অর্থনীতি ধুঁকলেও বেড়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকের মুনাফা

অর্থনীতি

সদ্য বিদায়ী বছরে দেশের অর্থনীতি নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। এর মধ্যে ডলারসংকট, টাকার দরপতন, রিজার্ভ ঘাটতি, ডলার সাশ্রয়ে পণ্য আমদানিতে কড়াকড়ি এবং কয়েকটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের এলসি জালিয়াতি ও ভুঁইফোড় ঋণ উল্লেখযোগ্য। এসব সমস্যা সত্ত্বেও দেশের প্রায় সব বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। আর এ ক্ষেত্রে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড (আইবিবিএল)। তবে নিরীক্ষিত হিসাব না হওয়ায় এই মুনাফা দিয়ে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত চিত্র জানা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

বিভিন্ন ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতিতে ধাক্কার পরও ব্যাংকের পরিচালন মুনাফায় সবার শীর্ষে রয়েছে আইবিবিএল। ব্যাংকটি বিদায়ী বছরে মুনাফা করেছে ২ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা; আগের বছর মুনাফার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। মুনাফার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সোনালী ব্যাংক লিমিটেড। ব্যাংকটির মুনাফার পরিমাণ ২ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা; আগের বছরে মুনাফার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২০৭ কোটি টাকা।

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি সেলিম আর এফ হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে, এটা ঠিক নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে যে পরিচালন মুনাফা দেখানো হচ্ছে, তা প্রকৃত মুনাফা নয়। এর মাধ্যমে ব্যাংকের প্রকৃত চিত্র জানা যায় না। কারণ, এ মুনাফা থেকে খেলাপি ঋণ ও অন্যান্য সম্পদের বিপরীতে প্রভিশন (নিরাপত্তা সঞ্চিতি) সংরক্ষণ এবং সরকারকে কর পরিশোধ করতে হয়। প্রভিশন সংরক্ষণ ও কর-পরবর্তী মুনাফাই হলো একটি ব্যাংকের প্রকৃত বা নিট মুনাফা। আর পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলো এ রকম মুনাফা প্রকাশ করতে পারে না।’

এদিকে সাউথ ইস্ট ব্যাংক বিদায়ী বছরে মুনাফা করেছে ১ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা; যা ২০২১ সালে ছিল ১ হাজার ১৬ কোটি টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিডেট (এসআইবিএল) গত বছর পরিচালন মুনাফা করেছে ৫৫০ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ৫০১ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংক বিদায়ী বছরে মুনাফা করেছে ২১১ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ১৪৭ কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭৫০ কোটি টাকা, আগের বছর যা ছিল ৭৮০ কোটি টাকা। আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৮১০ কোটি টাকা; আগের বছর ছিল ৭৫০ কোটি টাকা। এনআরবি কমার্শিয়াল (এনআবিসি) ব্যাংক মুনাফা করেছে ৪৫৫ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ৪৫০ কোটি টাকা। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার ব্যাংক বিদায়ী বছরে মুনাফা করেছে ২০০ কোটি টাকা, যা আগের বছর ছিল ২১০ কোটি টাকা। আর মিডল্যান্ড ব্যাংক মুনাফা করেছে ১৮০ কোটি টাকা, আগের বছরে যা ছিল ১৬২ কোটি টাকা।

ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকা, আগের বছর যা ছিল ৩৭৫ কোটি টাকা।

রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. আফজাল করিম বলেন, ‘বিদায়ী বছর শেষে সোনালী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এটি গত বছরের চেয়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বেশি। সোনালী ব্যাংকের ঋণের প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে। বছর শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা ছিল ৬৯ হাজার কোটি টাকা।

আর খেলাপি ঋণ কমায় গত বছর সুদ আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের চেয়ে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকা বেশি। সব মিলিয়ে বেড়েছে পরিচালন মুনাফা’
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানান, এবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ ছাড়ের কারণে পরিচালন মুনাফায় ব্যাপক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের ব্যাংক খাতের ঝুঁকি প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকতা বলেন, দেশের ডলারের বাজার ছিল অস্থির। এ সময় ডলারের দাম প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ডলার বাজার থেকে বেশ কিছু ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা বেড়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *