স্মার্ট অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশের পথরেখা

মতামত

স্বাধীনতার পর প্রায় ২৯ বছর দেশ শাসিত হয়েছে প্রতিক্রিয়াশীল ও উন্নয়নবিমুখ প্রগতিবিরোধী ধারায়। তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রাষ্ট্র পরিচালনার মাত্র সাড়ে তিন বছরে দেশে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তির সম্প্রসারণ করে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের যে ভিত রচনা করেন; তার ওপর দাঁড়িয়ে ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আধুনিক ও প্রেরণাদায়ী ‘রূপকল্প ২০২১’ ঘোষণা করেন, যার মূল ভিত্তি ডিজিটাল বাংলাদেশ। দেশের মানুষ উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় ডিজিটাল বাংলাদেশের মতো আধুনিক কর্মসূচির প্রতিও আস্থা রাখে।

গত ১৩ বছরে এ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের পর ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর ডিজিটাল বাংলাদেশ দিবসে আরেকটি আধুনিক কর্মসূচি ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’-এর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। স্মার্ট বাংলাদেশ ধারণার চারটি ভিত্তি- স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট গভর্নমেন্ট, স্মার্ট অর্থনীতি এবং স্মার্ট সোসাইটি। বলা বাহুল্য, স্মার্ট বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিটি হচ্ছে স্মার্ট অর্থনীতি। স্মার্ট সিটিজেন, স্মার্ট গভর্নমেন্ট এবং স্মার্ট সোসাইটি- এসবই স্মার্ট অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক। এ নিবন্ধের আলোচনা মূলত স্মার্ট অর্থনীতি নিয়েই সীমিত থাকবে।

স্মার্ট অর্থনীতি- দুটি শব্দ থেকে সহজেই বোঝা যায় অর্থনীতির ক্ষেত্রে সনাতনী ব্যবস্থার আধুনিকায়ন বা রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থনীতি গতিশীল করা। এর ফলে শুধু শিল্প উৎপাদনই বৃদ্ধি পাবে না; আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করবে দেশ। এই আধুনিকায়ন করা হবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ব্লকচেইনের মতো অগ্রসর প্রযুক্তির দ্বারা। কৃষি, শিল্প, শিক্ষাসহ প্রায় সব খাতেই এসব প্রযুক্তিনির্ভর সমাধানের মাধ্যমে অর্থনীতিতে ভ্যালু যোগ হবে। এর ফলে ডিজিটাল অর্থনীতিও দ্রুত বিকশিত হবে।

সম্প্রতি জাইকা এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের (বিসিজি) সহযোগিতায় আইসিটি বিভাগ প্রণীত ‘স্মার্ট বাংলাদেশ :আইসিটি ২০৪১ মাস্টারপ্ল্যান’ স্মার্ট অর্থনীতি সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা দেয়। মাস্টারপ্ল্যানে ২০৪১ সাল নাগাদ আইসিটি রপ্তানি ৫০ বিলিয়ন ডলার এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আইসিটি খাতের অবদান ২০ শতাংশ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এখানে সার্কুলার অর্থনীতি নামে নতুন একটি বিষয় যোগ করা হয়েছে। অগ্রসর বিভিন্ন প্রযুক্তি যেমন এআই, আইওটির সঙ্গে স্টার্টআপ ইকো-সিস্টেম এবং শক্তিশালী প্রযুক্তি অবকাঠামো দ্বারা একটি বৃত্তাকার অর্থনীতি তৈরি করা হবে। এই অগ্রসর প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প উৎপাদনে শূন্য কার্বন বর্জ্য হবে। আর শিল্পে ব্যবহূত উপাদান এবং উৎপাদিত পণ্যগুলো যতটা সম্ভব পুনর্ব্যবহার করা হবে।
প্রশ্ন হলো, স্মার্ট অর্থনীতিতে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ২০৪১ সাল নাগাদ আইসিটি রপ্তানি ৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত এবং জাতীয় অর্থনীতিতে আইসিটি খাতের অবদান ২০ শতাংশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী কিনা? যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের তৈরি করা কোম্পানির মাধ্যমেই সিলিকনভ্যালি প্রতিষ্ঠিত হয়। এমআইটির শিক্ষার্থীরা ৩০ হাজার ২০০ কোম্পানি তৈরি করে, যেখানে ৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান হয় এবং কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত আয় বছরে ১ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এটা সম্ভব হয় এমআইটি তাদের শিক্ষার্থীদের জন্য স্টার্টআপ, বিজনেস ইনকিউবেশন, উদ্ভাবন এবং গবেষণা ও উন্নয়নের (আরঅ্যান্ডডি) সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার ফলে।
এ থেকে প্রতিভাত- বাংলাদেশকে ২০৪১ সাল নাগাদ আইসিটি খাতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অনিবার্যভাবে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্টার্টআপ, উদ্ভাবন ও উন্নয়ন এবং ইনকিউবেশন সুবিধা এবং গবেষণা ও উন্নয়নের (আরঅ্যান্ডডি) সুযোগ সৃষ্টি করা। সরকার কতটা এই সুযোগ সৃষ্টি করছে, সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আশাব্যঞ্জক দিক হচ্ছে, সরকার ২০২৫ সাল নাগাদ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অন্তত পাঁচটি ইউনিকর্ন কোম্পানি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ইউনিকর্ন বলতে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের স্টার্টআপগুলো বোঝায়। ইউনিকর্ন কোম্পানি তৈরিতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বিসিসির এনহেন্সিং ডিজিটাল গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ইকোনমি (ইডিজিই) প্রকল্প স্টার্টআপ বাংলাদেশ কোম্পানির মাধ্যমে স্টার্টআপে সহযোগিতা করছে। এর আগে স্টার্টআপ সংস্কৃতির বিকাশে আইডিয়া প্রকল্প ও বঙ্গবন্ধু ইনোভেশন গ্রান্ট (বিগ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে দেশে দেড় হাজারের বেশি স্টার্টআপ রয়েছে। সেগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ ৮০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিজ্ঞতা এবং চলমান উদ্যোগগুলোর সম্প্রসারণ এবং নতুন নতুন উদ্যোগের বাস্তবায়ন করেই সরকার স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ করতে যাচ্ছে। এটি শীর্ষ নেতৃত্বের চিন্তাপ্রসূত উদ্যোগ। তাই এর বাস্তবায়নে তাঁরা আন্তরিক হবেন, সেটাই প্রত্যাশিত। এরই মধ্যে প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়নের পর্যবেক্ষণকারী সজীব ওয়াজেদ জয় মাইক্রোপ্রসেসর ডিজাইন, এআই, রোবটিক্স এবং সাইবার সিকিউরিটি- এই চারটি প্রযুক্তির বিকাশ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), ব্লকচেইন সাইবার সিকিউরিটি এবং মাইক্রোপ্রসেসর ডিজাইনের ওপর আইসিটি বিভাগ জোরেশোরে কাজ শুরু করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইনকিউবেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে কুয়েটে শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার এবং চুয়েটে শেখ কামাল আইটি বিজনেস ইনকিউবেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশের ৬৪ জেলায় শেখ কামাল আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার এবং শরীয়তপুরে শেখ হাসিনা ইনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি প্রতিষ্ঠার কাজ চলমান। ইডিজিই প্রকল্প আইসিটি শিল্প উন্নয়নের মাধ্যমে পাঁচ বছরে এককভাবে কমপক্ষে ৩০০ মিলিয়ন আইসিটি রপ্তানির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে রিসার্চ অ্যান্ড ইনোভেশন সেন্টার (আরআইসি)।

এ দেশের মানুষ বরাবরই সমৃদ্ধ ও আনন্দময় জীবনের স্বপ্ন লালন করেছে। তাদের সেই স্বপ্ন পূরণে যারা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে; তা যত আধুনিকই হোক না কেন, তার প্রতি সমর্থন ও আস্থা রেখেছে। তার প্রমাণ ডিজিটাল বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ তাদের আস্থা আরও সুদৃঢ় করেছে। স্মার্ট বাংলাদেশ বাস্তবায়নেও জনগণের সমর্থন থাকবে, আশা করা যায়। কারণ এর মধ্য দিয়ে স্মার্ট অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটবে, যা তাদের জন্য সমৃদ্ধ ও আনন্দময় জীবনের পথ দেখাবে। ২০৪১ সালে উন্নত বাংলাদেশ তথা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণ ত্বরান্বিত করবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *