খন্দকার মাহবুব হোসেন আর নেই

বাংলাদেশ ব্রেকিং নিউজ

প্রখ্যাত ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন মারা গেছেন। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন।

এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ শনিবার রাত ১০টা ৪০ মিনিটে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর জুনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির এ সংবাদ নিশ্চিত করেছেন।

ফুসফুসে হঠাৎ পানি জমায় গত ২৬ ডিসেম্বর খন্দকার মাহবুব হোসেনকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

এদিকে সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। তিনি মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছেন।

অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন ১৯৬৭ সালের ৩১ জানুয়ারি আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ওই বছরের ২০ অক্টোবর হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

১৯৭৩ সালে দালাল আইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত আদালতের প্রধান কৌঁসুলি ছিলেন খন্দকার মাহবুব হোসেন।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতে বেশ কয়েকবার সভাপতি ও বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি বাংলাদেশের ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত।

খন্দকার মাহবুব ২০০৮ সালে বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ছিলেন। ২০১৬ সাল থেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এই বর্ষীয়ান আইনজ্ঞ।

খন্দকার মাহবুব হোসেনের জন্ম ১৯৩৮ সালের ২০ মার্চ বরগুনার বামনায়। বাবা খন্দকার আবুল হাসান ছিলেন একজন শিক্ষাবিদ। প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় সেখানেই। পরবর্তীতে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে নারায়ণগঞ্জে চলে আসেন। ভর্তি হন নারায়ণগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে। এ সময় তিনি খান সাহেব ওসমান আলীর পরিবারে অবস্থান করেন। উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র থাকা অবস্থায় খন্দকার মাহবুব হোসেন ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে কারাবরণ করেন।  

খন্দকার মাহবুব হোসেন নারায়ণগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ে থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মেট্রিক পাস করেন। পরবর্তীতে ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী নটর ডেম কলেজে। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’অ্যাসোসিয়েশনের ভিপি নির্বাচিত হন। 

তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খানের জারি করা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করায় কয়েকজন সহযোগীসহ তিনি আবার গ্রেপ্তার হন। 

সামরিক আদালতে তাঁদের বিচার শুরু হয়। তিনি নিজেই নিজের মামলা পরিচালনা করেন এবং মামলা থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। তবে সামরিক শাসক তাঁকে এমএ পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয়নি। ১৯৬৪ সালে আইন পাস করে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। 

মুক্তিযুদ্ধের সময় নেপথ্যে থেকে সহায়তা করেন মুক্তিযোদ্ধাদের। ১৯৭১ সালের মার্চের মাঝামাঝিতে হাইকোর্টে আইনজীবীদের একটি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় বঙ্গবন্ধুকে সমর্থন দেওয়ার। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানসহ আইনজীবীদের নিয়ে জেলা কোর্টে একটি সমাবেশের আয়োজন করেন। ওই সমাবেশে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বক্তব্য দেন তিনি। যুদ্ধ চলাকালীন মুক্তিযোদ্ধারা তাঁর বাসাকে অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করতেন। আলমারিতে রাখা মোটা আইনি বইয়ের পেছনে লুকিয়ে রাখতেন গ্রেনেড।  

খন্দকার মাহবুব হোসেন ১৯৬৭ সালে হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। পরবর্তীতে আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আদালতের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে তিনি নিয়োগলাভ করেন।

১৯৮৮ সালের ১৭ জুলাই তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র  অ্যাডভোকেট হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি পদে চারবার (২০১০-২০১১, ২০১১-২০১২, ২০১৪-২০১৫ ও ২০১৫-২০১৬ সাল) নির্বাচিত হন । এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান পদে দুইবার (২০০৭-২০০৮ ও ২০১২-২০১৫ সাল) দায়িত্ব পালন করেন।

সমাজসেবায় বহুমুখী অবদান রেখেছেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। অন্ধ ও পঙ্গুদের জন্য ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (ভিটিসিবি) ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি তিনি। শিশু সংগঠন কচিকাঁচার উপদেষ্টা এবং জসীমউদ্দীন পরিষদের সম্মানিত পৃষ্ঠপোষক। ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ইউনিয়ন, এশিয়ান ব্লাইন্ড ইউনিয়ন ও ঢাকা রোটারি ক্লাবের সদস্য। 

এসব কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ নানা পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। জসীমউদ্দীন স্বর্ণপদক (২০০৬), কবি নজরুল স্বর্ণপদক (২০০৭), ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ স্বর্ণপদকসহ (২০০৮) বিভিন্ন পদকে ভূষিত হন খন্দকার মাহবুব হোসেন। 

আইনজীবী হিসেবে খন্দকার মাহবুব হোসেন অসংখ্য যুগান্তকারী মামলা পরিচালনা করেছেন। এর মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড সম্পর্কিত মামলা (আতাউর মৃধা বনাম রাষ্ট্র, ৭৩ ডিএলআর (এডি)২৯৮), শাজনীন হত্যা মামলা (সৈয়দ সাজ্জাদ মাইনুদ্দিন হাসান বনাম রাষ্ট্র, ৭০ ডিএলআর (এডি) ৭০), চাপা হত্যা মামলা (রাষ্ট্র বনাম খন্দকার জিল্লুর বারী, ৫৭ ডিএলআর (এডি) ১২৯), সালেহা খুকি হত্যা মামলা (এহতেশামুদ্দিন বনাম বাংলাদেশ, ৩৩ ডিএলআর (এডি) ১৫৪), আজম রেজা মামলা (রাষ্ট্র বনাম আজম রেজা, ৬২ ডিএলআর ৩৯৯), এরশাদ শিকদার বনাম রাষ্ট্র, ভিডিও ক্যাসেট মামলা (খালেদা আকতার বনাম রাষ্ট্র, ৩৭ ডিএলআর ২৭৫) অন্যতম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *