আদর্শবাদী রাজনীতিক মণি সিংহ

মতামত

গোপেন চত্রক্রবর্তী সুসং দুর্গাপুরে এসেছিলেন আত্মগোপনে লুকিয়ে থাকতে। পরিচয় গোপন রেখে সদ্য বিপ্লব সম্পন্ন হওয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন ঘুরে আসা গোপেন চত্রক্রবর্তীকে মণি সিংহ তার চাচাতো ভাই শচী সিংহের বাড়িতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন। মণি সিংহ তখন কমিউনিস্ট না। কিন্তু গোপেন চত্রক্রবর্তী কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে আস্থাশীল। মণি সিংহ ও তাঁর তিন সহযোগী, বাড়ি থেকে ১০-১২ মাইল দূরে জাতপাতের রেখা ভেদ করে হাজং পল্লিতে স্কুল করেছেন। মুসলমান কৃষকের হাতে পান করেছেন পানি। ব্রিটিশ তাড়াতে হলে সংখ্যাগরিষ্ঠ জণগণকে কাছে টেনে এনে সংগঠিত করতে হবে।

আর সে কারণেই মণি সিংহ ও তার চাচাতো ভাই শচী সিংহ, প্রভাত স্যান্যাল, উপেন চত্রক্রবর্তীরসহ চার যুবকের এমন উদ্যোগ। আত্মগোপনে আসা গোপেন চত্রক্রবর্তী যখন একদিন সব শুনে মন্তব্য করলেন, ‘এভাবে ব্রিটিশ তাড়ানো যাবে না, মণি সিংহরা যা করছেন তা ভস্মে ঘি ঢালার মতন, তখন তর্ক শুরু হয়ে যায় মণি সিংহসহ চার যুবকের সঙ্গে গোপেন চত্রক্রবর্তীর।’

এক পর্যায়ে গোপেন চক্রবর্তীর যুক্তিকে মেনে নেন তারা।

আর সেই থেকেই একটি বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের উপ্যাখ্যান শুরু। যে রাজনৈতিক জীবন কৃষক শ্রমিক গরিব মানুষের মুক্তির জন্য উৎসর্গকৃত। সে জীবন মতাদর্শ হিসেবে স্থান করে নেয় সমাজতন্ত্র। যে জীবন শুধু সত্যিকারের মানবমুক্তির। আজকের প্রচলিত রাজনীতি ও রাজনীতিকদের মতো চাওয়া পাওয়ার নষ্ট-ভ্রষ্ট অসততার বিন্দুমাত্র কালিমার দাগ সেই রাজনীতি ও রাজনৈতিক জীবনে একেবারেই অনুপস্থিত।

রাজনীতি করতে হয় জনমানবের জন্য, রাজনীতি করতে সর্বস্ব ত্যাগ করতে হয় গণমানুষের জন্য, এমন এক রাজনৈতিক দেশপ্রেমিক জীবনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কমরেড মণি সিংহ। তাই আজকের রাজনীতিকের কাছে মণি সিংহের রাজনৈতিক জীবন একটি ভয়াবহ ভীতির কারণ।

সেই ভীতি সততার সঙ্গে অসততার ভীতি, সেই ভীতি কথা ও কাজের প্রচণ্ড অমিল আর রাজনীতিকদের ত্যাগের জীবনের বিপরীতে ভোগবাদীতার ভীতি।

গোপেন চক্রবর্তী একসময়ে আত্মগোপনের স্থান পরিবর্তন করেন; আর এক বছর পরেই মণি সিংহ কলকাতায় ৩৭ হ্যারিসন রোডে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমদের সঙ্গে। মুজাফ্‌ফর আহমদ শ্রমিক আন্দোলনের কাজ দেন কমরেড মণি সিংহকে। ১৯২৮ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক গণসংগঠন ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পিজেন্টস পার্টিতে যুক্ত হন মণি সিংহ। এটি ছিল বামপন্থিদের প্রকাশ্য দল। ব্রিটিশ সরকার গোড়া থেকেই কমিউনিস্টদের ওপর শুরু করেছিল নির্যাতন। আর তাতে কমিউনিস্ট পরিচয়ে রাজনীতি করা ছিল অসম্ভব। এই প্রক্রিয়া এ ভূখণ্ডে অব্যাহত ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ অবধি। ততদিনে মণি সিংহ মার্কসবাদ লেনিনবাদে দীক্ষা নিয়েছেন। ১৯২৮ সালে কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমদ মণি সিংহকে কলকাতার মেটিয়াবুরুজ শিল্পাঞ্চলে পাঠিয়ে দেন। সেখানেই শ্রমিক আন্দোলন সংগঠিত করতে থাকেন কমরেড মণি সিংহ।

১৯৩০ সালের ৯ মে কলকাতা শহরে প্রথম বের হয় মহান মে দিবসের মিছিল। সেই মিছিল থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যান কমরেড মণি সিংহ। পাঁচ বছর জেলে থাকার পর তাঁকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে ব্রিটিশ সরকার সুসং দুর্গাপুরে নিজ বাড়িতে অন্তরীণ করে রাখে। সেখানে তিনি আবার জড়িয়ে পড়েন কৃষক আন্দোলনে। দুই বছর পর মুক্তি পান। ১৯৩৭ সালে কমরেড মুজাফ্‌ফর আহমদ মণি সিংহকে জানান, ইতোমধ্যেই তাঁকে দেওয়া হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ। এখানে উল্লেখ্যে, যে, কমিউনিস্ট পার্টি একটি ক্যাডারভিত্তিক পার্টি এবং এই পার্টির সভ্যপদ পেতে রাজনৈতিক সাংগঠনিক যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।

জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বিধবা মায়ের সঙ্গে দেখা করতে মাত্র সাত দিনের জন্য এসেছিলেন সুসং দুর্গাপুরে। ওই অঞ্চলের মুসলমান আর হাজং কৃষকরা তাঁকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে থাকে জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের। যে জমিদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কথা বলছেন কৃষকরা, সেই জমিদার তার আত্মীয়। তাঁর নিজেরও সেখানে আছে জমি। পাছে কৃষকরা ভাববে জমিদার তার আত্মীয় আর নিজের জমি আছে বলেই মণি সিংহ পিছিয়ে যাচ্ছেন বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিতে। ভাবলেন- কৃষকদের নিয়ে বিদ্রোহ করাই তাঁর নিজের রাজনৈতিক জীবনের মূল পরীক্ষা। দেখলেন গরিব কৃষক, টংক প্রথায় তার উৎপাদিত ফসলের প্রায় পুরোটাই তুলে দেয় জমিদারের গোলায়। কলকাতার শ্রমিক আন্দোলনে ফেরা হয়নি কমরেড মণি সিংহের।

টংক প্রথাসহ জমিদাররা বিভিন্ন প্রথা চালু করে রেখেছিল জমিদার গোষ্ঠী এ অঞ্চলের কৃষকদের শোষণ-নিপীড়নের জন্য। টংক প্রথায় কৃষককে তাঁর উৎপাদিত ধানের জন্য সোয়া একর জমির জন্য জমিভেদে জমিদারদের দিতে হতো সাত থেকে পনেরো মণ ধান। তাতে কৃষকের উৎপাদিত ফসলের একটা বড় অংশ চলে যেত জমিদারের গোলায়। মণি সিংহ সূচনা করলেন বিদ্রোহের। তাতে রক্ত ঝরল কৃষকের।

কৃষকরা উৎপাদিত ফসল জমিদারদের দেওয়া বন্ধ করে দিলেন। টংক আন্দোলনে কৃষকরা জমিদারদের ধান দেওয়া বন্ধ করে দিলেন। সে বছর ত্রিশ শতাংশ ধানও পেলেন না জমিদার। ক্ষিপ্ত হলেন সুসং দুর্গাপুরের জমিদার, যারা সম্পর্কে তাঁর মামা। ক্ষিপ্ত ব্রিটিশ সরকার। এক সময়ে কেড়ে নেওয়া হলো তাঁর জমি, বসতবাড়ি। মণি সিংহের বসতবাড়ি উচ্ছেদ করে তাতে চালিয়ে দেওয়া হলো লাঙল। সর্বহারা হলেন মণি সিংহ।

কিন্তু সুসং দুর্গাপুরের কৃষকের হৃদয়ে লাঙ্গল চালাতে পারেনি ব্রিটিশ সরকার আর তার তল্পীবাহক জমিদার সম্পদায়। কৃষকের অন্তরে গেঁথে গেলেন মণি সিংহ। কৃষক তাঁকে ডাকলেন মণিরাজ বলে।

বাংলাদেশ সৃষ্টির পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মণি সিংহকে তাঁর জমি ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন এই মহান বিপ্লবী রাজনীতিক, যা আজকের রাজনীতিকের কাছে অবিশ্বাস্য। বাংলাদেশ সৃষ্টিতে আর পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি মুজিবের প্রাণ রক্ষার্থে কমরেড মণি সিংহের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

একাত্তরের ৭ এপ্রিল রাজশাহীর জেল ভেঙে বেরিয়ে গিয়ে কলকাতায় যুক্ত হয়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়ার সমর্থন আদায়ে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। পাছে স্বাধীন রাষ্ট্রটি কমিউনিস্টদের হাতে না চলে যায়, সে কারণে আওয়ামী লীগের বড় অংশের নেতৃত্ব আর ভারত সরকার কেউই অস্ত্র দিতে চাইছিল না ন্যাপ, সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য সমর্থকদের। মুক্তিবাহিনীতেও রিক্রুটে সৃষ্টি করছিল প্রতিবন্ধকতা। অথচ মণি সিংহের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিই ভ্রান্ত রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সাল থেকে বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ। সাতচল্লিশেই মণি সিংহ ঘোষণা করেছিলেন, পাকিস্তান একটি কৃত্রিম রাষ্ট আর এটি কখনোই টিকে থাকতে পারে না।

একাত্তরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সহযোগিতায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাসভবনে সাক্ষাৎ করেছিল মণি সিংহের নেতৃত্বে সিপিবির একটি প্রতিনিধি দল। প্রধানমন্ত্রীর নিজ ড্রইং রুমে নিজ হাতে চা বানিয়ে কমরেড মণি সিংহের হাতে চায়ের পেয়ালা তুলে দিতে দিতে মিসেস গান্ধী কমরেড মণি সিংহকে বলেছিলেন, ‘আপনি ভাবলেন কি করে, ভারত সরকার কমিউনিস্টদের হাতে অস্ত্র তুলে দেবে?’ ফিরে এসে দমে যাননি কমরেড মণি সিংহ। মিসেস গান্ধীর ভাবনায় পরিবর্তন এসেছিল। তা বাধ্য হয়েই হোক কিংবা অন্য যে কারণেই হোক। শেষ অবধি ভারত সরকার, ন্যাপ, সিপিবি, ছাত্র ইউনিয়নের উনিশ হাজার গেরিলাকে প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র দিয়েছিলেন।

আজ যখন দুর্বৃত্তায়নের লুটেরা নীতিহীন রাজনীতি চলছে, যখন প্রতি কেজি আমন ধান উৎপাদনে ৩০ টাকা ব্যয় করে প্রতি কেজি ধান কৃষককে বেচতে হচ্ছে ২৬-২৮ টাকা দরে, যখন ইশ্বরদীর ১২ কৃষককে কোমরে দড়ি পরিয়ে পুরে দেওয়া হচ্ছে জেলে আর হুলিয়া মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে আরও ২৫ কৃষক; তখন কমরেড মণি সিংহের রাজনৈতিক জীবন ও রাজনীতি, অনেক প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এই জমিনে। লুটেরা গোষ্ঠী লাখ লাখ কোটি টাকা ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে পাচার করে দেয়; অথচ গরিব কৃষক ১৬ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ১৩ লাখ টাকা পরিশোধ করেও নিস্তার পায় না। হাতকড়া পরে সেই হাতে, যে হাত বপন-রোপণ-নিড়ানি না করলে সতের কোটি মানুষই থাকবে অভুক্ত।

একজন মণি সিংহের বড্ড প্রয়োজন আজ কৃষককুলে, যিনি কৃষককে সচেতন করে দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেবেন কৃষক আন্দোলন। কৃষকের হয়ে কৃষককে নিয়ে করবেন প্রতিবাদ। প্রতিষ্ঠা করবে অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায়ের অধিকার। রাষ্ট্রকে বাধ্য করবে অন্যায় জুলুম বন্ধ করতে।

মণি সিংহ এই জমিনের সেই রাজনীতিক, যিনি এই ভূখণ্ডের দু-দুটি স্বাধীনতা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রথমবার সাতচল্লিশে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে, দ্বিতীয়বার একাত্তরে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে।

কিন্তু তারপরও মুক্তি আসেনি জনগণের। তৃতীয়বার অর্থনৈতিক মুক্তির স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ের সূচনা করে গেছেন মণি সিংহ। আর সে লড়াই অর্থনৈতিক মুক্তি ও সমতার সমাজ প্রতিষ্ঠার। কমরেড মণি সিংহের জীবন সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শামিল আজকের তরুণ-তরুণীর জন্য দীক্ষা হয়ে আছে। আছে প্রেরণা হয়ে।

৩১ ডিসেম্বর ছিল কমরেড মণি সিংহের ৩২তম প্রয়াণ দিবস। সমতার সমাজ সৃষ্টি; আদর্শবাদী রাজনীতি প্রতিষ্ঠার শপথই হতে পারে এই মহান বিপ্লবী রাজনীতিকের যথাযথ শ্রদ্ধা জানানোর উপায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *