দেশজুড়ে বিএনপির কর্মসূচি

বাংলাদেশ ব্রেকিং নিউজ

সংঘাত গুলি আগুন ভাঙচুর ধরপাকড়

রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী নানা কর্মসূচি নির্ঝঞ্ঝাটে শেষ করলেও গতকাল সোমবার বেশ কয়েকটি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে উত্তাপ। পূর্বঘোষিত কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েন দলটির নেতাকর্মীরা। হয়েছে সংঘাত, গুলি, ভাঙচুর, লাঠিপেটা, অগ্নিসংযোগ ও ধরপাকড়। সরকারের পদত্যাগ, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ ১০ দফা দাবি এবং বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে গতকাল দেশজুড়ে এ কর্মসূচির ডাক দেয় বিএনপি।

সবচেয়ে বড় সংঘাতের ঘটনাটি ঘটেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। সেখানে বিএনপি নেতাকর্মীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করে দলটির কর্মীরা। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাটিপেটা, মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। রাত ৯টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ১৬ নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের নামে মামলার প্রস্তুতি চলছে। এ ঘটনার জন্য পুলিশকে দায়ী করছে বিএনপি। তবে পুলিশ বলছে, বিএনপি পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী হামলা চালিয়েছে। এ হামলায় পুলিশের ১৫ সদস্য রক্তাক্ত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়েছে। আহতদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে নরসিংদীর পলাশে ছাত্রলীগের মিছিল থেকে গুলি চালানোর অভিযোগ করেছে ছাত্রদল। এ ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন স্থানীয় ছাত্রদলের সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান পাপন। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় আওয়ামী লীগের হামলায় বিএনপির ১০ নেতাকর্মী আহত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে পুলিশের পিটুনিতে আহত হয়েছেন দলটির পাঁচ নেতাকর্মী। এ ছাড়া ফেনীর দাগনভুঞা, রংপুরের মিঠাপুকুর, মাগুরা, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, পাবনার চাটমোহর এবং রাজশাহীর বাঘায় বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশ বাধা দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এদিকে ঢাকার ধামরাইয়ে ৯ এবং কিশোরগঞ্জে তিন নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।

বিএনপির মিছিল-সমাবেশ ঘিরে গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চট্টগ্রামের কাজীর দেউড়ি, নুর আহমদ সড়ক, নেভাল অ্যাভিনিউ, সিআরবির উত্তর পাশ ও এমএ আজিজ স্টেডিয়াম এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। দফায় দফায় চলে এই হাঙ্গামা। বিএনপি নেতাকর্মীরা এক পর্যায়ে পুলিশের মোটরসাইকেলে আগুন দেয়, ভাঙচুর করে বেশ কিছু গাড়ি। লাঠিপেটা, কাঁদানে গ্যাস ও ফাঁকা গুলি ছুড়ে পুলিশ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে। বিএনপি নেতাকর্মীরাও ইটপাটকেল ছুড়ে পাল্টা জবাব দেয়। চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। সংঘর্ষ যখন চলছিল, তখন কয়েকশ গজের ব্যবধানে নাসিমন ভবন চত্বরে বিএনপির সমাবেশ চলছিল। সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লে সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। এ ঘটনায় পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। সংঘর্ষ চলাকালে কাজীর দেউড়ি ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকজন ভয়ে দিজ্ঞ্বিদিক ছোটাছুটি করতে থাকে।

সংঘর্ষ চলাকালে কাজীর দেউড়ি মোড়ের অদূরে খোয়াজা হোটেলের সামনে বিএনপির এক কর্মীর হাতে একটি পিস্তলও দেখা যায় বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। সংঘর্ষের সময় দলীয় কার্যালয়ের সমাবেশের মাঠ থেকে মাইকে নেতাকর্মীদের শান্ত থাকার জন্য বলছিলেন নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল বিকেল ৩টা থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনে যাচ্ছিলেন। এ সময় নগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে সভার কার্যক্রমও চলছিল। কাজীর দেউড়ি মোড়ে একটি বড় মিছিল ঘিরে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় কাজীর দেউড়ি ট্রাফিক বক্সের সামনে থাকা পুলিশের একটি মোটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয় দলটির নেতাকর্মীরা। এর পরই মারমুখী হয়ে ওঠে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তাদের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে অতিরিক্ত পুলিশ। আসে সাঁজোয়া যান, জলকামানও।

এদিকে কাজীর দেউড়ি মোড়ে যখন বিএনপির সংঘর্ষ চলছিল, তখন এর আধা কিলোমিটার অদূরে নেভাল অ্যাভিনিউ সড়কে ঝটিকা লাঠিসোটা নিয়ে যানবাহনের ওপর চড়াও হয় কিছু যুবক। তারা লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল ছুড়ে ৮ থেকে ১০টি প্রাইভেটকার ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাঙচুর করে।
এদিকে মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘পুলিশ ইচ্ছে করেই কাজীর দেউড়ি মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে আমাদের কর্মীদের ছত্রভঙ্গ করতে চেয়েছে। এ কারণে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ অন্তত ২০ নেতাকর্মীকে আহত করেছে এবং বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে।’

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (দক্ষিণ) নোবেল চাকমা বলেন, ‘বিএনপির সমাবেশের কারণে কাজীর দেউড়ি মোড়ে ব্যারিকেড দিয়ে বিকল্প পথে যান চলাচল করা হচ্ছিল। এ সময় পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বিএনপি নেতাকর্মীরা এসে কাজীর দেউড়ি মোড়ে পুলিশ বক্সের সামনে থাকা টিআইয়ের (ট্রাফিক ইন্সপেক্টর) মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেন। পুলিশের ওপর হামলা চালান। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের গাড়ি ও দোকানপাটে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছেন তাঁরা। এ সময় অভিযান চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’

নগর পুলিশের কোতোয়ালি জোনের সহকারী কমিশনার অতনু চক্রবর্তী বলেন, ‘বিএনপি নেতাকর্মীর হামলায় পুলিশের ১৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ট্রাফিক পরিদর্শক বিপ্লব বড়ূয়ার অবস্থা গুরুতর। পুলিশের ওপর হামলায় জড়িত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের নামে পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা ও সরকারি সম্পত্তি ক্ষতির অভিযোগে মামলার প্রস্তুতি চলছে।’

এদিকে নরসিংদীর পলাশে মিছিলে যাওয়ার পথে ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান পাপন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। গতকাল দুপুরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে মিছিলে যোগ দেওয়ার পথে ছাত্রলীগের মিছিল থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ছাত্রদল নেতারা। পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব আরিফুল ইসলাম জানান, সমাবেশে যাওয়ার জন্য আমরা জড়ো হলে পলাশ উপজেলা ছাত্রলীগের কয়েকশ নেতাকর্মী আমাদের বাধা দেয় ও মারধর করে। এক পর্যায়ে গুলি করলে পাপনের পায়ে লাগে। প্রথমে তাঁকে পলাশ উপজেলা হাসপাতালে এবং পরে নরসিংদী জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। পলাশ উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি রনি প্রধান বলেন, কোনো ধরনের মারামারির ঘটনা ঘটেনি। তাঁদের দলীয় কোন্দলের কারণে গুলির ঘটনা ঘটতে পারে। এ ব্যাপারে পলাশ থানার ওসি বলেন, ঘটনাটা শুনেছি, তবে কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি।

ঢাকার ধামরাইয়ে বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য উপজেলা বিএনপির সভাপতি তমিজ উদ্দিনসহ ৯ নেতাকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল সকালে নেতাকর্মীরা পৌর এলাকার আইনঙ্গন মোড়ে মিছিল শেষে সমাবেশ করে। এ সময় পুলিশ ধাওয়া দিয়ে ব্যানার ছিনিয়ে নিয়ে আট নেতাকর্মীকে আটক করে। এক পর্যায়ে তাঁদের ছাড়িয়ে নিতে উপজেলা বিএনপির সভাপতি তমিজ উদ্দিন পুলিশের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন। এর পর পুলিশ তাঁকেও আটক করে। আটক নেতাকর্মীরা হলেন- পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মারুফ সিকদার, কুশুরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবদুল হাই, বিএনপি নেতা মিখাইল, আবুল হোসেন, লাবলু মিয়া, শরিফুল ইসলাম, মর্তুজ মিয়া ও আহম্মেদ আলী।
কিশোরগঞ্জ শহরের ইসলামিয়া সুপার মার্কেট এলাকা থেকে রোববার রাতে ছাত্রদলের সিনিয়র সহসভাপতি রেদুয়ান রহমান ওয়াকিউরকে আটক করেছে পুলিশ। গতকাল দুপুরে বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দেওয়ার সময় শহরের রথখলা থেকে জেলা বিএনপির সহসম্পাদক নুরুল ইসলাম মোল্লাকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া পাকুন্দিয়ার এক যুবদল নেতাকে আটক করা হলেও তাঁর নাম জানা যায়নি।

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় গতকাল সকালে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশ বাধা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। এ সময় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীর হামলায় বিএনপির অন্তত ১০ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে দলটির তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। কাপাসিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি শাহ্‌ রিয়াজুল হান্নান রিয়াজ জানান, পুলিশের বাধায় আমাদের বিক্ষোভ মিছিলটি প হয়ে যায়। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগ একটি মিছিল নিয়ে উপজেলা সদরের সামনে বিএনপি নেতাকর্মীর ওপর হামলা চালায়। তবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান প্রধান হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেন। কাপাসিয়া থানার ওসি এএফএম নাসিম জানান, আমরা কোনো মিছিলে বাধা দেয়নি।
টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের লাঠিপেটায় পাঁচ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহীনুর রহমান শাহীন বলেন, মিছিলটি ঘাটাইল কলেজ মোড় এলাকায় পৌঁছালে মিছিলের পেছন থেকে এলোপাতাড়ি লাঠিপেটা করে পুলিশ। এতে পাঁচ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। ঘাটাইল থানার উপপরিদর্শক পলাশ আহমদ বলেন, কোনো ধরনের লাঠিপেটা করা হয়নি। বিএনপির নেতাকর্মীরা উপজেলার ভেতরে একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করছিল। ওয়ার্কিং ডে থাকায় তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল বের করার সময় পুলিশ পাঁচ নেতাকর্মীকে আটক করে। তাঁরা হলেন- বুলবুল হোসেন, বাবু ইসলাম, মিল্টন, কেরানী ও মুক্তা। পরে দলটি আর মিছিল বের করতে পারেনি। উল্লাপাড়া মডেল থানার ওসি মো. নজরুল ইসলাম জানান, আটক নেতাকর্মীকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
ফেনীর দাগনভুঞার আলাইয়ারপুর থেকে গতকাল সকালে বিএনপির মিছিল বাজারের দিকে যেতে চাইলে শহরের সরকারি ইকবাল মেমোরিয়াল কলেজের সামনে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে।
রংপুরের মিঠাপুকুরে ডিসির মোড়-সংলগ্ন দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলটি পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। পুলিশি বাধায় মিছিল নিয়ে সামনে যেতে পারেননি নেতাকর্মীরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে বাগ্‌বিত ায় জড়ান নেতাকর্মীরা। পরে সেখানেই প্রতিবাদ সমাবেশ করেন তাঁরা।
মাগুরায় সমাবেশ শেষে বিএনপি নেতাকর্মীরা শহরে মিছিল বের করতে চাইলে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। এ সময় নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন।

রাজশাহীর বাঘায় বিএনপি ঝটিকা মিছিল বের করলে তাতে বাধা দেয় পুলিশ। এর আগের দিন রাতে পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল লতিফকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পাবনার চাটমোহরে গতকাল বিএনপির দুই গ্রুপ আলাদা মিছিল বের করে। দুই মিছিলেই পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় নেতাদের সঙ্গে পলিশের বাগ্‌বিত া হয়।

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন সংশ্নিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *