নতুন বছরে যেভাবে আলোচনায় থাকবে ভার্চুয়াল দুনিয়া

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি

শুরু হলো ২০২৩ সাল। পুরোনো বছরকে পেছন ফিরে দেখার পাশাপাশি নতুন বছরের দিকেও চোখ রাখছেন সচেতন মানুষ। এ বছর নানা ক্ষেত্রেই আসতে পারে অভূতপূর্ব পরিবর্তন। করোনা মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা কারণেই বিদায়ী বছরে বৈশ্বিক অর্থনীতি ছিল বেসামাল। নতুন বছরে পৃথিবী তা কাটিয়ে উঠতে পারবে কি না, তা নিয়ে চলছে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণ। 

তবে তরুণ প্রজন্ম চোখ রেখেছে ইন্টারনেট দুনিয়ায়। এখানে কী ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে, তা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। কারণ ইন্টারনেট, একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। 

তথ্য-উপাত্ত বলছে, বিশ্বের ৪৬২ কোটির বেশি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে। এটি বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ প্রতিদিন গড়ে ২ ঘণ্টা ২৭ মিনিট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করে। সুতরাং নতুন বছরে মানুষের জীবনে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যে আরও বেশি প্রভাববিস্তারী হয়ে উঠবে, তাতে সন্দেহ নেই। 

টিকটকের জনপ্রিয়তা হবে লাগামছাড়া
২০২০ এবং ২০২১ সালে সর্বাধিক ডাউনলোড হওয়া অ্যাপের নাম টিকটক। ২০২২ সালের সঠিক পরিসংখ্যান এখনো জানা যায়নি। তবে এর জনপ্রিয়তা এখনই আকাশচুম্বী। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে এটি সবচেয়ে পছন্দের সামাজিক নেটওয়ার্ক। টিকটকের ৪৪ শতাংশ ব্যবহারকারীর বয়স ২৫ বছরের কম। তরুণ প্রজন্মের এক-পঞ্চমাংশ দিনের প্রায় পাঁচ ঘণ্টা টিকটকে ব্যয় করে থাকে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, টিকটকের বিপণন বাজেট এ বছর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্যি হয়, তাহলে টিকটক হয়ে উঠবে এ বছরের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। 

ব্যবসা বাড়বে সামাজিক মাধ্যমে
করোনা মহামারির পর ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কেনাকাটা বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণেরা সবচেয়ে বেশি কেনাকাটা করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তাদের কাছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে উঠেছে ‘ভার্চুয়াল শপিং স্পেস’। বিদায়ী বছরে যুক্তরাষ্ট্রের ৮ কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে কেনাকাটা করেছে। বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৩ সালে এটি ১০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। 

কেনাকাটার জন্য মানুষ সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করবে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম। এখনই অন্তত ৭০ শতাংশ ক্রেতা বিভিন্ন পণ্যের খোঁজে ইনস্টাগ্রামে ঢুঁ মারে। এ বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ক্রেতাদের জন্য অবাধ বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

ভিডিওর আধিপত্য বাড়বে
মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিসকোর এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ইন্টারনেটের ৮২ শতাংশ গ্রাহক ভিডিও দেখেন। দীর্ঘ ভিডিওর চেয়ে স্বল্প সময়ের ভিডিও এখন বাজার দখল করেছে। এই প্রবণতা চলতি বছরেও অব্যাহত থাকবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছে সিসকো। মানুষকে অতিমাত্রায় ভিডিওমুখি করার পেছনে টিকটকের অবদান রয়েছে। টিকটকের তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তার কারণে ফেসবুক ‘রিলস’, ইনস্টাগ্রাম ‘রিলস’ এবং ইউটিউব ‘শর্টস’ নামের ফিচার আনতে বাধ্য হয়েছে। 

এ ছাড়া মহামারি-পরবর্তী সময়ে সারা বিশ্বেই ‘লাইভ স্ট্রিমিং’ জনপ্রিয় হয়েছে। এই জনপ্রিয়তা ২০২৩ সালে আরও বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যের প্রচার, প্রদর্শন, বিভিন্ন ব্যবসায়িক ইভেন্ট আয়োজন করতে লাইভ স্ট্রিমিংয়ের সুবিধা নিচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যম নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন, তাঁরা বলছেন, সামাজিক মাধ্যমে ছবি বা লেখার চেয়ে ভিডিও দ্রুত জনপ্রিয় হয়। এসব কারণে এ বছর ভিডিও আধিপত্য আরও বাড়বে। 

রাজত্ব করবে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি ও অগমেন্টেড রিয়্যালিটি
অগমেন্টেড রিয়্যালিটি (এআর) ও ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির (ভিআর) ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, তাতে এ বছর এ দুটি মাধ্যম মূলধারায় আঘাত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইনস্টাগ্রাম পাঁচ বছর ধরেই ফটো ফিল্টারের জন্য এআর প্রযুক্তি ব্যবহার চলছে। অন্য সামাজিক মাধ্যমগুলোও এআর ব্যবহার করে। সুতরাং এ বছর এআর প্রযুক্তির বাজার ৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা। 

সামাজিক মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলো আরও ব্যাপকভাবে এআর প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ফলে এ বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজত্ব করবে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি ও অগমেন্টেড রিয়্যালিটি। 

বিজ্ঞাপনের বাজার খেয়ে ফেলবে সামাজিক মাধ্যম
বিশ্বের বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখন বিজ্ঞাপন বাজেটের সিংহভাগ ব্যয় করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একটি জরিপে দেখা গেছে, ৫০ শতাংশ ব্যবসায়ী স্বীকার করেছেন যে তাঁরা তাঁদের বিপণন বাজেটের অর্ধেক সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পেছনে ব্যয় করেন। এই প্রবণতা চলতি বছরে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিদায়ী বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপনের বাজার ছিল ১৭ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। এ বছর ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ব্যয় ৬৮ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় অংশটি ব্যয় হবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। 

প্রথাগত বিজ্ঞাপনের চেয়ে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও বিশ্বস্ততা বাড়বে। সার্ভে মাংকি নামের একটি জরিপ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের প্রায় অর্ধেকই ডিজিটাল বিজ্ঞাপন দেখে পণ্য কেনেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের ব্যবহার দেখা যায় ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে। 

ট্রেন্ড হয়ে উঠবে ‘ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাঁরা ভীষণ জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী, তাঁদের ‘ইনফ্লুয়েন্সার’ বলা হয়। পণ্য ও ব্র্যান্ড প্রচার করতে ইদানীং তাঁদের ব্যবহার করা হচ্ছে। চলতি বছরে সামাজিক মাধ্যমের বিজ্ঞাপনে ইনফ্লুয়েন্সারদের যুক্ত করার প্রবণতা আরও বাড়বে। বলা যায়, এই ধারাই ট্রেন্ড হয়ে উঠবে। এই ট্রেন্ডকে বলা হচ্ছে ‘ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং’। 

এ বছর ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং ব্যয় ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে পৌঁছাবে বলে অনুমান করছেন সামাজিক মাধ্যমের বিপণন বিশেষজ্ঞরা। এরই মধ্যে সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের অ্যালগরিদমকে আরও বেশি বিজ্ঞাপনবান্ধব করার জন্য কাজ শুরু করে দিয়েছে। ফলে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে আগের চেয়ে অনেক বেশি ‘স্পনসর’ পোস্ট দেখা যায়। 

তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, রয়টার্স, ডিমান্ডসেজ ও ফ্রেশ কনটেন্ট সোসাইটি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *