়াজালে, অপ্রাতিষ্ঠানিক তথা গণমানুষের চর্চাকে অবহেলার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আরও সর্বনাশা ব্যাপার হলো—বিজ্ঞানের তথ্যগুলোকে প্রত্যেকে তার গোপন সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করছে। যেখানে সহনশীলতা, নমনীয়তাই টিকে থাকার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তা অর্জিত হতে পারে গণতান্ত্রিক চর্চায়, এই চর্চাই বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কেননা, বিজ্ঞান মানে তো পর্যবেক্ষণ, যুক্তিবোধ এবং শুধু বিজ্ঞানীদের মধ্যে নয়, প্রতিটি জাতি ও রাষ্ট্রের মধ্যে তথ্যের বিনিময়। তারপর স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, যা আসলে গণতান্ত্রিকতা, স্বচ্ছতা এবং সামগ্রিকভাবে একটা প্রাকৃতিক সত্যকে উদ্‌ঘাটন। মানুষের জন্য যেমন কল্যাণকর, তেমনি কঙ্গোর শিম্পাঞ্জির বেলায়ও তা সত্য। বিজ্ঞান এসব কথা বলে অপেক্ষাকৃত কম বিশৃঙ্খলা ঘটিয়ে নিজেদের উন্মোচন করে থাকে।

অনেকেই আমাদের বলেন ব্লু মুনের মতো, নদীর বাঁকে বাঁকে অনুষ্ঠানগুলোতে আমাদের লক্ষ্য কী? এই মহাজাগতিক পথচলায় আমরা ভাবি বা আমাদের উদ্দেশ্য হয়তো, যে শিশুটি মহাজগৎটি দেখার প্রচেষ্টায় অংশগ্রহণ করে; বড় হয়ে যদি, নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে, বয়ে যাওয়া জলের যে শব্দটি শৈশবের স্মৃতিতে তার রয়ে গেছে, তা শুনতে পায়; তখন তারা বুঝতে পারবে, রাজা-মহারাজা নয়, নেতৃত্বের প্রতি অন্ধবিশ্বাস নয়, মানুষ শুধু টিকে থাকতে পারবে পরস্পরের প্রতি বোঝাপড়া, সহনশীলতা, নমনীয়তার অর্জনে; যা শেখাবে যন্ত্রকে নয়, নিজেকে উন্মোচন করা। তবেই উপলব্ধি করব মানবিকতাকে, এ জীবনকে, এ বিশ্বকে।

দুর্ভাগ্য হচ্ছে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়ীরাই হচ্ছে আইনপ্রণেতা বা রাষ্ট্রক্ষমতায় অথবা উল্টোটা।

জীবনানন্দ দাশের মতো কবিরাও বলেন, পৃথিবীর গভীরতর অসুখ এখন।

লেখক: বিজ্ঞান বক্তা ও সম্পাদক, মহাবৃত্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *