সিন্ডিকেট না ভাঙলে অভিবাসন ব্যয় কমবে না

মতামত

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ যে শুধু দুটো দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে, তা নয়। এটি বিশ্ব অর্থনীতিতেও বিভিন্ন রকম প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। করোনা মহামারির কারণে ধাক্কা খেয়েছিল আমাদের শ্রমবাজার। তবে কভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক অভিবাসন প্রবাহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে মোট ৬,১৭,২০৯ জন বাংলাদেশি কর্মী কাজের উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেছেন। ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত মোট ১০,২৯,০৫৪ জন বাংলাদেশি অভিবাসন করেন।

আগের ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালেও সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অভিবাসী গেছেন সৌদি আরবে। দেশটিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হিসেবে ধরা হয়। ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে কাজে যোগদান করেন ৫,৭৫,৫০৭ জন, যা মোট অভিবাসনের ৫৬ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অভিবাসন ঘটে ওমানে। উল্লেখযোগ্য গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর। পরবর্তী দেশগুলো হলো যথাক্রমে মালয়েশিয়া ও কাতার। নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রেও গন্তব্য দেশগুলোর মধ্যে গত বছর সৌদি আরবে নারী গেছেন সবচেয়ে বেশি।

বাংলাদেশের প্রায় সব জেলা থেকেই কমবেশি বিদেশে গেলেও কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নোয়াখালী, চাঁদপুর, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, ঢাকা ও নরসিংদীর অবস্থান শীর্ষে। সর্বাধিক সংখ্যক আন্তর্জাতিক অভিবাসন ঘটেছে কুমিল্লা থেকে, ৯.৬৬ শতাংশ। দ্বিতীয় বৃহত্তম অভিবাসনের উৎস এলাকা চট্টগ্রাম থেকে ৬.২০ শতাংশ অভিবাসন করেন। ৫.৭১ শতাংশ অভিবাসন করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে। নোয়াখালী, চাঁদপুর, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ থেকে যথাক্রমে ৪.৩১ শতাংশ, ৪.১১ শতাংশ, ৩.৭৫ শতাংশ ও ৩.৪৩ শতাংশ অভিবাসন করেন।

গত বছরও অদক্ষ কর্মীর পরিমাণ বেড়েছে। ২০২২ সালে অদক্ষ কর্মীর অভিবাসনের হার ছিল ৭৮.৬৪ শতাংশ, যা ২০২১ সালে ছিল ৭৫.২৪ শতাংশ। গত বছরও সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে সৌদি আরব থেকে, যা মোট রেমিট্যান্সের ১৮.৯৪ শতাংশ (৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে (৩.২ বিলিয়ন, ১৬.৭৭ শতাংশ)। এর পরের দেশগুলো যথাক্রমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য ও কুয়েত।

শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমাতে হবে। চার বছর বন্ধের পর ২০২২ সালে পুনরায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশি কর্মী গ্রহণ শুরু করেছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, এখানে সিন্ডিকেশন বন্ধ করা যায়নি। এসব সিন্ডিকেশন বন্ধ করা না গেলে অভিবাসন ব্যয় বেড়ে যাবে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ২০২২-এর শুরুতে এই সমঝোতা স্মারকটি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে দুই দেশের মাঝে আনুষ্ঠানিক আলোচনাও শুরু হয়। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী নিয়োগে যাতে কোনো সিন্ডিকেট সুযোগ না পায় বা অবৈধ লেনদেন না হয়- এ বিষয়ে উভয় সরকার আলোচনা করে। সিন্ডিকেটের প্রভাব মালয়েশিয়া শ্রমবাজার ও অভিবাসন ব্যয়ে যাতে না পড়ে, তার জন্য বাংলাদেশ ২৭৫ এজেন্টের তালিকা সরবরাহ করলেও মালয়েশিয়া সরকার শ্রমিক নিয়োগের জন্য শুধু ২৫টি সংস্থাকে নির্বাচিত করে।


প্রায় ছয় মাস দুই দেশের সরকারের মধ্যে ক্রমাগত চিঠি আদান-প্রদানের পর গত বছরের জুন মাসে বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদ এবং মালয়েশিয়ার মানবসম্পদমন্ত্রী এম সারাভানানের উপস্থিতিতে ঢাকায় দুই দেশের একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে মালয়েশিয়া সরকার তার পছন্দমতো এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নেবে- এ সিদ্ধান্তে পুনর্ব্যক্ত করে। সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে মালয়েশিয়া সরকার নতুন করে আরও ৫০টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর জন্য নির্বাচিত করে। দেশে দেড় হাজার বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি থাকা সত্ত্বেও সব মিলিয়ে মাত্র ৭৫টি এজেন্সি বর্তমানে কর্মী পাঠানোর অনুমতি পেয়েছে, যা নিয়ে বায়রার নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।

মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় আগের থেকে অভিবাসী কর্মীর চাহিদা বেড়েছে। ২০২২ সালে বোয়েসেল দক্ষিণ কোরিয়ায় ৫৫০০ দক্ষ অভিবাসী কর্মী পাঠিয়েছে, যা এই বছরের নারী অভিবাসনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিক। গত বছরের ১৭ জুলাই পর্যন্ত পোল্যান্ডে অভিবাসন করেছেন ১০৩ জন। পূর্ব এশিয়ার দেশ জাপানেও শিক্ষানবিশ কর্মী যাওয়া শুরু হয়েছে। পূর্ব ইউরোপে বাংলাদেশিদের নতুন শ্রমবাজার রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, মালদোবা যেখানে পুরুষ কর্মীর পাশাপাশি নারী কর্মীরও চাহিদা আছে। ইমারত নির্মাণ, জাহাজশিল্প, কৃষিকাজ, কলকারখানা, গার্মেন্টস, বেবি সিটিং ও রেস্তোরাঁয় কর্মী হিসেবে গত দুই বছরে সেখানে ১০ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মী গেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ট্রাফিকিং ইন পারসনস (টিআইপি) রিপোর্ট-২০২২ অনুসারে অভিবাসনের ব্যয় কিছুটা কমলেও বাংলাদেশিদের জন্য অভিবাসনের ব্যয় এখনও দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবে কর্মী যাওয়ার হার বাড়লেও কোনোমতে অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। সরকারের বেঁধে দেওয়া অভিবাসন ব্যয়ের দুই থেকে তিন গুণ টাকা দিতে হচ্ছে অভিবাসীদের। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় হওয়ার কারণে একজন শ্রমিকের বিদেশে যাওয়া খরচের টাকা তুলতেই অন্তত দুই থেকে আড়াই বছর পরিশ্রম করতে হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অংশের খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। তবে সরকার নির্ধারিত খরচের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা কর্মীদের খরচ করতে হচ্ছে। আড়াই লাখ থেকে শুরু করে চার লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার তথ্য রয়েছে একজন কর্মীর কাছ থেকে।

প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশফেরত কর্মীদের ঋণ বিতরণে নানা রকম চ্যালেঞ্জ আছে। বিদেশফেরত কর্মীদের জন্য গৃহীত ঋণ প্রকল্পগুলো লিঙ্গবান্ধব করা প্রয়োজন। বরাদ্দকৃত ঋণের অর্থ ছাড়ে নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে ব্যাংকটি। ঋণ সেবা, এজেন্ট ব্যাংকিং, বিদেশফেরত নারী কর্মীদের জন্য বিশেষ ঋণ প্যাকেজ তৈরি করা প্রয়োজন।

সৌদি আরব সরকার সেখানকার নারী গৃহকর্মীদের জন্য ভিশন ২০৩০-এর আওতায় আইন সংস্কার করেছে। নতুন আইন অনুযায়ী নারী গৃহকর্মীরা চাকরিদাতার অনুমতি ছাড়াই চাকরি পরিবর্তন করতে পারবেন। তা ছাড়া কর্মীর কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করতে চাইলে নিয়োগকর্তাকে অবশ্যই কর্মীর অনুমতি নিতে হবে। নিয়োগকর্তা যদি কর্মীর অনুমতি ছাড়া কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন করে এবং চাকরির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার আগে চাকরিচ্যুত বা চুক্তি বাতিল করে, তবে নিয়োগকর্তাকে শাস্তির আওতায় আনা হবে। এই আইনের আওতায় কর্মীকে সময়মতো বেতন-ভাতা না দিলে বা বিপজ্জনক কাজ করালে নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সুযোগ রয়েছে। সৌদি সরকারের এ উদ্যোগের সুফল সে দেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া আমাদের নাগরিকরা পাবেন। এটিকে একধাপ অগ্রগতি বলা যায়। এখন সময় এসেছে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার। এটা করতে পারলে তুলনামূলক কম খরচে কর্মীরা বিদেশে যেতে পারবেন এবং অল্পসময়ের মধ্যে খরচ তুলে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *