দাম বাড়লেও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সহসাই মিলছে না

অর্থনীতি

বিদ্যুৎ ও শিল্পে ১৭৯ শতাংশ গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে সরকার। উদ্দেশ্য, আন্তর্জাতিক খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে বেশি দামে এলএনজি কিনে এ দুই খাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। দাম বৃদ্ধির বর্ধিত আয় দিয়ে আগামী মার্চ থেকে সরকার ফের স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি (তরল প্রাকৃতিক গ্যাস) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে দিনে গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে পারে ২০ কোটি ঘনফুট। এরপরও বিদ্যুৎ ও শিল্পের চাহিদা মেটাতে দিনে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকবে। ফলে বাড়তি দামেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের নিশ্চয়তা মিলছে না। তবে আগের চেয়ে গ্যাসের প্রবাহ বাড়বে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্রমতে, এ ছাড়া ডলার সংকটের কারণে যেখানে কয়লা, তেলসহ বিভিন্ন নিত্যপণ্য আমদানি ব্যাহত হচ্ছে, সেখানে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা যথাযথভাবে কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে খাত-সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ।

এদিকে এত বেশি দাম বাড়ানো যৌক্তিক হয়নি বলে বিশ্নেষকরা মনে করছেন। তাঁদের মতে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ধাক্কা সামলে উঠতে পারবে না। বর্ধিত মূল্যে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে পেট্রোবাংলা ৫-৬ টাকা লাভ করবে। এই লাভের দরকার কতটুকু প্রয়োজন ছিল, সেটি নিয়েও বিতর্ক আছে।

অবশ্য জ্বালানি বিভাগ বলছে, যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুই বাড়ানো হয়েছে। দাম বাড়ালেও বাজেটের বরাদ্দকৃত ভর্তুকি লাগবে। বর্তমানে স্পট মার্কেটে এলএনজির যে দাম রয়েছে, তাতে বর্ধিত মূল্যে পেট্রোবাংলার লোকসান হবে না। কিন্তু দাম বেড়ে গেলে আবার লোকসানের মুখে পড়তে হবে।

দাম বৃদ্ধির নেপথ্যে

দেশের গ্যাস ঘাটতি মেটাতে ২০১৮ সালে আগস্ট থেকে সরকার এলএনজি আমদানি শুরু করে। একসময় দিনে ৮৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ হতো আমদানি করা এলএনজি থেকে। কাতার ও ওমান থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে এবং স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনত সরকার। করোনা-পরবর্তী চাহিদা বৃদ্ধি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গত বছর আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম হুহু করে বাড়তে থাকে। স্পট মার্কেটে যে এলএনজি বাংলাদেশ ১০/১২ ডলারে (প্রতি এমএমবিটিইউ) কিনত, তা বেড়ে ৫০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। দাম বৃদ্ধির কারণে লোকসান কমাতে সরকার গত জুলাই মাস থেকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা বন্ধ করে দেয়। ফলে দৈনিক গ্যাসের সরবরাহ ৪০-৪৫ কোটি ঘনফুট কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে সব খাতে। সিএনজি ও বাসাবাড়িতে সরবরাহ কমিয়েও সরকার পরিস্থিতি সামলাতে পারেনি। বিদ্যুৎ ও শিল্পে গ্যাসের ঘাটতি চরমে পৌঁছায়। সংকট মোকাবিলায় সরকার ঘোষণা দিয়ে বিদ্যুতে লোডশেডিং শুরু করে। শিল্প মালিকরা গ্যাসের জন্য হাহাকার শুরু করেন। তাঁরা বাড়তি দাম দিয়ে হলেও গ্যাস সরবরাহের নিশ্চয়তা চান। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার নির্বাহী আদেশে সরকার রেকর্ড পরিমাণ গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করে।
এ বিষয়ে বুধবার জ্বালানি বিভাগ এক বিবৃতিতে জানায়, ‘চলমান সেচ মৌসুম, আসন্ন রমজান ও গ্রীষ্মে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা মেটাতে এবং শিল্প খাতে উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে করণীয় সম্পর্কে সব অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়। যেহেতু স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করে এই দুই খাতের বর্ধিত চাহিদা পূরণ করতে হবে, সে কারণে বিদ্যুৎ, শিল্প, ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যবহূত গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে।’

স্পট এলএনজিতেও চাহিদা মিটবে না

চলতি অর্থবছর এলএনজি আমদানিতে সরকার ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি রেখেছে। গ্যাসের বর্ধিত দামের কারণে চলতি অর্থবছর সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে ২৭ হাজার কোটি টাকা। এ থেকে ৪৫০০-৫০০০ কোটি টাকা ভ্যাট-ট্যাক্স হিসেবে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হবে। ফলে ২২ হাজার কোটি টাকার মতো বাড়তি অর্থ থাকবে পেট্রোবাংলার হাতে। এই বাড়তি টাকা থেকে অন্যান্য ঘাটতি মেটানোর পর স্পট মার্কেট থেকে ১০-১২ কার্গো এলএনজি আনতে পারবে সংস্থাটি। সরকারের পরিকল্পনা মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত স্পট মার্কেট থেকে ১১-১২ কার্গো এলএনজি কেনা। মার্চে দুটি এবং মে-জুন পর্যন্ত ৩টি করে ৯ কার্গো আনার কথা। ফেব্রুয়ারিতেও একটি কার্গো আনার চেষ্টা চলছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
দৈনিক গ্যাসের সরবরাহ ৩১০ কোটি ঘনফুট হলে বিদ্যুৎ ও শিল্পের চাহিদা যথাসম্ভব মেটানো যাবে। তবে সিএনজি ও আবাসিকে গ্যাস রেশনিং করতে হবে। বর্তমানে পেট্রোবাংলা দিনে সরবরাহ করছে ২৭০ কোটি ঘনফুট। সংশ্নিষ্টদের মতে, এক কার্গো এলএনজি এলে দিনে ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ বাড়ে। মাসে দুই কার্গো এলএনজি এলে দৈনিক সরবরাহ বাড়বে ২০ কোটি ঘনফুট। তিন কার্গো এলে সরবরাহ বাড়বে ৩০ কোটি ঘনফুট। ফলে দিনে ১০ থেকে ২০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকবে। অর্থাৎ বাড়তি দাম দিয়েও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের নিশ্চয়তা মিলছে না বলে মনে করছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সমকালকে বলেন, ব্যবসায়ীদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতেই সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎ ও শিল্পে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে। পরিকল্পনা রয়েছে- মাসে বাড়তি ২ কার্গো এলএনজি কেনার। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ ও শিল্পে চাহিদা মতো গ্যাস দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, বিদ্যুতে বাড়তি দামে গ্যাস দিলেও লোকসান কম হবে। কারণ, তেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ আরও বেশি।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সমকালকে বলেন, ক’দিন আগে বিদ্যুতের দাম ৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, প্রথমত গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিটে ৩০ টাকা দেওয়ার মতো সক্ষমতা কোনো শিল্পের নেই। এ জন্য বর্ধিত দাম কমিয়ে ইউনিটপ্রতি সর্বোচ্চ ২৫ টাকা করা উচিত। আর অবশ্যই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ দিতে হবে। এর পরও সরকারের সহযোগিতা লাগবে। সোর্স ট্যাক্স ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করতে হবে। জুন পর্যন্ত শিল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত রাখতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই দাম বৃদ্ধি কার্যকর হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে কি সরকার বর্ধিত গ্যাস দিতে পারবে? যখন থেকে সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন হবে, তখন থেকে বর্ধিত দাম কার্যকর হওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে দিনে ১৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে (প্ল্যান্ট ফ্যাক্টর ৮৫ শতাংশ ধরে)। গত বুধবার দেওয়া হয় ৮৪ কোটি ঘনফুট। গ্রীষ্ফ্মে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় বিদ্যুতে গ্যাস সরবরাহ বেড়ে ১১০-১১৫ কোটি ঘনফুট হয়। এবার গ্রীষ্ফ্ম মৌসুমেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই পরিমাণ গ্যাস দেওয়া হতে পারে। সার উৎপাদনে গ্যাসের চাহিদা ৩১.৬ কোটি ঘনফুট, দেওয়া হচ্ছে ১৫ কোটি ঘনফুট। সিএনজি, বাসাবাড়ি, চা বাগান ও বাণিজ্যিক খাতে দৈনিক গ্যাসের সরবরাহ ৪৫-৫০ কোটি ঘনফুট। ক্যাপটিভে (শিল্পের নিজস্ব বিদ্যুৎ) উৎপাদনে বিদ্যুতের চাহিদা ১০ কোটি ঘনফুট। শিল্পের মোটামুটি চাহিদা মেটাতে দিনে ১২০ কোটি ঘনফুটের মতো গ্যাস লাগবে।

অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান স্পট মার্কেটের দামে এলএনজি আনার পর তা দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে বিক্রি করলে প্রতি ঘনমিটারের দাম পড়বে ১৫-১৬ টাকা। সরকার দাম বাড়িয়ে প্রতি ঘনমিটার করেছে ২১ দশমিক ৬৭ টাকা। ম. তামিমের মতে, দাম বাড়ানোর ফলে প্রতি ঘনমিটারে পেট্রোবাংলা ৫-৬ টাকা লাভ করবে। তাই যে হারে গ্যাসের দাম বাড়ানো হয়েছে, তা অযৌক্তিক।

বর্তমানে স্পট মার্কেটে প্রতি এমএমবিটিইউ (মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট) এলএনজির দাম ১৮-১৯ ডলার। পরিবহন খরচ ও ট্যাক্স-ভ্যাটসহ এই মূল্য দাঁড়ায় ২৩-২৫ ডলার। এমন দামে স্পট এলএনজি কেনা হলে বর্ধিত মূল্যে লোকসান হবে না বলে জানিয়েছেন জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেন, প্রতি ইউনিট এলএনজি আমদানিতে খরচ ২৫ ডলার পেরুলে বর্ধিত দামের পরও লোকসান হবে। তার আগে নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *