বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের সংকট

মতামত

একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো; জাতীয়তাবাদীরা রাষ্ট্রক্ষমতা পেয়ে গেল। তাতে বাঙালির কি মুক্তি ঘটল? মেহনতিদের কথা তো আসছেই না; মধ্যবিত্ত বাঙালি কি মুক্তি পেল? বিশেষত জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরের দশাটা তখন কী দাঁড়াল? সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্যিক আব্দুল হককে (১৯১৮-১৯৯৭) সামনে রেখে খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড প্রতিষ্ঠানের একটি দায়িত্ব ছিল শিক্ষার উচ্চতর স্তরের জন্য বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা। স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠানটি আর স্বতন্ত্রভাবে রইলই না; অঙ্গীভূত হয়ে গেল বাংলা একাডেমির। কারণ কী? কারণ একজন প্রভাবশালী জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবী বাংলা একাডেমির ‘পরিচালক’ হওয়াকে তাঁর নিজের জন্য যথেষ্ট প্রাপ্তি বিবেচনা করলেন না। চাইলেন একাডেমি ও বোর্ডকে একত্র করে মহাপরিচালক হবেন।
বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা সাহিত্যিক আবদুল হক চলে গেলেন সম্প্রসারিত নতুন প্রতিষ্ঠানে। ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি থেকে তাঁর প্রবন্ধের বই বের হলো ‘সাহিত্য ও স্বাধীনতা’ নামে। এ বইয়ের অনেক প্রবন্ধই স্বাধীনতার আগে লেখা। বইটির ভূমিকা লিখে দিলেন মহাপরিচালক মযহারুল ইসলাম, যিনি আবদুল হকের তুলনায় তখন অধিকতর বাঙালি জাতীয়তাবাদী বলে প্রতিষ্ঠিত; একাত্তরে কলকাতায় গিয়েছিলেন। ভূমিকাতে মহাপরিচালক সাহেব লিখছেন- “সুজন হকের উক্তিকে সমর্থন করেই বলবো স্বাধীনতারও একটি সীমারেখা আছে… একটি স্থানে এসে আমাকে বলতেই হবে, ‘না আর না, জনগণ এর বেশি তোমাকে এগোতে দেবে না’।” জনগণ এগোতে দেবে না অর্থ ‘জনস্বার্থ রক্ষাকারী’ রাষ্ট্রশাসকরা এগোতে দেবে না। একই রকমের কথা পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদীদের কণ্ঠেও শোনা যেত। দুই জাতীয়তাবাদের ভেতরকার আপাত-বিরাট পার্থক্যের অন্তরালে ঐক্য রয়েছে এক জায়গাতে, কায়েমি স্বার্থ রক্ষার।
একাত্তরের পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রের চেয়ে যে কম স্পর্শকাতর- এমন প্রমাণ কিন্তু পাওয়া গেল না। প্রয়াত কবি রফিক আজাদ একাত্তরে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। যুদ্ধ শেষে কাজ পেয়েছেন বাংলা একাডেমিতে, কিন্তু বিপদে পড়েছেন ‘ভাত দে হারামজাদা’ নামে একটি কবিতা লিখে। শিরোনামটি তিনি নিয়েছিলেন একটি দেয়াললিখন থেকে। অনেক কষ্টে এবং বিস্তারিত কৈফিয়ত দিয়ে তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের সম্ভাব্য অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। কবি দাউদ হায়দার কিন্তু অব্যাহতি পাননি। কবিতা লিখে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ করার দায়ে প্রথমে কারাদণ্ড, পরে নির্বাসনদণ্ড পেয়েছেন। এখনও তিনি নির্বাসনেই আছেন।

জাতীয়তাবাদী পাকিস্তানি শাসনামলেও অনেক সাহিত্যিক কারাযন্ত্রণা ভোগ করেছেন। শহীদ সাবের কারারুদ্ধ হন কিশোর বয়সেই এবং পরে আর সমাজে সুস্থাপিত হতে পারেননি; একাত্তরে তিনি শহীদ হয়েছেন। একাত্তরে শহীদ হয়েছেন অনেক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি সমর্থন প্রদানের। বেঁচে যাওয়া বুদ্ধিজীবীদের আশা ছিল- বাংলাদেশে মতপ্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা পাওয়া যাবে। সেটি পাওয়া যায়নি।


সাহিত্যিক আবদুল হকের রোজনামচাতে তখনকার অনেক চিত্রই পাওয়া যায়। আনন্দের সঙ্গে লেখেননি; লিখেছেন বেদনার সঙ্গেই। দুঃস্বপ্নের দুঃসহ পারাবার পার হয়েই তো একাত্তরে শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে বাঙালির। মনে হয়েছিল- বিপ্লব ঘটে গেছে। আবদুল হকও তাঁর প্রথম দিকের লেখায় পরিবর্তনটাকে বিপ্লবই বলেছেন। কিন্তু অচিরেই বুঝেছেন, বিপ্লব পূর্ণাঙ্গ হয়নি। তার পরে অতিদ্রুত বুঝতে বাধ্য হয়েছেন- পরিবর্তনটা কাঙ্ক্ষিত রূপের তো নয়ই; মৌলিক ধরনেরও নয়।
আবদুল হকের পক্ষে এটি মেনে নেওয়া দুঃসাধ্য ছিল। আগে তো বিদেশিদের শাসন ছিল। শাসকদের তখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা গেছে। এখন বাঙালি শাসকদের কী নামে চিহ্নিত করবেন তিনি? বলা যেত- এরাও ওই একই; আগেরগুলোর মতোই পুঁজিবাদী। কিন্তু সেটা বলতে হলে একটা সীমা অতিক্রম করতে হতো। জাতীয়তাবাদের সীমারেখা লঙ্ঘন করে যেতে হতো সমাজতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষার কাছে; গেলে পরিস্কার হতো এই সত্যটা- আসল শত্রু হলো পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদীরা যেমন, বাঙালি জাতীয়তাবাদীরাও তেমনি ওই ব্যবস্থারই ধারক-বাহক এবং সুবিধাভোগী। কিন্তু সীমানা লঙ্ঘন তো সম্ভব ছিল না জাতীয়তাবাদী ধারার উদারনীতিকদের পক্ষে।
১৯৬৯-এ আবদুল হক প্রবন্ধ লিখেছেন, ‘সাম্রাজ্যবাদের অন্তিম মুহূর্তে’ নাম দিয়ে। এটি সবারই জানা যে, বিশ্বের অধিকাংশ স্থানেই তখন সাম্রাজ্যবাদের তৎপরতা চলছিল। চলছিল তা বাংলাদেশেও। প্রবন্ধটিতে তিনি লিখেছেন- ‘সাম্রাজ্যবাদের আয়ু যে বাড়ে, এমনকি সাম্রাজ্যের আদৌ যে সৃষ্টি হয়, তার প্রধান কারণ স্রষ্টাদের উৎকর্ষ নয়, এর কবলিত জাতির সাংগঠনিক দৌর্বল্য এবং চেতনার বিশৃঙ্খলা।’ কথাটা কিন্তু ঠিক নয়, প্রধান কারণ সাম্রাজ্যবাদীদের উৎকর্ষ না হোক, তাদের অর্জিত ক্ষমতা বটে। তারা বৈজ্ঞানিক শক্তি অর্জন করেছে, তাদের দেশে উৎপাদন সম্পর্কে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে, উৎপাদন শক্তি অত্যন্ত বেড়েছে এবং তারা তাদের কবলিত দেশে ‘রাজনৈতিক ও সামাজিক মীরজাফর’ নিয়োগ করতে সক্ষম হয়েছে। কবলিত জাতির ‘সাংগঠনিক দৌর্বল্য’ এবং ‘চেতনার বিশৃঙ্খলা’ সৃষ্টিতেও দখলকারীদের দক্ষতার কৃতিত্বটা অনস্বীকার্য। আবারও বলতে হয়, এই বাস্তবতাকে না দেখতে পারার দায়িত্ব ব্যক্তিগত নয়; উদারনীতির যে দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনা এবং সেই দৃষ্টিকোণের।

সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ সিকদার একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। কিন্তু পঁচাত্তরের প্রথম দিকেই প্রাণ হারিয়েছেন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে। রোজনামচায় আবদুল হক সংক্ষেপে ঘটনার খবরটা লিখেছেন, স্মারক হিসেবে। তাতে উল্লেখ আছে- ‘এই পার্টি বহু লুটপাট, হত্যা, হাইজ্যাক, ব্যাংক ডাকাতি ইত্যাদি করেছে বলে ধারণা এবং অভিযোগে প্রকাশ।’ সর্বহারা পার্টির রাজনৈতিক কোনো লক্ষ্য ছিল কিনা, তার উল্লেখ নেই; সেটি জানার আগ্রহও নেই। কারণ কিন্তু ওই একই, দৃষ্টিকোণের কারণে সহানুভূতির অভাব। তিনি সমাজতন্ত্রী নন, গণতন্ত্রী। চরমপন্থি নন, উদারনৈতিক। এই দৃষ্টিভঙ্গির দরুন কাউকে কাউকে তিনি ভুলও বুঝেছেন। বস্তুত যে জাতীয়তাবাদী শক্তিকে আবদুল হকরা সমর্থন দিয়ে এসেছেন, স্বাধীনতার পর ক্ষমতাসীনদের বিভিন্ন পদক্ষেপ তারা সমর্থন করতে পারেননি। কিন্তু বুর্জোয়া গণতন্ত্রের যতই দুর্বলতা থাকুক, তার কোনো বিকল্পও তারা দেখেন না।
দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এলো; বাঙালিরা জয়ী হলো। কিন্তু পুঁজিবাদী লুণ্ঠন ও ভাবাদর্শের দৌরাত্ম্যের অবসান ঘটল না। সাম্রাজ্যবাদীরাও চলে এলো অর্থনীতি ও রাজনীতিতে কর্তৃত্ব ধরে রাখতে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর একের পর এক, পালা করে স্বৈরশাসক এসেছে। নির্বাচিত হয়ে এসেছে, কখনও কখনও এসেছে অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা দখল করে। বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীরা তা দেখে পীড়িত হয়েছেন। কিন্তু তাঁরা সেটা জোর দিয়ে, প্রবলভাবে, এমনকি স্পষ্ট করেও বলতে পারেননি। পরিত্রাণের পথ যে কোন দিকে, তাও দেখতে পাননি।

বর্তমানেও বাঙালি জাতীয়তাবাদী বুদ্ধিজীবীদের ভাবনা ও সংকটের ইতরবিশেষ ঘটেনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *