হাইকোর্টের উষ্মা-ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আগুন থামান, নইলে সবাইকে জ্বলতে হবে

বাংলাদেশ ব্রেকিং নিউজ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ ফারুক আহমেদের সঙ্গে অশালীন আচরণের ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ওই বিচারককে গালাগাল ও অশালীন আচরণের ঘটনায় উষ্মা প্রকাশ করেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ওই বিচারকের সঙ্গে আইনজীবীরা যে আচরণ করেছেন তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এ ধরনের ঘটনা অব্যাহত থাকলে বিচার বিভাগ ও আইন-আদালত বলে কিছু থাকবে না। সবাই মিলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আগুন না থামালে আমাদের সবাইকে জ্বলতে হবে।

বিচারপতি জে বি এম হাসান ও রাজিক আল জলিলের বেঞ্চ মঙ্গলবার এ মন্তব্য করেন। এ সময় আইনজীবী নেতাদের উদ্দেশে হাইকোর্ট বলেন, আর কেউ আদালত বর্জন করবেন না।

গত ৫ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি তানভীর আহমেদ ভুঞা, সম্পাদক (প্রশাসন) আক্কাস আলী ও জুবায়ের ইসলামকে তলব করেন হাইকোর্ট। মঙ্গলবার তাঁরা হাইকোর্টে হাজির হন। এদিন শুনানির পুরো সময় এজলাস কক্ষে দাঁড়িয়ে ছিলেন ওই তিন আইনজীবী।

আদালতে তাঁদের পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির, সম্পাদক আব্দুন নুর দুলাল, আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক, সাঈদ আহমেদ রাজা প্রমুখ। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. গোলাম রাব্বানী ও সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

বিচারকের সঙ্গে অশালীন আচরণের ঘটনায় আদালত অবমাননার ব্যাখ্যা দিতে তিনজনের পক্ষে দুই মাস সময় চান অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন এবং সুপ্রিম কোর্টে বারের সভাপতি মোমতাজ উদ্দিন ফকির। উভয় পক্ষের শুনানির পর ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় দেন আদালত। ওই দিন তিন আইনজীবীকে পুনরায় সশরীরে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।

শুনানিতে হাইকোর্ট বলেন, আদালত অবমাননার রুল জারির পর থেকে এ বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নজির দেখেছি, পড়েছি। পৃথিবীর কোথাও আদালত কক্ষে এ রকম ঘটনা ঘটেনি। সেখানে বার সভাপতির নেতৃত্বে এ ঘটনা ঘটেছে, এটা তো আরও দুঃখের বিষয়। এটি সভ্যতাবিবর্জিত ঘটনা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বার সভাপতিকে উদ্দেশ করে হাইকোর্ট বলেন, আপনি শুধু আইনজীবী নন, আপনি আইনজীবীদের নেতা। মানুষ যখন বড় পদে যায়, তখন আরও বিনয়ী হয়। তাঁর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়।

এ সময় আইনজীবী মোমতাজউদ্দিন বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া বার সভাপতি আইনজীবী সমিতির সদস্যেদের পক্ষে কথা বলেছেন। এটা বারের সিদ্ধান্ত ছিল। তিনি ব্যক্তিগত স্বার্থে এটা করেননি।

হাইকোর্ট বলেন, বারের কথা বারে বলবেন, প্রয়োজন হলে প্রধান বিচারপতিকে বলবেন। আদালত তো শক্তি প্রদর্শনের জায়গা নন। এখানে আমাদের সবার মর্যাদার বিষয়। আদালতকে অসম্মান করলে কারও জন্য শুভ হবে না। আদালত না থাকলে আপনারাও থাকবেন না। আইনজীবীরা যদি এমন আচরণ করেন, তাহলে সাধারণ মানুষ বিচারপ্রার্থীরা কী ভাববেন। বারের সদস্যরা আগুন নিয়ে খেলছেন, তাঁদের জন্য বার্তা দিতে চাই। রাষ্ট্রকে অকার্যকরের অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আইনজীবী মোমতাজউদ্দিন বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনায় আপনারা (হাইকোর্ট) আইনজীবীদের তলব করলেন। আদালত অবমাননার রুল জারি করলেন। কিন্তু বিচারকদের প্রতি আদালত অবমাননার রুল জারি করলেন না। আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারক খুব খারাপ আচরণ করেছেন। আমরা কত দিন এ আচরণ সহ্য করব। এ সময় আদালতে উপস্থিত আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতির বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে উচ্চৈঃস্বরে ঠিক ঠিক বলে ওঠেন।

হাইকোর্ট বলেন, এই ঘটনা সত্যিই অপ্রত্যাশিত। এখানে কি বার এবং বেঞ্চের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে? এজলাস কক্ষে কি বাইরে থেকে লোক এসেছে? সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা তো এ রকম করতে পারেন না। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিনও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা এটা করতে পারেন না। সবাই চুপ করুন। এ পর্যায়ে হাইকোর্ট বলেন, এ ঘটনায় অনেক প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করতে পারে। অনেকে বিচার বিভাগের মতো প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। সমাধান হতেই হবে। কোনো আদালত বর্জন চলবে না। এ পর্যায়ে সুপ্রিম কোর্ট বারের সম্পাদক আব্দুন নুর দুলাল বলেন, শুধু আইনজীবী নন, এখানে বিচারকদেরও দায়িত্ব আছে। ওখানে এজলাস কক্ষে সবকিছু ঠিক ছিল, তবে ভিডিও হলো কীভাবে?

এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন ও বার সভাপতি মোমতাজউদ্দিনসহ অন্য আইনজীবীরা আদালতকে বলেন, আমরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছি। কাজ শুরু করেছি। আমাদের সময় দিন। এ ঘটনা অনভিপ্রেত, আমরা লজ্জিত। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ঘটনার ভিডিও মুছতে হবে। আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক বলেন, এজলাস কক্ষে এ ভিডিও হলো কী করে? আদালতের কার্যক্রম চলাকালে এ ধরনের ভিডিও ধারণ হতে পারে না।

হাইকোর্ট বলেন, ওখানকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে আমরা কিন্তু আইন অনুযায়ী চলব এবং শেষ পর্যন্ত দেখব। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। আমরা জুডিশিয়ারিকে ধ্বংস হতে দিতে পারি না। প্রতি মুহূর্ত পর্যবেক্ষণ করছি। মহামান্য (রাষ্ট্রপতি) ছাড়া কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। বিচারক ভুল করতে পারেন। এর জন্য প্রধান বিচারপতি এবং আইনমন্ত্রী আছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *