বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন-ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের কর ফাঁকি ৩১ কোটি টাকা

অর্থনীতি ব্রেকিং নিউজ

সুদ পরিশোধের সময় উৎসে কর কাটার বিধান থাকলেও তা করেনি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। এর মাধ্যমে ৩১ কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়েছে ব্যাংকটি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে ধরা পড়েছে কর ফাঁকির চাঞ্চল্যকর এই ঘটনা। বাংলাদেশে অনেক দিন থেকেই কাজ করছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান গত পাঁচ বছরের (২০১৭-২০২১) বৈদেশিক মুদ্রায় ধার করেছে ৬ হাজার ৩৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ৫৮ মিলিয়ন ইউরো। এর মধ্যে ঋণের মূলসহ সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ৫ হাজার ৩১ মিলিয়ন ডলার এবং ৭ মিলিয়ন ইউরো। শুধু সুদ পরিশোধ হয়েছে প্রায় ১৯ মিলিয়ন ডলার। যা বাংলাদেশি টাকায় ১৫৫ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এখান থেকেই ২০ শতাংশ হারে উৎসে কর দেওয়ার কথা। যা টাকার অঙ্কে দাঁড়ায় ৩১ কোটি ১১ লাখ ৫৫ হাজার, কিন্তু ব্যাংকটি এক টাকাও দেয়নি।

বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে ধরা পড়ে। এরপর গত ২০ ডিসেম্বর ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার বরাবর একটি চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। চিঠিতে বলা হয়, উৎসে কর বাবদ পাওনা টাকা দ্রুত সরকারের কোষাগারে জমা দিয়ে তার প্রমাণসহ বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করতে হবে। আর ভবিষ্যতে এ ধরনের ব্যত্যয় রোধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের কান্ট্রি ম্যানেজার মো. কামরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘উৎসে কর পরিশোধের চিঠি পেয়েছি। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা চলছে। এভাবে উৎসে কর চাইলে কীভাবে ব্যবসা করব। আমরা তো নানাভাবে দিচ্ছি। এমন সংকটেও ডলার সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছি। চারদিক থেকে চেপে ধরলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। এ ছাড়া অন্য বিদেশি ব্যাংকও এভাবে করছে। তাদের ক্ষেত্রে চিঠি ইস্যু করা হয়নি। তাহলে শুধু আমরা কেন?

তিনি আরও বলেন, ব্যাংকটাকে একটা অবস্থানে নিয়ে যেতে অনেক চেষ্টা করে যাচ্ছি। এখন যদি সবার সহযোগিতা না পাই তাহলে কীভাবে হবে। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে কথা বলেছি। এনবিআরের সঙ্গেও কথা বলব।

প্রসঙ্গত, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪-এর ৫৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যদি অনিবাসী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নিবাসী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বৈদেশিক মুদ্রা ধার করে। নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে সুদ পরিশোধের সময় ২০ শতাংশ হারে উৎসে কর কর্তন করে তা সরকারের কোষাগারে জমা দিতে হয়।

এদিকে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের আর্থিক বিভিন্ন সূচকের পরিস্থিতিও ভালো যাচ্ছে না। ব্যাংকটির বিতরণ করা ঋণের বেশির ভাগই ইতোমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশি খাতের ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ঋণ বিতরণ করেছে ১৩৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৩৫৪ কোটি টাকা খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। যা বিতরণ করা ঋণের ৯৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। পুরোটাই মন্দমানের খেলাপি। যা আদায়ের আশা খুবই ক্ষীণ।

খাতসংশ্লিষ্ট এবং ব্যাংকাররা বলছেন, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানে ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। ফলে বাংলাদেশে এই একটি মাত্র ব্যাংক, যার খেলাপি শত শতাংশের কাছাকাছি। দীর্ঘদিন এভাবে চলছে ব্যাংকটি। উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন নেই। আর্থিকভাবে দুর্বলতার কারণে এখন ধার-দেনা করে দিন পার করছে পাকিস্তানের এই ব্যাংকটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৭ সালে ১৩৩১ মিলিয়ন ডলার, ২০১৮ সালে ১৯৮৮ মিলিয়ন, ২০১৯ সালে প্রায় ৮৬০ মিলিয়ন, ২০২০ সালে ১১৮১ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২১ সালে ১ হাজার ৩২ মিলিয়ন ডলার ধার করেছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান। শুধু তাই নয়, ২০২০ সালে ১৬ মিলিয়ন ইউরো এবং ২০২১ সালে আরও ৪২ মিলিয়ন ইউরো ধার করেছে ব্যাংকটি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *