মূল্যস্ম্ফীতিই বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ঝুঁকি

অর্থনীতি

জিনিসপত্রের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়া বা এখনকার উচ্চধারা বজায় থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ম্ফীতিই এ দেশের প্রধান ঝুঁকি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদন-২০২৩ এমন তথ্য দিয়েছে। গতকাল বুধবার জেনেভা থেকে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান পাঁচটি ঝুঁকির কথা উল্লেখ রয়েছে। বিশ্বের ১২১ দেশের এই অর্থনীতির ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে জরিপের মাধ্যমে।

‘আগামী দুই বছরে আপনার দেশের জন্য হুমকি তৈরি করতে এমন প্রধান পাঁচটি ঝুঁকি কী কী’- বিশ্বের বিভিন্ন খাতের ১২ হাজার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার কাছে জানতে চেয়েছিল বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত ‘বিশ্ব ঝুঁকি উপলব্ধি’ নামে এ জরিপ পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে এ জরিপে ডব্লিউইএফের অংশীদার প্রতিষ্ঠান ছিল গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা বাংলাদেশের বাকি চারটি প্রধান ঝুঁকি হলো- ঋণ সংকট, পণ্যমূল্যের গুরুতর অভিঘাত বা প্রভাব, মানবসৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয় এবং সম্পদের ওপর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশের মতো প্রতিটি দেশের স্বল্পমেয়াদি ৫টি প্রধান ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে স্বল্পমেয়াদি ( ২ বছর) এবং দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির (১০ বছর) কথা উল্লেখ করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে বিশ্বের প্রধান ঝুঁকি- জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট।

. আর দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যর্থতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ হিসাবে বাংলাদেশে গত ডিসেম্বরে পয়েন্ট টু পয়েন্ট মূল্যস্ম্ফীতি হয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। কয়েক মাস ধরে এ হার ৯ শতাংশের আশপাশে রয়েছে। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের অনেকেই বলছেন, দরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের মানুষের জন্য মূল্যস্ম্ফীতির হার এর চেয়ে আরও বেশি হবে। কেননা তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী কিনতে আয়ের বেশিরভাগই খরচ করে। আর মূল্যস্ম্ফীতির হিসাব করা হয় পণ্য ও সেবার গড় দরের ভিত্তিতে।

বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদনের বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন সমকালকে জানান, তিনিও মনে করেন মূল্যস্ম্ফীতিই স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান ঝুঁকি। বৈশ্বিক বিভিন্ন প্রক্ষেপণ বলছে, ২০২৩ সালে মূল্যস্ম্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। বাংলাদেশ যেহেতু বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে আগের চেয়ে এখন বেশি সম্পৃক্ত, সেহেতু বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাব এখানে থাকবে। আর এর অভিঘাতও বড় ঝুঁকি হিসেবে আসবে। কেননা এ দেশের উল্লেখযোগ্য মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। শুধু দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা জনগোষ্ঠী নয়, মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকের বিশেষত নির্ধারিত আয়ের মানুষের অনেকের প্রকৃত আয় কমে গেছে। উচ্চ মূল্যস্ম্ফীতি তাদের বিপাকে ফেলেছে এবং আগামীতেও এ ঝুঁকি থাকবে।

ঋণ পরিশোধের চাপের বিষয়ে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, জিডিপির অনুপাতে অভ্যন্তরীণ ঋণ সাম্প্রতিক সময়ে বেড়ে যাওয়ার প্রবণতার মধ্যে রয়েছে। বৈদেশিক ঋণ এখনও অনেক দেশের চেয়ে কম। তবে নিকট মেয়াদে কিছু মেগা প্রকল্পের ঋণের কিস্তি দেওয়া শুরু হবে। ফলে সার্বিকভাবে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কমেছে। আবার ডলারের বিপরীতে টাকার বড় পতন হয়েছে। ফলে ঋণ পরিশোধ এখন অন্যতম ঝুঁকির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশের ঝুঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে অর্থায়ন চাহিদা বাংলাদেশ একা পূরণ করতে পারবে না। বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সম্পদের ওপর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা বাংলাদেশকেও প্রভাবিত করবে। বিশেষত খাদ্য ও জ্বালানির নিয়ন্ত্রণ রাখার প্রতিযোগিতা ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। ইউক্রেন যুদ্ধ এ বিষয়কে সামনে এনেছে।
ডব্লিউইএফের বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদনে বলা হয়, এই দশকের প্রথম তিন বছর মানব ইতিহাসে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বিশ্ব যখন কভিড-১৯ থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিকতার দিকে যাচ্ছিল, তখন ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি ফের ওলটপালট করে দেয়। নতুুন করে খাদ্য ও জ্বালানি সংকট দেখা যায়। গত কয়েক দশকের অর্জন হুমকির মধ্যে পড়ে।

এতে বলা হয়, নতুন বছরের অনেক ঝুঁকি আগে থেকেই আছে। জীবনযাত্রার খরচের সংকট গত বছরও ছিল। এ ছাড়া বাণিজ্য যুদ্ধ, উদীয়মান দেশ থেকে পুঁজি স্থানান্তর, ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি এ বছরও থাকতে পারে। তবে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দেবে ঋণ পরিস্থিতি, যা অনেক দেশে টেকসই পর্যায়ে নাও থাকতে পারে। এ ছাড়া নিম্নমাত্রার বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ার মতো ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *