ফিরে দেখা-এ বছর আলোচিত যাদের হারাল বিশ্ব

আন্তর্জাতিক

নানা ঘটন-অঘটনের বছর ছিল ২০২২। আর মাত্র এক দিন বাদেই অস্তমিত হবে এ বছরের শেষ সূর্য। বিদায়ী বছর আর স্বাগত বছরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকাচ্ছেন অনেকেই। দেখছেন, ফেলে আসা দিনগুলো কেমন ছিল। সবই যে মধুর স্মৃতি, তা তো নয়। আছে অনেক নোনাজলে মেশানো দুঃখের স্মৃতিও। যে বছর বিদায় নিচ্ছে, সে বছরের বেশ কিছু মৃত্যু কাঁদিয়েছে বিশ্ববাসীকে। এই মৃত্যুগুলো সত্যিকার অর্থেই বিশ্বের অপূরণীয় ক্ষতি করে গেছে। 

রানি এলিজাবেথ
কিংবদন্তি রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যু বিশ্বকে শোকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। এ বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ৯৬ বছর বয়সে স্কটল্যান্ডের বালমোরালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি। রানি এলিজাবেথ ছিলেন ব্রিটিশরাজের সবচেয়ে বেশি সময় সিংহাসনে থাকা একমাত্র রানি। প্রায় সাত দশক ধরে তিনি সিংহাসনে আসীন ছিলেন। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন তাঁর বাবা রাজা ষষ্ঠ জর্জের মৃত্যুর পর। সেটা ছিল ১৯৫২ সাল। ষষ্ঠ জর্জ মারা যান ১৯৫২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি। আর মাত্র ২৫ বছর বয়সে ওই বছরেরই জুনে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ সিংহাসনে আরোহণ করেন। 

মৃত্যুর পর ১০ দিন ধরে নানা আনুষ্ঠানিকতার পর ১৯ সেপ্টেম্বর মধ্য লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে তাঁর রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে যোগ দিয়েছিলেন সারা বিশ্বের নেতারা। 

শিনজো আবে
জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শিনজো আবে। ২০০৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবেই ছিলেন জাপানের সবচেয়ে কনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। ২০১২ সালে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো জাপানের প্রধানমন্ত্রী হন। অসুস্থতার কারণে ২০২০ সালে স্বেচ্ছায় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান শিনজো আবে। তবে ক্ষমতায় থাকা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ওপর যথেষ্ট প্রভাব ছিল তাঁর। 

শিনজো আবে জাপানের প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি। তাঁর বাবা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। আবে তাঁর সরকারের অর্থনৈতিক নীতির জন্য সুপরিচিত। পাশাপাশি তিনি প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করেছিলেন।

গত ৮ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ জাপানের পশ্চিমাঞ্চলের নারা শহরে রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় গুলিবিদ্ধ হন শিনজো আবে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখানেই মৃত্যু হয় তাঁর। 

মিখাইল গর্বাচেভ
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সূচনা করে ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করা মিখাইল গর্বাচেভ এ বছরের ৩০ আগস্ট মস্কোর স্থানীয় সময় দিবাগত রাতে ৯১ বছর বয়সে মারা যান। চিকিৎসকেরা বলেছেন, বার্ধক্যজনিত কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

গর্ভাচেভের মৃত্যুর পর বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো বলেছে, গর্বাচেভ সম্পর্কে যত প্রশংসা ও নিন্দা করা হয়েছে বিশ্বজুড়ে, তা হয়তো গত শতাব্দীর শেষ ও এখন পর্যন্ত এই শতাব্দীতে আর কোনো রাষ্ট্রনায়ককে নিয়ে করা হয়নি। সাম্যবাদের পূজারিরা মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকেছিলেন। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্ব মনে করে, গর্বাচেভ ছিলেন ভেদাভেদ ভুলে শান্তির অগ্রযাত্রার আইকন। 

গর্বাচেভের সঙ্গে বর্তমান রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সম্পর্ক ছিল বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। কারণ, গর্বাচেভ এমন সব নীতি গ্রহণ করেছিলেন, যা শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নকে পতনের দিকে নিয়ে গেছে। বিপরীতে পুতিন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক বিপর্যয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের অখণ্ডতায় বিশ্বাসী ছিলেন। 

ইভানা ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাবেক স্ত্রী ছিলেন ইভানা ট্রাম্প। তবে এটিই তাঁর একমাত্র পরিচয় ছিল না। তিনি ছিলেন ট্রাম্পের সব ব্যবসার অন্যতম সহযোগী। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যবসা ফুলেফেঁপে ওঠার পেছনে ইভানার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু অভিনেত্রী মারিয়া মাপলসের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের গুঞ্জন শুরু হলে বিয়ে ভেঙে যায় ট্রাম্প ও ইভানার। পরে ট্রাম্প মারিয়াকে বিয়ে করেন।

তবে মারিয়াকে বিয়ে করলেও ইভানাকে ভোলেননি ট্রাম্প। তাঁর মৃত্যুর পর নিজের সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেছেন, ‘নিউইয়র্ক সিটিতে নিজের বাসভবনে মারা গেছেন ইভানা ট্রাম্প। অনেক মানুষ তাঁকে ভালোবাসেন। তাঁদের আমি খুবই দুঃখের সঙ্গে এই খবর দিচ্ছি। তিনি ছিলেন সুন্দর ও অসাধারণ নারী। তিনি এমন জীবনযাপন করেছেন, যা অন্যদের উদ্বুদ্ধ করবে। তিন সন্তান ডোনাল্ড জুনিয়র, ইভাঙ্কা ও এরিককে নিয়ে তিনি গর্বিত ছিলেন। আমরাও তাঁকে নিয়ে একই রকম গর্বিত ছিলাম। রেস্ট ইন পিস, ইভানা।’ 

গত ১৪ জুলাই ৭৩ বছর বয়সে মৃত্যু হয় ইভানা ট্রাম্পের। নিউ ইয়র্ক পুলিশের একজন মুখপাত্র সে সময় বলেছিলেন, ‘বাসার সিঁড়িতে মৃত অবস্থায় পড়ে ছিলেন ইভানা। তাঁকে হত্যা করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না।’ 

আয়মান আল জাওয়াহিরি
ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার প্রধান সংগঠক ও কৌশলবিদ হয়েছিলেন আয়মান আল জাওয়াহিরি। তিনি মূলত ওসামা বিন লাদেনেরই স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, তিনি ওসামার মতো ক্যারিশম্যাটিক নেতা ছিলেন না বলে ইসলামিক স্টেট পশ্চিমে উল্লেখযোগ্য আক্রমণে উৎসাহিত হননি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গত ৩১ জুলাই তাঁর নিহত হওয়ার খবর দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আল-কায়েদার এই শীর্ষ নেতা আফগানিস্তানের কাবুলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন।

একজন ইসলামি জঙ্গি হিসেবে জাওয়াহিরির উত্থান কয়েক দশক আগে। বিশ্ববাসী প্রথম তাঁর নাম শুনেছিল ১৯৮১ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে হত্যার পর, যখন তিনি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন। পরে আদালত জাওয়াহিরিকে অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে তিন বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন এবং মূল অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। 

জাওয়াহিরি ছিলেন একজন প্রশিক্ষিত সার্জন। তিন বছর কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তিনি মিসর থেকে পাকিস্তানে চলে যান। সেখানে তিনি সোভিয়েত (তৎকালীন) বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধরত আফগানিস্তানে আহত ইসলামি মুজাহিদিন গেরিলাদের চিকিৎসার জন্য রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে কাজ করতে শুরু করেন। 

ওই সময়ই বিন লাদেনের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। সৌদি ধনকুবের ও আল-কয়েদার শীর্ষ নেতা ওসামা বিন লাদেন তখন আফগানিস্তানে যুদ্ধ করছিলেন। 

লতা মঙ্গেশকর
এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ব হারিয়েছে উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী লতা মঙ্গেশকরকে। লতা কয়েক সপ্তাহ ধরে কোভিড-১৯ ও নিউমোনিয়ায় ভুগে ৯২ বছর বয়সে ৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় তাঁর। লতার মৃত্যুর পর দুই দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছিল ভারত সরকার। 

ভারতের ইন্দোরে জন্মেছিলেন লতা মঙ্গেশকর। শুরুতে তাঁর নাম ছিল হেমা। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে যুক্ত হয়ে পড়েছিলেন চলচ্চিত্রের সঙ্গে। বাবা ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও মঞ্চ অভিনেতা। তাঁর মিউজিক্যাল প্লেগুলোতে লতা প্রথম অভিনয় শুরু করেন। ক্যারিয়ার অবশ্য শুরু হয়েছিল মারাঠি গান গেয়ে। সেটা ১৯৪২ সালে। আর ১৯৪৬ সালে প্রথম হিন্দি সিনেমায় গান করেন লতা। সিনেমার নাম ‘আপ কি সেবা মে’। গানের শিরোনাম ‘পা লাগু কার জোরি’। এর দুই বছর পর সুরকার গুলাম হায়দারের ‘মজবুর’ ছবিতে ‘দিন মেরা তোড়া’ গান করেন লতা। এরপর শুধু এগিয়েই গেছেন। 

লতা বিয়ে করেননি। সমগ্র জীবনটাই তুলে দিয়েছেন সংগীতের বেদিমূলে। পৃথিবীর ৩৬টি ভাষায় গেয়েছেন গান। 

পেলে
ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার পেলে বৃহস্পতিবার (২৯ ডিসেম্বর) রাতে সাও পাওলোয় আলবার্ট আইনস্টাইন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। সামাজিক মাধ্যম ইনস্টাগ্রাম পোস্টে পেলের মেয়ে কেলি নাসিমেন্তো লিখেছেন, ‘আমাদের সবকিছুর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। আমরা তোমাকে অসীমের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। বিদায়।’ গত নভেম্বর মাস থেকেই এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন সর্বকালের সেরা এই ফুটবলার। দীর্ঘদিন কিডনি ও প্রোস্টেট ক্যানসারে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। 

ফুটবল ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ জয় করেছেন তিনি। ক্লাব ও আন্তর্জাতিক ফুটবলের ২১ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১৩৬৩টি ম্যাচ খেলে ১২৮১ গোলের বিরল রেকর্ড রয়েছে পেলের। 

পেলের পুরো নাম করেন ‘এডসন অ্যারান্টিস দো নাসিমেন্ত’। ১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর ব্রাজিলের ত্রেস কোরাকোয়েস শহরের এক বস্তিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। দরিদ্র কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে পরিবারের অভাব-অনটন মেটানোর জন্য ছেলেবেলাতেই পেলেকে চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়েছিল। এ ছাড়া রেলস্টেশন ঝাড়ু দেওয়ার পাশাপাশি কিছুদিন জুতা পরিষ্কারের কাজও করেছিলেন। ছোটবেলা থেকেই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন ছিল তাঁর। ১৬ বছর বয়সে পেলের সান্তোসের মূল দলে অভিষেক হয়। সেবার ব্রাজিলের পেশাদার ফুটবল লীগে স্যান্তোসের হয়ে লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন তিনি। আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি সর্বকালের সেরা এই ফুটবলারকে। 

পেলে ইতিহাসে অমর অক্ষয় হয়ে থাকবেন ফুটবলের মাধ্যমে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য এবং সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্রাজিলিয়ানদের ফুটবলার হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। 

তথ্যসূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস, এনডিটিভি, ডয়চে ভেলে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *