নতুন জঙ্গি প্ল্যাটফর্ম-বাড়ি বিক্রি ও পেনশনের পুরো টাকা জঙ্গি সংগঠনে ‘দান’

বাংলাদেশ

নতুনভাবে চাঞ্চল্য তৈরি করা জঙ্গিদের নয়া প্ল্যাটফর্ম জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়ার আর্থিক উৎস নিয়ে অনুসন্ধান চলছে। কীভাবে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংগঠনটিকে গুছিয়ে পাহাড়ে সামরিক কায়দায় প্রশিক্ষণ নিলেন তাঁরা? এত অস্ত্র কেনার অর্থ তাঁরা কোন উৎস থেকে পেলেন? অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, প্রাথমিকভাবে নতুন জঙ্গি সংগঠনকে সক্রিয় করতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখেন আনিছুর রহমান মাহমুদ। তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। নিজের বাড়ি বিক্রির ১৮ লাখ টাকা এই সংগঠনে ‘দান’ করেছেন তিনি। এ ছাড়া তাঁর মালিকানাধীন গরু ও মাছের খামার ছিল। ওই খামার থেকে লাভের অর্থ জঙ্গি ফান্ডে নিয়মিত দিতেন তিনি। র‌্যাব বলছে, জঙ্গিদের কাছে ‘দানবীর’ হিসেবে পরিচিত পলাতক মাহমুদই নতুন জঙ্গি সংগঠনের আমির। তিনি ছাড়া আরও কয়েকজন এই সংগঠনকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাঁর মধ্যে অন্যতম হলেন সিলেটের মাসুকুর রহমান মাসুদ ওরফে রনবীর। এক সময় রনবীর পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন। পরে মানসিক ভারসাম্যহীন সেজে সরকারি চাকরি ছাড়েন তিনি। তবে পেনশন বাবদ পাওয়া ৫ লাখ টাকার মতো তিনি সংগঠনে দিয়েছেন। এ ছাড়া তাঁর মালিকানাধীন একটি গাড়িও ছিল। সেটি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ নতুন জঙ্গি সংগঠনে দেন রনবীর।

জঙ্গিদের কর্মকাণ্ডের ওপর তথ্য রাখেন এমন একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, কুমিল্লায় মাহমুদ পড়াশোনা করেছেন মাদ্রাসায়।

এরপর ওই ইসলামিক ধারায় উচ্চশিক্ষা নেন। ২০১৩ সালে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশে (হুজিবি) যোগ দেন তিনি। আনিছুরের বাবার নাম মোখলেছুর রহমান। আর মায়ের নাম রুফিয়া খাতুন। তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা সদর দক্ষিণের প্রতাপপুরে। সংগঠনের আরেক সদস্য মোশাররফ হোসেন রাকিবের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় রনবীরে। ধীরে ধীরে রনবীরের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। মাহমুদ দুটি বিয়ে করেছেন। দ্বিতীয় স্ত্রী নূরকে নিয়ে নাইক্ষ্যংছড়িতে বসবাস করতেন মাহমুদ। সেখানে নিজে জমিও কিনেছেন। আর প্রথম স্ত্রী থাকেন কুমিল্লায়। সংগঠনে তাঁর অবদান ও নেতৃত্বগুণ বিবেচনা করেই তাঁকে নতুন সংগঠনের আমির হিসেবে মনোনীত করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে পার্বত্য এলাকায় তাঁরা ‘ইসলামিক ভিলেজ’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। যেখানে সবকিছু পরিচালিত হবে তাঁদের ভাষায় ইসলামিক শরিয়াহ মোতাবেক। তবে সেই পরিকল্পনা তাঁরা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে অর্ধশতাধিক তরুণকে কথিত হিজরতের উদ্দেশে ঘর ছাড়তে বাধ্য করে গহিন পাহাড়ে প্রশিক্ষণ করাতে পেরেছেন। নতুন জঙ্গি সংগঠনের বিভিন্ন পরিকল্পনা বৈঠক কুমিল্লায় মাহমুদের খামারে হতো। সেখানে শূরা সদস্যরা উপস্থিত থাকতেন। এ ছাড়া কুমিল্লা আরেকটি স্থানেও নতুন জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা বৈঠক করেছিলেন। ছন্দু হোটেলে ওই বৈঠকে জনি ও মাইনুল ইসলাম রক্সি ছিলেন।

আরেকটি নির্ভরশীল সূত্র জানায়, নতুন জঙ্গি সংগঠনের সামরিক কমান্ডার রনবীরের সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথমে পরিচয় হয় মোশাররফ হোসেন রাকিবের। তিনি সংগঠনের অর্থ শাখা দেখভাল করেন। রাকিবের গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। কোনো বিপদে-আপদে পড়ে কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহযোগিতা চাইলে রাকিব সহযোগিতার হাত বাড়াতেন। ফেসবুকে যোগাযোগ করতেন। এভাবে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় রনবীরের। পোস্ট অফিসে চাকরি করার সময় ডাকাতিতে জড়ান তিনি। ২০০৭ সালে একবার ডাকাতি করার সময় হাতেনাতে গ্রেপ্তার হন। প্রায় দুই বছর কারাগারে ছিলেন। এরপর জামিনে বেরিয়ে আসেন। কারাগারে থাকার সয়ম তাঁর সঙ্গে জঙ্গিদের পরিচয় হয়। আর চমকপ্রদ তথ্য হলো- পাগল সেজে পোস্ট অফিসের চাকরি থেকে অবসর নিয়ে পুরোপুরি জঙ্গিবাদে জড়ান তিনি।

গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, নতুন জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট আরও কয়েকজনের ব্যাপারে বিশদ অনুসন্ধান চলছে। তাঁদের মধ্যে ডা. আবু ইউসুফ একজন। তিনি নওমুসলিম নিয়ে কক্সবাজারে কাজ করেন। এ ছাড়া কুমিল্লার আরেক ব্যবসায়ী রয়েছেন। জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের কাছে তিনি ‘রহস্যময়’ হুজুর। বয়স আনুমানিক ৫০ বছর। নতুন জঙ্গি সংগঠন ছন্দু হোটেলে যে বৈঠক করেছেন সেখানে তিনি উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ফেনীর একজন বস্ত্র ব্যবসায়ীর বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। ‘শিফা সেন্টার’ নামে তাঁর একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

২০১৯ সালে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি) ও আনসার আল ইসলামের বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকস্ফীয়া গঠন করেন। এরপর পাহাড়ি সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সঙ্গে প্রশিক্ষণের ব্যাপারে চুক্তি করে নতুন জঙ্গি সংগঠন। চুক্তি অনুযায়ী রুমার গহিন বনাঞ্চলে কেএনএফের ট্রেনিং ক্যাম্পে উগ্রপন্থিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে আনসার আল ইসলামের কাছ থেকে অর্থ সহায়তা পেত নতুন জঙ্গি সংগঠন। ডা. শাকের ও কৃষিবিদ মহসিন এই সংগঠনে অর্থ দিয়েছেন। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সমর্থকরা সংগঠনের জন্য অর্থ পাঠাতেন। এসব দেখভাল করতেন মোশাররফ হোসেন রাকিব। এ ছাড়া উগ্রপন্থিদের নতুন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আলী আহসান ওসামা, আবু সাঈদ, সাগর বিন ইমদাদ, আমির হামজার সংশ্নিষ্টতার বিষয়গুলো আরও গভীরভাবে তদন্ত চলছে। শূরা সদস্য আবদুল্লাহ মাইমুন দাওয়াতি শাখার প্রধান, মারুফ আহমেদ সামরিক শাখার সেকেন্ড ইন কমান্ড, শামীম মাহফুজ প্রধান উপদেষ্টা ও প্রশিক্ষণের সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক এবং ভোলার শায়েখ আলেম বিভাগের প্রধান হিসেবে সংগঠনটিতে দায়িত্ব পালন করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *