সুরক্ষার বিমায় শুধু ভোগান্তি

অর্থনীতি

বিমা এখন মানুষের কাছে ভোগান্তির আরেক নাম। বিমা কোম্পানিগুলোর কাছে দাবি তুললেই শুরু হয় গড়িমসি আর ছলচাতুরী। সব রকমের শর্ত পূরণের পরও অধিকাংশ বিমা কোম্পানি যেমন সময়মতো অর্থ পরিশোধ করে না, তেমনি বিমা দাবির জন্য গেলে কথাও শুনতে চায় না। এ নিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে অভিযোগ করার পর কাজ হয়েছে, তারও নজির কম।

বিমা খাতের এই দুরবস্থার কথা স্বীকার করেছেন খাতটির নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আইডিআরএর চেয়ারম্যান জয়নুল বারী। তিনি বলেন, এই খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা দাবি পূরণ নিয়ে গড়িমসি করা। এ কারণে খাতটিও বিকশিত হচ্ছে না। তবে অভিযোগ পেলে আইডিআরএ ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

সরকারি হিসাবে দেশে জীবনবিমা কোম্পানি আছে ৩৫টি, আর সাধারণ বিমা কোম্পানি আছে ৪৬টি। গ্রাহকের হিসাব কষলে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক আছে জীবনবিমায়, তার সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। বিমা দাবি পরিশোধ নিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জীবনবিমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে।

সাধারণ বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্রাহক আছে ৩০ লাখ। দাবি পরিশোধ করা নিয়ে ছলচাতুরীর অভিযোগ সেখানেও কম নয়। অনেকে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন আদালতে বিমাসংক্রান্ত ১৯ হাজার মামলা আছে। এসব মামলায় গ্রাহকের আটকে থাকা দাবির পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। গ্রাহকেরা বলছেন, বিমা দাবি নিয়ে পরিস্থিতি এখন এমন হয়েছে, যেকোনো বিমা কোম্পানির কার্যালয়ের সামনে গেলেই একাধিক ভুক্তভোগীকে পাওয়া যাবে।

ময়মনসিংহের বাসিন্দা আবদুল মান্নান চৌধুরী অভিযোগ করেন, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সে তাঁর স্ত্রীর নামে তিনটি পলিসি ছিল। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তিনি বিমা দাবি করতে গেলে কোম্পানি তা নাকচ করে দেয়। এরপর তিনি বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আইডিআরএর কাছে অভিযোগ করেন। আইডিআরএ বিমা দাবি পরিশোধের নির্দেশ দিলেও কোম্পানি তা কানে তোলেনি।

ভোগান্তির শিকার আরেক গ্রাহকের পলিসির নমিনি মোহাম্মদ ইস্রাফিল ভূঁইয়া। তিনি জানান, ফারইস্টে তাঁর স্ত্রীর একটি বিমা পলিসি রয়েছে। দাবি করা অর্থের পরিমাণ ২৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। নিয়মিতভাবে ৩ বছর প্রিমিয়াম দেওয়ার পর ২০১৯ সালের ৬ ডিসেম্বর মারা যান তাঁর স্ত্রী, কিন্তু সেই কোম্পানি টাকা আর পরিশোধ করেনি।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের সিইও আপেল মাহমুদ বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে নিয়োগ পেয়েছি। এ ব্যাপারে কিছু জানি না।’

শুধু ফারইস্ট ইসলামী লাইফ নয়, অন্যান্য বিমা কোম্পানিতেও একই চিত্র। বিমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী পলিসির মেয়াদপূর্তির ৯০ দিনের মধ্যে দাবি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ৯০ দিনের পরে করলে ৫ শতাংশ করে সুদ দিতে হবে, কিন্তু আইনের এই বিধান কেবলই কাগজে।

দেশে বিমা খাতে দেশের সবচেয়ে বড় কোম্পানি জীবন বীমা করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটির হালনাগাদ তথ্য বলছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে মোট দাবি এসেছে ৫ হাজার ২৫৫টি। তাদের হাতে এখন আগের বছরসহ নিষ্পত্তি না হওয়া দাবির সংখ্যা ৭ হাজার ৯৩৪।

জানতে চাইলে জীবন বীমা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে করোনার মধ্যে অসংখ্য বিমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। আমাদের দাবি নিয়ে সমস্যা নেই।’

২০০৭ সালে গোল্ডেন লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে ১০ বছর মেয়াদি বিমা করেন রাজবাড়ী শহরের বিনোদপুর ভাজনচালা এলাকার গৃহিণী হাসিনা খাতুন। পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কোনোভাবে টাকা তুলতে পারেননি। 

সাধারণ বিমাতেও দীর্ঘসূত্রতা 
সাধারণ বীমা করপোরেশনের গ্রাহক ছিলেন চট্টগ্রামের হালিশহরের ব্যবসায়ী মুহাম্মদ মুহসীন খান। তিনি সুইডেনে উন্নত মানের বাঁশ রপ্তানির জন্য সাধারণ বীমা করপোরেশনে ২ লাখ টাকার দুই বছর মেয়াদি ঝুঁকি বিমা করেন। এরপর ঝড় ও প্রবল বন্যায় তাঁর গুদাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু বিমার টাকা আর পাননি। পরে চট্টগ্রামের আদালতে মামলা করেন মুহসীন খান।

সাধারণ বীমা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ বেলাল হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী দাবি করার সঙ্গে সঙ্গে সার্ভেয়ার পাঠানো হয়। কোনো সমস্যা না থাকলে দাবি অনুযায়ী অর্থ দেওয়া হয়। তবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে কিছু দাবি নিষ্পত্তি করতে বিলম্ব হয়।’

জনতা ইনস্যুরেন্স কোম্পানিতে বিমা করেছিলেন ফরিদপুরের বাসিন্দা ও সাবেক এমপি খন্দকার নাসিরুল ইসলামের স্ত্রী লায়লা আরজুমান বানু। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান ‘বেস্ট অব দ্য বেস্ট গোল্ডেন ফাইবার্স’-এর বিমার দাবি পরিশোধ না করে উল্টো বিমা কোম্পানি তাঁদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করেন। পরে পিবিআই তদন্ত করে তাঁদের পক্ষে রায় দেয়।

ভুল দাবিও আছে
রাজধানীর বিজয়নগর এলাকার ‘মেসার্স আশা এক্সেসরিজ’-এর মালিক আলমগীর কবির নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালামালের বিপরীতে মেঘনা লাইফ ইনস্যুরেন্সে ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার ঝুঁকি বিমা করেছিলেন। ২০১৫ সালের ২৭ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটিতে আগুন লাগে। কিন্তু দাবির টাকা তিনি আর পাননি। পরে আদালতে মামলা করেন।

আইডিআরএর সাবেক চেয়ারম্যান এম মোশাররফ হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, পুরো বিমা খাতকে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ভেতরে আনলে এ ধরনের অভিযোগ থাকত না। 

বিমায় অনাস্থা বাড়ছে মানুষের
বিমা নিয়ে মানুষের অনাস্থা কোন পর্যায়ে, তা পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়েছে। আইডিআরএর পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত দেশে ৩১টি জীবনবিমা কোম্পানিতে বিমা পলিসির সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৮ লাখ ৬০ হাজার। আর গত বছরের জুন পর্যন্ত জীবনবিমা কোম্পানিগুলোতে সচল বিমা পলিসির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩ লাখ ৮৩ হাজার। সেই হিসাবে ৫ বছরের পলিসির সংখ্যা কমেছে ১ কোটি ৩৪ লাখ ৭৭ হাজার বা ৬৫ শতাংশ।

অন্যদিকে নন-লাইফ ইনস্যুরেন্স খাতে বিমা পলিসি ২০২১ সালে ১১ লাখ ৩৯ হাজারে নেমে এসেছে, যা ২০১৭ সালে ছিল ২৪ লাখ ১৮ হাজার। সেই হিসাবে নন-লাইফ ইনস্যুরেন্স খাতে পাঁচ বছরে পলিসির সংখ্যা কমেছে প্রায় ১২ লাখ ৭৮ হাজার ৭২৩টি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিমার প্রতি মানুষের আস্থা কমার মূল কারণ গ্রাহকের সঙ্গে বিমা কোম্পানিগুলোর প্রতারণা, অস্বচ্ছতা ও বিমা দাবি পরিশোধে ছলচাতুরী। এর সঙ্গে আছে কাগজপত্রের নামে সীমাহীন ভোগান্তি।

মাঝপথে তামাদি পলিসি
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিমা খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো মেয়াদ পূরণের আগেই গ্রাহক ঝরে পড়া। বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) তথ্য অনুযায়ী, হিসাব খেলার পরে এক বছর পার করতে পারেনি এমন পলিসি ৭০ শতাংশ। প্রথম বছরে ৭০ শতাংশই প্রিমিয়াম কিস্তি আদায় হলেও পরের বছরে অর্ধেকে নেমে আসে।’

বিমা বিষয়ে গবেষণা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের শিক্ষক সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, কোনো গ্রাহক পলিসি চালু না রাখলে কোম্পানিরই লাভ, তখন পুরো টাকাটাই কোম্পানির হয়ে যায়, কিন্তু গ্রাহকেরা সেটা জানেন না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিভিন্ন দেশে জিডিপিতে বিমা খাতের অবদান ১০ শতাংশের বেশি হয়, কিন্তু বাংলাদেশের জিডিপিতে বিমা খাতের অবদান শূন্য দশমিক ৫৭ শতাংশ। এজেন্টদের অর্থ আত্মসাৎ এবং বিমা দাবি পরিশোধে কোম্পানিগুলোর গড়িমসিই এর প্রধান কারণ।’

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, বিমা খাত বিকশিত না হওয়ার মূলে রয়েছে মানুষের দাবি নিষ্পত্তি করা নিয়ে উদাসীনতা এবং গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করা। এসব দূর না হলে বিমা খাত বিকশিত হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *