কফির আমন্ত্রণ কিংবা পত্রমিতালি থেকে ডেটিং অ্যাপ

লাইফ স্টাইল

কিছুদিন আগে নুহাশ হুমায়ূনের কাউকে ‘কফি খাবা’ প্রস্তাবের স্ট্ক্রিনশট উন্মুক্ত হওয়ার পর জনপরিসরে আলোচনায় এসেছে বাম্বল ও ডেটিং অ্যাপ। যদিও বাংলাদেশে এখনও ‘ডেট কনসেপ্ট’ গড়ে ওঠেনি। না ছেলেরা বোঝে, না মেয়েরা। আসলে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা যে কোনো ডেটিং অ্যাপ ব্যবহার করছে, এটিই যেন অজানা-অকল্পনীয় এক গল্প। সে কারণেই কি সামান্য কফির আমন্ত্রণ চায়ের কাপে ঝড় তুলেছিল?

এই নয় যে, ভার্চুয়াল জগতে পিছিয়ে আছি আমরা। আগে সবুজ বাতি মানে শুধু ট্রাফিক সিগন্যাল হলেও এখন সবুজ বাতি থাকা-না থাকা মানে কারও অনলাইন অথবা অফলাইনে থাকা। জীবনযাপন এভাবে পাল্টে যাচ্ছে একের পর এক। উত্তরবঙ্গে বসে স্ট্ক্রিনে আঙুল সোয়াইপ করলেই ওয়াশিংটন নিয়ে জানা যায়। ফোনে তো কথা বলা যায়-ই, দেখাও যায়। মিটিং করা যায়, অফিস করা যায়, বাজার করা যায়, করা যায় লেখাপড়াও। এ এক জাদুবাস্তব- যাকে সবাই বলছে ভার্চুয়াল দুনিয়া।
সোশ্যাল মিডিয়া ও ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডে এই সময়ের চর্চা হলেও ইন্টারনেট, ই-মেইলবিহীন যুগে মানুষ কি দূরত্ব পেরিয়ে যোগাযোগ করেনি? কবুতরের পায়ে বেঁধে দেওয়া চিঠি থেকে রানারের চিঠির ব্যাগ নিয়ে ছুটে চলার যুগ এসেছে। পত্রপত্রিকায় চিঠিপত্র কলাম জমজমাট ছিল। পত্রমিতালির চর্চা ওভাবেই এসেছে। পরে পত্রমিতালির মাধ্যমে সঙ্গী খোঁজার বাণিজ্যিক এজেন্সিও হয়েছিল। একে নিশ্চয়ই ‘স্টার্টআপ’ বলা যায়।

আশি-নব্বইয়ের দশকে দৈনিক ও সাপ্তাহিকে ছাপা পত্রমিতালির বিজ্ঞাপন থেকে যাঁরা বন্ধু ও জীবনসঙ্গী হয়েছেন, তাঁদের নিয়ে ২০১৮ সালে প্রতিবেদন করেছিল বিবিসি বাংলা। পত্রমিতালি এখন তামাদি হয়েছে। ই-মেইলের যুগে কেউ চিঠি লেখে না। ডাকহরকরা নেই, বিশাল কাভার্ডভ্যান ডকুমেন্ট-পার্সেল কুরিয়ার নিয়ে ছোটে।
মোবাইল ফোনের যুগে এসএমএস-টেক্সটিং খুব কার্যকর। মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ নতুন আঙ্গিকে যোগাযোগ গড়ছে, টিকিয়ে রাখছে। সময়টা অ্যাপেরও। বিদ্যুৎ বিলের অ্যাপ, রেকর্ডিং অ্যাপ, এডিটিং অ্যাপ, পিরিয়ড ট্র্যাকার অ্যাপ; জীবনের সব মুশকিল আসান করে দিতে এসেছে অ্যাপ।
জীবনের আরও অনেক কিছুর মতো প্রেম-ভালোবাসা-বন্ধুত্বেও ডিজিটালাইজেশন ঘটেছে। পত্রিকায় ঘটক পাখি ভাইয়ের বিজ্ঞাপন থেমে গেলেও পাত্রপাত্রী খোঁজার ওয়েবসাইট চালু হয়। ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলে কয়েকটি ম্যাট্রিমোনিয়াল ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন দেখা যেত। এরপর আসে ডেটিং পার্টনার খোঁজার অ্যাপ।
২০১২ সালে ডেটিং অ্যাপ টিন্ডার চালু হয়। বিশ্বে টিন্ডারের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। ২০১৪ সালে আসে বাম্বল। বাম্বলের ভারতযাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালে। তবে টিন্ডার ভারতে ঢোকে ২০১৬ সালে। ব্র্যান্ডিং গড়তে ভারতেও কার্যালয় খোলে টিন্ডার। ইউটিউব-ফেসবুকের এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এখনও এসবের কোনো কার্যালয় নেই।
ডেট সংস্কৃতি ইউরোপ-আমেরিকায় নতুন কিছু নয়। সন্তানরা বাবা-মায়ের সঙ্গেও তাদের প্রথম ডেটে যাওয়ার উচ্ছ্বাস, ভয় ও প্রস্তুতি নিয়ে কথা বলে। মেয়ে বড় হয়ে যে ছেলের সঙ্গে ডেট করতে যাবে, সেই ছেলে ঠিকঠাক আচরণ করবে কিনা ভেবে সেখানে বাবাদের ‘বিপি’ বেড়ে যায়।
যুক্তরাজ্যের ছেলেমেয়েরা প্রথম ডেটে কতটা লাজুক থাকে, ডেটে আসা আমেরিকানদের আদব-কায়দা কেমন হয়, এক দশকে ডেট কতটা কঠিন হয়ে উঠেছে, মি টু আন্দোলন ডেটিং আমন্ত্রণে কেমন অনীহা জাগিয়েছে- এসব সেখানে আলোচনা হয়। পরিসংখ্যান, লেখচিত্র সহকারে গবেষণা প্রতিবেদনও হয়।
পশ্চিমের ডেট সংস্কৃতিতে সহজে মানিয়ে গেছে ডেটিং অ্যাপ। ভারতেও নতুন প্রজন্ম থেকে মধ্যবয়সীরা ডেটিং অ্যাপে জীবনসঙ্গী খুঁজে নিতে আগ্রহী। এ নিয়ে ভারতীয় ইউটিউবারদের দারুণ কিছু নাটক বা কনটেন্ট রয়েছে। ভারতীয় স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান অনেকের ডেটিং অ্যাপ নিয়ে ভীষণ হাসির স্টেজ পারফরম্যান্স আছে। অর্থাৎ, ডেটিং অ্যাপগুলোর সঙ্গে তাদের লাইফস্টাইল এতটাই জড়িয়ে গেছে।

ডেটিং অ্যাপ আসলে কী? ফেসবুকে আমরা যেভাবে আলাপ করি; রাজনীতি, সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করি- ডেটিং অ্যাপ তেমনভাবে সাজানো নয়। লিঙ্কডইনে প্রফেশনাল বায়োডাটা যেমন করে ঝুলিয়ে রাখা হয়, ডেটিং অ্যাপ তেমনও নয়। ডেটিং অ্যাপে আইডি খোলা মানে ওই ইউজার আসলে ঘোষণা করে দিলেন- তিনি জীবনসঙ্গী খুঁজতে ও ডেট করতে আগ্রহী। ফলে নুহাশ হুমায়ূন কোনো ডেটিং প্ল্যাটফর্মে কাউকে কফির আমন্ত্রণ জানাতেই পারেন। আপত্তিকর ইঙ্গিত না থাকলেও নুহাশকে ‘এক্সপোজ’ করা হয়েছে বলে যে হৈচৈ হলো, তা হয়তো হুমায়ূন আহমেদপুত্র বলেই। তবে আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া কেউ কফির আমন্ত্রণ দিলেই যে অপরপক্ষ বিগলিত হয়ে রাজি হবেন, এমনও কথা নেই।
এটুকু বলতেই হবে- ‘কফি খাবা’ প্রশ্নটির মধ্যে কোনো কাব্য ছিল না। বরং ‘বিকেলের নাম ক্যাপাচিনো হোক’ ভীষণ যত্নশীল আমন্ত্রণ শোনায়। ডেট করার নিমন্ত্রণ কতটা কাব্যিক হতে পারে, তাই নিয়ে কিছুদিন আগে প্রতিবেদন করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। টেক্সট কীভাবে লিখতে হবে, তা নিয়ে অনেকেই গলদঘর্ম হন। উপরন্তু শর্টকাট টেক্সটে কথার অভিব্যক্তিও হারিয়ে যাচ্ছে। এই জটিলতা থেকে উদ্ধারে পেশাদার প্রশিক্ষক রয়েছেন বলেও জানা গেল প্রতিবেদনে। আগ্রহীদের জন্য রয়েছে নানা কোর্সও।

অ্যাপগুলো যেহেতু উন্মুক্ত, তাই বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরাও ডেটিং অ্যাপে নাম দস্তখত করতে পারেন। কিন্তু কতজন বাংলাদেশি, কোন বয়সী নারী-পুরুষ টিন্ডার ও বাম্বলে আছেন- তা পরিসংখ্যান-লেখচিত্রে দেখানোর মতো জায়গায় আমরা নেই। যারা এরই মধ্যে ডেটিং অ্যাপে আছেন, তাদের কোনো মানসিক ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই জলে নামতে হয়েছে।
চিঠি নেই। পত্রমিতালি নেই। পৃথিবী তবুও একেবারে রুক্ষ-শুস্ক হয়ে যায়নি। পাশ্চাত্যের ডেট ও ডেটিং অ্যাপ সংস্কৃতিতেও জন্মে মিষ্টি প্রেমের গল্প। আমাদের কিছু অযৌক্তিক রাখঢাকের এই পরিবার ও সমাজে আনুষ্ঠানিক ডেট সংস্কৃতি বুঝতে হয়তো আরও দু-তিন প্রজন্ম লাগবে। কিন্তু বদলটা আসবেই। আগামী প্রজন্মের কাছে ডেটিং অ্যাপ যদি লাইফস্টাইল হয়ে ওঠে, তা নিয়ে এখন থেকে আমাদের মন ও মগজে ভেন্টিলেশনের জায়গা রাখার সময় এসেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *