যুক্তিবাদী, গণতান্ত্রিক সমাজ গড়তে বিতর্কের বিকল্প নেই

শিক্ষা

আগামী দিনের যুক্তিনির্ভর, গণতান্ত্রিক, মননশীল ও সৃজনশীল জাতি গঠনে প্রয়োজন বিতর্ক চর্চা। নতুন প্রজন্ম এই চর্চার মাধ্যমে নিজেদের যুক্তিবাদী করে গড়ে তুলবে। বিতর্ক গড়বে মুক্তচিন্তার মুক্ত সমাজ। একটি যুক্তিবাদী, পরমতসহিষ্ণু, গণতান্ত্রিক, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণে বিতর্ক চর্চার বিকল্প নেই।

গতকাল রোববার সমকাল ও বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন (বিএফএফ) আয়োজিত ‘জাতীয় বিজ্ঞান বিতর্ক উৎসব-২০২২’ এর চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় অতিথিরা এসব কথা বলেন। শেষ দিনে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল দল ও নোয়াখালী জিলা স্কুল দলের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বিতর্কের মধ্য দিয়ে পর্দা নামে এই আসরের। চ্যাম্পিয়ন হয়েছে নোয়াখালী জিলা স্কুল দলের বিতার্কিকরা। ওই স্কুলের দলনেতা মো. ফাইজুস সালেহীন সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে শ্রেষ্ঠ বক্তা নির্বাচিত হয়। প্রথম রানার্সআপ ময়মনসিংহ জিলা স্কুল, দ্বিতীয় রানার্সআপ কুমিল্লা জিলা স্কুল এবং তৃতীয় রানার্সআপ হয়েছে বরিশাল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। এবারের প্রতিযোগিতায় ৬৪ জেলার ৯ অঞ্চলের ৫২০ স্কুলের ১ হাজার ছাত্রছাত্রী অংশ নেয়।

আলোকিত মানুষের কথা :অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি, এক সময়ের কৃতী বিতার্কিক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি অনলাইনে যুক্ত হয়ে বিতর্কে অংশগ্রহণকারী সব শিক্ষার্থীকে শুভেচ্ছা ও শুভাশীষ জানিয়ে বলেন, বিতর্ক মানুষকে সাহসী, আত্মবিশ্বাসী ও যুক্তিবাদী করে গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে শব্দ চয়ন, বাক্য গঠন, ভাষার ব্যবহার ও সুন্দরভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করার দক্ষতা বাড়ে। একটি শব্দ যে কতভাবে বিচার-বিশ্নেষণ করা যায় তা শেখা যায় এর মাধ্যমে। বিতর্ক যুক্তিকে শানিত করে। বিতার্কিকের জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে দেয়। একটা বিষয়কে নানাভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়, যা পরমত সহিষষুষ্ণতা শেখায়। আজ আমাদের সমাজে অসহিষ্ণুতা বেশি। বিতর্ক চিন্তার পথকে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত করে। এই চর্চা আমাদের দেশে একটি উদার, গণতান্ত্রিক, মুক্তমনা সমাজ গড়ে তুলবে।

দীপু মনি বলেন, প্রতিটি স্কুলে বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাব, দাবা ক্লাব থাকা অত্যাবশ্যক বলে তিনি মনে করেন। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সফল অংশীদার যেন আমরা হতে পারি, সেজন্য নতুন প্রজন্মকে গড়ে তুলতে এগুলো প্রয়োজন। তিনি বলেন, বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গড়ে তুলতে চাই আমরা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বারবার তাই বলে গেছেন। তাঁর গঠন করা কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষানীতি, আওয়ামী লীগের গঠনকালীন ইশতেহার, সত্তর সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার- সর্বত্রই শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আসলে বিজ্ঞান শিক্ষার কোনো বিকল্পও নেই। উয়ারি বটেশ্বরের উদাহরণ তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমাদের ভাষা সমৃদ্ধ, সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ। আমাদের হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয় রয়েছে। আত্মপরিচয় না জানলে আত্মবিশ্বাস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় না। বিজ্ঞান আমাদের সামনে এগিয়ে দেবে। সেসঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষাও হতে হবে যথাযথ। নীতিনৈতিকতা ও অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা থাকা জরুরি। তিনি বলেন, আমরা সব ধরনের চাপ ও বোঝামুক্ত আনন্দময় শিক্ষা চাই। শিক্ষার্থীরা যা শিখবে তা যেন তারা আনন্দের সঙ্গে শেখে। আমরা নতুন শিক্ষাক্রম শুরু করেছি। ২০৩০ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণ ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দক্ষ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন জনশক্তি দরকার। সেজন্যই শিক্ষায় রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে।

সভাপতির বক্তব্যে বিএফএফের সভাপতি ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিতর্ক আমাদের মূল্যবোধের শিক্ষা দেয়। বিতর্কে কেউ আসলে কখরও পরাজিত হয় না। যুক্তির ওপর ভর করে নিজের যুক্তি তুলে ধরার শিক্ষা দেয় বিতর্ক। বিতার্কিকদের আরও উৎকর্ষ অর্জনের সুযোগ রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, যুক্তিবাদী মানুষ দুর্নীতি করে না। সমাজ পঙ্কিলতামুক্ত থাকে। প্রত্যেকে নিজের কাছে দায়বদ্ধ থাকলে সুন্দর সমাজ গড়ে উঠবে। দিনে একবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রত্যেকের আত্মজিজ্ঞাসা করা উচিত- আজ সারাদিনে সে সততা ও মানবিকতার চর্চা করেছে কিনা। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশে আমরা যাচ্ছি। তরুণরাই তা পারবে। মনে রাখতে হবে, কাউকে পেছনে ফেলে রেখে উন্নয়ন হয় না। তাই সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে উন্নয়নের পথে ধাবিত হতে হবে।

বিশেষ অতিথি সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ক্লাসের বিদ্যা আহরণের পাশাপাশি খেলাধুলা, গান-বাজনা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ঘটায়। মানসিক স্বাস্থ্যের বিকাশও জরুরি। তিনি বলেন, বিতর্ক মানে যুক্তি। আর যুক্তি মানে সত্যাসত্য বিচার করা, সঠিক তথ্য খুঁজে বের করা, নিজেকে যুক্তিযুক্ত করে তোলা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্বের বিকাশও ঘটে। বিতর্ক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রত্যন্ত এলাকার বিদ্যালয়গুলোও যোগ্যতার সঙ্গে উঠে আসে। মোজাম্মেল হোসেন বলেন, সমকাল শিক্ষার্থীদের জন্য বিতর্ক চর্চার এই সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। আমাদের চাওয়া, নতুন প্রজন্ম যেন সঠিকভাবে গড়ে ওঠে। তিনি অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রী, তাদের অভিভাবক ও শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানান।

ড্যাফোডিল পরিবারের প্রধান নির্বাহী মো. নূরুজ্জামান অনুষ্ঠানে বলেন, বিতর্ককে উৎসবে পরিণত করেছে এই আয়োজন। বিতর্কের মাধ্যমে যুক্তিনির্ভর সমাজ গড়তে পারলেই শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। যুক্তিই পারে সমাজে ও দেশে সুশাসন নিশ্চিত করতে।

এনআইএসটির অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. ফায়েজ হোসেন বলেন, বিতর্কে তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক আগ্রহ খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। এমন মহৎ কাজে সম্পৃক্ত হতে পেরে আমরাও নিজেদের সম্মানিত বোধ করছি।

স্বাগত বক্তব্যে বিএফএফের নির্বাহী পরিচালক সাজ্জাদুর রহমান চৌধুরী বলেন, বিএফএফ-সমকাল বিজ্ঞান বিতর্কের এটা নবম আসর। ২০১৩ সাল থেকে এই কার্যক্রম আমরা চালিয়ে আসছি। উদ্দেশ্যে একটাই- বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গড়ে তোলা। আমরা চাই তৃণমূলের প্রতিটি স্কুলে বিজ্ঞান ক্লাব, বিজ্ঞানাগার প্রতিষ্ঠায় সরকার যেন উৎসাহ ও পৃষ্ঠপোষকতা দেয়।

পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সুহৃদ সমাবেশের বিভাগীয় সম্পাদক আসাদুজ্জামান।

গতকালের চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন সাবেক কৃতী বিতার্কিক মাজেদ আজাদ, দেবাশীষ রঞ্জন সরকার, আবদুল্লাহ আল মামুন, হাসান জাকির ও নুসরাত আমীন।

চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করেন বিএফএফের সভাপতি ড. ইফতেখারুজ্জামান। পরে অনুষ্ঠানের বিজয়ী ও রানারআপ দলগুলোর মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

চ্যাম্পিয়ন দল জিতেছে চ্যাম্পিয়ন সম্মাননা, প্রত্যেকে একটি ল্যাপটপ, ক্রেস্ট আর সনদপত্র। রানারআপ দলের তার্কিকরা প্রত্যেকে একটি নেটবুক, ক্রেস্ট আর সনদপত্র। দুই সেমি ফাইনালিস্ট দলের প্রত্যেকে স্মার্টফোন, ক্রেস্ট আর সনদপত্র পেয়েছে।

পেছনের কথা: ‘বিতর্ক মানেই যুক্তি, বিজ্ঞানে মুক্তি’ শিরোনামে ৫২০ স্কুলের বিতার্কিক দল নিয়ে নবমবারের মতো এ আয়োজন শুরু হয় গত ৫ অক্টোবর। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভীতি কাটিয়ে বিজ্ঞানের জয়গান গাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই ২০১৩ সালে শুরু হয়েছিল বিজ্ঞানবিষয়ক এই স্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাউন্ডেশন ও সমকালের এ উদ্যোগ, যার আয়োজক সমকাল সুহৃদ সমাবেশ। দেশের হাজারো সুহৃদের সহযোগিতার মাধ্যমে এ বিতর্ক প্রতিযোগিতা বাস্তবায়ন হয়েছে। পূবালী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এই কর্মযজ্ঞে অংশীদার হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *