বঙ্গবন্ধু টানেলে ব্যয় বৃদ্ধির ধাক্কা টোলে

অর্থনীতি

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতুর চেয়ে বঙ্গবন্ধু টানেলে গড়ে আড়াইগুণ বেশি টোলের প্রস্তাব করে সেতু বিভাগ। সেটিই চূড়ান্ত করেছে অর্থ বিভাগ। এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশের পর তা কার্যকর হবে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই দফায় প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বেড়েছে। এ জন্য চীন থেকে নিতে হয়েছে বাড়তি ঋণ। এরই ধাক্কা টোলে ঠেকছে, যা সাধারণ মানুষের পকেট থেকেই সরকারকে তুলতে হবে।

প্রকল্প-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ১২ ধরনের যান চলাচলের অনুমতি দিয়ে টোল হার চূড়ান্ত করা হয়েছে। শাহ আমানত সেতুর কাছাকাছি টোল হার বিবেচনার ইচ্ছা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা থেকে সরে আসে অর্থ বিভাগ। কারণ চীনের ঋণের অর্থ টোল থেকেই ওঠাতে হবে। প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকার টানেল নির্মাণে ২ শতাংশ সুদে ৫ হাজার ৯১৩ কোটি টাকা অর্থায়ন করছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। বাকি ৪ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা দিচ্ছে সরকার। ২০১৫ সালে ৮ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প পাস হয়, মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের নভেম্বর। পরে ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রথম দফা সংশোধন করে ব্যয় ধরা হয় ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। বিশ্বব্যাপী ডলারের মূল্যবৃদ্ধির জেরে মেয়াদের সঙ্গে বর্তমানে এ প্রকল্পের ব্যয় আরও ৩১৫ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে।

সম্প্রতি চট্টগ্রামে এসে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বিষয়টি স্বীকার করে বলেছেন, ‘চীনের ঋণ, একই নদীর ওপর শাহ আমানত সেতু, দেশের প্রথম টানেল- এমন অনেক বিষয় মাথায় রেখে টোল হার চূড়ান্ত করেছে অর্থ বিভাগ। সেতু বিভাগ যে প্রস্তাবনা দিয়েছে, সেটিই চূড়ান্ত হয়েছে। টোল বেশির কারণে শুরুতে কিছুটা কম হলেও ধাপে ধাপে টানেলে গাড়ি চলাচল বাড়বে।’

টানেলের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশ ‘সি’তে বলা হয়েছে, চালুর পর বঙ্গবন্ধু টানেল দিয়ে ২০২৫ সালে দিনে গড়ে ২৮ হাজার ৩০৫টি যান চলাচল করবে। তবে ২০৩০ সালে তা বেড়ে গড়ে ৩৭ হাজার ৯৪৬ এবং ২০৬৭ সালে ১ লাখ ৬২ হাজার হবে। বঙ্গবন্ধু টানেল দিয়ে চলাচলে চূড়ান্ত প্রস্তাবনায় চার এক্সেলের ট্রেইলরে সর্বোচ্চ টোল ধরা হয়েছে ১ হাজার টাকা। প্রাইভেটকারের জন্য সর্বনিম্ন টোল ২০০ টাকা। দেশের প্রথম এ টানেলে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, থ্রি-হুইলার চলাচল করতে পারবে না।

সূত্র জানায়, কর্ণফুলী নদীর ওপর ২০১০ সালে ৪৯০ কোটি টাকায় নির্মিত হয় তৃতীয় কর্ণফুলী বা শাহ আমানত সেতু। সেতুটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে হওয়ায় দক্ষিণ চট্টগ্রামে যোগাযোগ অনেক সহজ হয়েছে। এটি টানেলের চেয়ে তুলনামূলক বেশি প্রশস্ত। অর্থ বিভাগে পাঠানো টানেলের টোল প্রস্তাবনার সঙ্গে শাহ আমানত সেতুর টোলও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, সেতুতে প্রাইভেটকার ও জিপকে ৭৫ টাকা দিতে হয়। টানেলে তাদের গুনতে হবে ২০০ টাকা, যা সেতুর টোলের চেয়ে প্রায় আড়াইগুণ। শাহ আমানত সেতুতে পিকআপের জন্য ১৩০ টাকা হলেও টানেলে ২০০, একইভাবে মাইক্রোবাসের জন্য সেতুতে ১০০ হলেও টানেলে ২৫০ টাকা, ৩১ আসনের কম ধারণক্ষমতার বাসকে ৫০ টাকার জায়গায় ৩০০ টাকা ও ৩২ আসনের বেশি ধারণক্ষমতার বাসকে ১৫৫ টাকার জায়গায় ৪০০ টাকা দিয়ে টানেলে চলাচল করতে হবে। ভারী যানবাহনের টোলও তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে টানেলে। ৫ টন ধারণক্ষমতার ট্রাক সেতুতে ১৩০ টাকা দিলেও টানেলে লাগবে ৪০০ টাকা। একইভাবে ৫ থেকে ৮ টনের ট্রাক সেতুতে ২০০ টাকা দিলেও টানেলে ৫০০ টাকা, ৮ থেকে ১১ টনের ট্রাক সেতুতে ৩০০ টাকা দিলেও টানেলে ৬০০, ৩ এক্সেল পর্যন্ত ট্রাক টানেলে ৮০০ টাকা, ৪ এক্সেল পর্যন্ত ট্রেইলারকে সেতুতে ৭৫০ টাকা দিতে হলেও টানেলে ১ হাজার টাকা দিতে হবে। এ ছাড়া গাড়ির এক্সেল বাড়লে প্রতি এক্সেলের জন্য অতিরিক্ত ২০০ টাকা টোল নির্ধারণ করা হয়েছে।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী সুভাষ বড়ূয়া বলেন, ‘কর্ণফুলী নদীর ওপর সেতুটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে। বঙ্গবন্ধু টানেল পড়েছে এক প্রান্তে। সেতুর টোল অনেক কম হওয়ায় চালক ও পরিবহন মালিকরা টানেল কতটা ব্যবহার করবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।’ সুজন চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মু. সিকান্দার খান বলেন, ‘ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে সরকারের কিছুই করার থাকে না। প্রকল্পের খরচ কমলে টোলও কম হতো। সেটি সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধু টানেলের টোলে চীনের ঋণ বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে।’

বঙ্গবন্ধু টানেলের প্রকল্প পরিচালক হারুনুর রশিদ চৌধুরী জানান, এখন শেষ মুহূর্তের নির্মাণকাজ চলছে। প্রায় ৯৬ শতাংশ কাজ হয়েছে। টোল হারও চূড়ান্ত। ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ কিংবা মার্চের শুরুতে যান চলাচলে টানেলটি খুলে দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *