নজিরবিহীন অর্থনৈতিক সংকটে পাকিস্তান

আন্তর্জাতিক

ব্যাংকে ডলার নেই। দোকানে আটা নেই। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জ্বালানি নেই। কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চাকরি নেই। মূল্যস্ম্ফীতির কারণে মানুষের অতি প্রয়োজনীয় পণ্য কেনারও সামর্থ্য নেই।
এ চিত্র পাকিস্তানের। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ভয়াবহ বন্যায় বিপন্ন দেশটির জনগণ এখন নজিরবিহীন দুরবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। তাঁদেরই একজন করাচির দোকানদার ওমর সেলিম ক্ষোভ প্রকাশ করে দেশটির দুনিয়া টিভি নিউজকে বলছিলেন, ‘বিদ্যুৎ নেই, গ্যাস নেই, চাকরি নেই। মানুষ ময়দার জন্য ট্রাকের সামনে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করে। মূল্যস্ম্ফীতি যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। মনে হচ্ছে, আমরা প্রস্তরযুগে বাস করছি।’

দেশটির অর্থনীতি যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে। অর্থ সংকটে মন্ত্রী ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কমানোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে সরকার। দেশটির জিও টিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের বেতন ১৫ শতাংশ কমানো এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০ শতাংশ কমানো এবং মন্ত্রিপরিষদের সদস্য সংখ্যা ৩০ জনে নামিয়ে আনা হতে পারে। বর্তমানে দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদের সদস্য সংখ্যা ৭৮।
দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪.৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত ৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই রিজার্ভ দিয়ে তিন সপ্তাহের মতো আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। বৈদেশিক লেনদেনে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে। রপ্তানি এবং বিভিন্ন খাত থেকে যে আয় হচ্ছে, তা দিয়ে ব্যয় সংকুলান সম্ভব হচ্ছে না। এতে জ্বালানি তেল কেনা পাকিস্তানের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানিতে তারা অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। এই অতিনির্ভরশীলতাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণও জ্বালানি সংকট। গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। কারণ, জোগানে সংকট দেখা দিয়েছে। পাকিস্তানে আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করে এক-তৃতীয়াংশের বেশি বার্ষিক বিদ্যুৎ চাহিদা মেটায়। যুদ্ধের কারণে খরচ বেড়ে গেছে।
দ্য ডনের বিশ্নেষক এএএইচ সুমরোর মতে, সংকট থেকে উত্তরণে বহুমুখী অর্থনৈতিক সমাধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সংকল্প প্রয়োজন। পাকিস্তানে বারবার প্রয়োজনীয় সংস্কার বিলম্বিত হয়েছে। নীতিনির্ধারক, রাজনীতিবিদ এবং আমলারা তাঁদের স্বার্থ পূরণ করছেন। জনগণকে নিয়ে তাঁরা খেলছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক ফাইন্যান্সিয়াল পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক নেতাদের অযোগ্যতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামরিক নেতৃত্বের অতিমাত্রায় সম্পৃক্ততা এই অবস্থার সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তান সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ব্যাংকের ১০০ কোটি ডলারের ঋণ পরিশোধ করেছে। এর পরই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে এসেছে।
রেমিট্যান্সও কমেছে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার কারণে এ মাসে মূল্যস্ম্ফীতি ২৬.৬ শতাংশ হতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর জামিল আহমেদ গত সোমবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, মুদ্রাস্ম্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। এ বছর সরকার ২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে আশা করছে, তা চাপের মুখে পড়তে পারে।

গত ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানের রিজার্ভ ছিল ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। দিন গেলেই তা কমছে। খাদ্যসামগ্রী, কাঁচামাল এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রায় ৬০০০ কনটেইনার বন্দরে আটকা রয়েছে। ডলার সংকটে সেগুলো খালাস করা যাচ্ছে না। ফলে বিশ্বব্যাপী পণ্যের দাম কমার পরও দেশটিতে মুরগি, ডিম ও আটার দাম বেড়েছে। সরকার বিদেশি পণ্য আমদানি কমিয়ে দেওয়ায় ব্যাংকগুলো ঋণপত্র ইস্যু করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য এক প্রকার বন্ধ হওয়ার পথে।
মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্য ও জ্বালানির সংস্থানের জন্য লড়াই করছে। এখন পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পাওয়ার প্রত্যাশা করছে। তবে পাকিস্তানকে এখনই কোনো অর্থ দিতে নারাজ। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক অন্যান্য আর্থিক সংস্থা এবং সৌদি আরব, চীন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর দিকে চেয়ে আছে তারা।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে যে ক’টি দাতা সংস্থা এগিয়ে এসেছে তার মধ্যে রয়েছে বিশ্বব্যাংক, ইসলামিক উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও সৌদি আরব। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ফ্রান্সও এ সহায়তায় অংশ নেবে।
সম্প্রতি জেনেভায় অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পাকিস্তানে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো উন্নয়নে ৯০০ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে। এটা আসা শুরু হলে হয়তো কিছুটা উপকৃত হবে সংকটাপন্ন দেশটি।

এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পাকিস্তানে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি কিনতে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে দেশটি। ২০১৮ সালে জ্বালানি কেনায় ঋণ ছিল প্রায় ৭২০ কোটি ডলার। ২০২১ সালে এই ঋণ দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারে। আগামী তিন বছরে চক্রবৃদ্ধি হারে তা বেড়ে ২ হাজার ৬৩০ কোটি ডলারে গিয়ে ঠেকবে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে মানিয়ে চলতে পাকিস্তানকে ঋণের ব্যয় বাড়াতে হচ্ছে। আর এই ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে দাম হারাচ্ছে পাকিস্তানি রুপি। দেশটিতে প্রতি ডলারের মূল্য এখন ২৬০ থেকে ২৭০ রুপি। অথচ ২০২১ সালের মার্চে এক ডলারের দাম ছিল ১৭০ রুপি।

নিত্যপণ্যের সংকট দেখা দিয়েছে দেশটিতে। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে না পারলে ঘি ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেবে। জনগণ দুধ, চিনি, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে পারছে না। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে টেক্সটাইল শিল্পসহ কলকারখানা। চাকরি হারিয়েছেন হাজারো মানুষ।

সংকট সমাধানে আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে দেশটির সরকার। তবে আইএমএফ শর্ত দিয়েছে, পেট্রোলিয়াম ও বিদ্যুতের ওপর ভর্তুকি প্রত্যাহার করতে হবে। কিন্তু এই শর্ত মেনে নেওয়া পাকিস্তানের জন্য কঠিন হবে। বিশ্নেষকরা বলছেন, আইএমএফের দাবিগুলো সরকার পূরণ করলে তা প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের জন্য তা হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যা। এই সরকার ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। পাকিস্তানে চলতি বছরই নির্বাচন হওয়ার কথা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *