মেট্রোরেলে চড়ে উচ্ছ্বসিত না পেরে মন খারাপ

বাংলাদেশ

বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল বাণিজ্যিকভাবে চালুর প্রথম দিনে গতকাল বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানীর দিয়াবাড়ী ও আগারগাঁও স্টেশনে ছোটেন হাজার হাজার মানুষ। কয়েক ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষার পর তাঁদের মধ্যে যে তিন হাজার ৮৫৭ জন মেট্রোরেলে ট্রেনে চড়ার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরা ছিলেন উচ্ছ্বসিত। সুযোগ না পেয়ে বাকি হাজারো মানুষ ফিরেছেন মন খারাপ করে।
প্রথম দিনেই টিকিটে হয়েছে বিড়ম্বনা। ভাঙতি টাকার অভাবে দুই স্টেশনের ছয়টি ভেন্ডিং মেশিনই সকাল ৮টায় টিকিট বিক্রি শুরুর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বিকল হয়ে পড়ে। তাই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে স্টেশনের কাউন্টার থেকে নগদ টাকায় কিনতে হয়েছে ‘সিঙ্গেল জার্নি’র টিকিট। বিকল হওয়ার আগে অনেকেই ভেন্ডিং মেশিনে টাকা দিয়ে বাড়তি টাকা ফেরত পাননি।

সূর্য ওঠার আগে পৌষের কনকনে শীতে ভোর সাড়ে ৫টায় আগারগাঁও স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীর লাইন ছাড়িয়ে যায় এক কিলোমিটার দূরের পাসপোর্ট অফিস পর্যন্ত। একই অবস্থা ছিল উত্তরা নর্থ (দিয়াবাড়ী) স্টেশনে। ঠিক ৭টা ৫০ মিনিটে খোলে স্টেশনের দুয়ার। পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ঠিক ৮টায় দুই স্টেশন থেকে যাত্রা করে ঝকঝকে আধুনিক ট্রেন। প্রথম দিনে প্রতি ট্রিপে ২০০ যাত্রী তোলা হয়। যদিও ট্রেনের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা দুই হাজার ৩০৮ জন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে ট্রেন চলাচল।
মেট্রোরেলের নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএলের তথ্যানুযায়ী, আগারগাঁও-দিয়াবাড়ী রুট ১০ মিনিটে পাড়ি দেবে ট্রেন। ১০ মিনিটের ট্রেন চড়তে দুই-আড়াই ঘণ্টা রাস্তায় অপেক্ষার পর সৌভাগ্যবান যে ২০০ জন ট্রেনে ওঠার সুযোগ পান, তাঁরা মেতেছিলেন উৎসবে। মেট্রোরেলে প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রায় যাত্রী হওয়ার স্মৃতি মোবাইল ফোনে বন্দি রাখতে চলে ছবি তোলা ও ভিডিও করার প্রতিযোগিতা।
আগারগাঁও নেমে কুমকুম রহমান জানান, দুই সন্তানকে নিয়ে দিয়াবাড়ী থেকে এসেছেন। ট্রেন ভ্রমণ খুবই ভালো লেগেছে; অসাধারণ! মনে হচ্ছে বিদেশের ট্রেন। টিকিট পেলে আবার ট্রেনে যাবেন দিয়াবাড়ী। তাঁর ৭ বছর বয়সী মেয়ে রাইসা রহমান তখন মোবাইল ফোনে নানুকে জানাচ্ছিল জীবনে প্রথম মেট্রোতে চড়ার অভিজ্ঞতা। সে বলল, বিমানের মতো লেগেছে।

মেট্রো স্টেশনগুলোর উভয় দিকে চারটি সিঁড়ি, এস্কেলেটর ও লিফ্‌ট রয়েছে। কিন্তু প্রথম দিনে মাত্র একদিকের সিঁড়ি খোলা হয়। তা দিয়ে দোতলায় তথা কনকোর্স লেভেলে উঠে টিকিট কেটে, তা পাঞ্চ করে উঠতে হয় তৃতীয় তলা তথা প্ল্যাটফর্মে। সেখান থেকে চলে ট্রেন। তবে নিচতলার সিঁড়িতে ছিল পুলিশের কড়া পাহারা। সীমিত সংখ্যক যাত্রীকে দোতলায় উঠতে দেওয়া হয়।

পঙ্গু হাসপাতালের সাবেক চিকিৎসক অধ্যাপক আমির হোসেন বলেন, ২০০ টাকার নোট ভেন্ডিং মেশিনে দিয়েছিলেন। ট্রাভেল পাস (টিকিট) পেলেও বাকি টাকা তাঁর ফেরত আসেনি। এর পর মেশিনটি নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। তথ্যকেন্দ্রে গেলে বাকি টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
আরেকজন যাত্রী বলেন, আগারগাঁও-দিয়াবাড়ীর ভাড়া ৬০ টাকা। মেশিনে তিনটি ২০ টাকার নোট দিয়েছিলেন। একটি নোট গ্রহণ করেনি। পরে ১০০ টাকার নোট মেশিনে দিলে ট্রাভেল পাস বেরিয়ে আসে। কিন্তু বাকি টাকা ফেরত পাননি। ভেন্ডিং মেশিনও বিকল হয়ে পড়ে। টাকা ফেরত পাননি।
ডিএমটিসিএলের কর্মীরা মাঝেমধ্যে মেশিনগুলোকে সক্রিয় করলেও ফের অচল হয়। টিকিট কাটা ও ট্রেন পর্যন্ত পৌঁছাতে সহায়ক হিসেবে ছিলেন স্কাউট সদস্যরা। স্কাউট সদস্য ফেরদৌস বলেন, টিকিট পাঞ্চ করার সময় অনেকেই সমস্যার সম্মুখীন হন। ট্রেন থেকে নেমে স্টেশন থেকে বের হওয়ার সময় টিকিটটি কোথায় রাখতে হবে, তা নিয়েও সমস্যায় পড়েন।

ডিএমটিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) ইফতিখার হোসেন বলেন, নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সময় লাগে। ভেন্ডিং মেশিনে টিকিট কাটতে কেউ কেউ ৫০০ এবং ১০০০ টাকার নোট দিচ্ছেন। কিন্তু মেশিনে ভাঙতি টাকা কম থাকায় তা অচল হয়ে যায়।
স্টেশন সুপারভাইজার মিজানুর রহমান জানান, কিছু সমস্যার সমাধান তাঁরা নিজেরাও দিতে পারছেন না। পর্যায়ক্রমে সমাধান হবে।
মেট্রোতে চড়তে না পেরে হতাশা :দিয়াবাড়ীতে সকাল সোয়া ১১টায় জানানো হয়, ১৫ মিনিট পর আর কাউকে দোতলায় টিকিট কাউন্টারে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। তখনও রাস্তায় ছিল কয়েক হাজার মানুষের দীর্ঘ লাইন। রামপুরা থেকে আসা নাসিরুল ইসলাম জানান, ৭ বছরের মেয়েকে নিয়ে সকাল ৭টায় এসেছিলেন। এক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে স্টেশনেই ঢুকতে পারেননি। ট্রেন চড়তে না পেরে ফিরে যাচ্ছেন।

ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক সাংবাদিকদের বলেন, প্রথম দিনে সময়সূচি রক্ষায় সক্ষম হয়েছি। ১০টি ট্রেন চলেছে। টিকিট কাটা নিয়ে যেসব সমস্যা হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নিয়মিত যাঁরা ভ্রমণ করবেন, তাঁদের চেয়ে উৎসাহী লোকজনই বেশি প্রথম দিনে।
বিআরটিসির বাস কম :দিয়াবাড়ী থেকে উত্তরা হাউস বিল্ডিং পর্যন্ত এবং আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বিআরটিসির ৩০টি বাস ছিল। যেসব যাত্রী আগারগাঁও থেকে দিয়বাড়ীতে যান, তাঁরা পড়েন বিড়ম্বনায়। বাস কম থাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশায় গন্তব্যে যান বাড়তি ভাড়ায়।
রাতারাতি বসে গেছে দোকানপাট :এতদিন দিয়াবাড়ী শূন্য থাকলেও, মেট্রোরেল চালুর পরপরই গজিয়ে উঠেছে দোকানপাট, খাবার হোটেল। চায়ের দোকানে উপচে পড়া ভিড়।
৫০০ টাকায় এমআরটি পাস :স্থায়ী টিকিট তথা এমআরটি পাস পেতে লাগবে ৫০০ টাকা। এর মধ্যে জামানত ২০০ টাকা। বাকি ৩০০ টাকা ব্যালান্স, যা দিয়ে ভ্রমণ করা যাবে। বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা দিয়াবাড়ী ও আগারগাঁও স্টেশনে পাস দেওয়া হবে। এর আগে ডিএমটিসিএলের ওয়েবসাইট থেকে ফরম ডাউনলোড করে পূরণ করতে হবে। এমআরটি পাসে টাকা রিচার্জ করে যত খুশি ভ্রমণ করা যাবে। আছে ১০ শতাংশ ছাড়।

জরিমানা :এমএএন সিদ্দিক জানান, যাত্রীরা কীভাবে এমআরটি পাস বা সিঙ্গেল পাস ব্যবহার করবেন, তা চ্যালেঞ্জ। কেউ সিঙ্গেল টিকিট কাটার পর স্টেশনে দুই ঘণ্টা থাকলে জরিমানা করা হবে।
ডিএমটিসিএলের সচিব আব্দুর রউফ জানান, টিকিট হারিয়ে ফেলায় একজনকে ১০০ টাকা জমিরানা করা হয়েছে। আরেকজন জরিমানা গুনেছেন দুই ঘণ্টার বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে থাকায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *