৬ বছরে এসেছে ৬৬৪ নারী প্রবাসী কর্মীর লাশ, মৃত্যুর কারণ নিয়ে স্বজনদের সন্দেহ

বাংলাদেশ

বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিক কাজের খোঁজে বিভিন্ন দেশে যান। ১৯৯১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১ কোটি ২৬ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬১ অভিবাসী কর্মীকে বিদেশে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ৪৫৬ জন নারী। গত পাঁচ বছরে ৪ লাখ ৩০ হাজার ৪৫৩ নারী অভিবাসী কর্মী বিদেশে গেছেন। অভিবাসনে বিপুলসংখ্যক নারী কর্মীর অংশগ্রহণ সত্ত্বেও; গন্তব্য দেশগুলোতে তাদের মৃত্যুর বিষয়টি প্রায়শই তেমন আলোচিত হয় না।

২০১৭ থেকে ২০২২ পর্যন্ত বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে ৬৬৪ নারী অভিবাসীর লাশ ফিরিয়ে এনেছে। শুধু ২০১৯ সালেই ১২৯ নারী অভিবাসী শ্রমিকের মৃতদেহ দেশে এসেছে। তাঁদের মধ্যে ২৪ জন আত্মহত্যা করেছেন।

এই তথ্যটিই উদ্বাস্তু ও অভিবাসী আন্দোলন গবেষণা ইউনিটকে (রামরু) এ সম্পর্কিত গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করেছে। এ বিষয়ে রামরু গন্তব্য দেশে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুর বিষয়ে একটি সমীক্ষা করেছে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংসদ সদস্য ক্লাবে মঙ্গলবার (৩১ জানুয়ারি) ‘গন্তব্য দেশগুলোতে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু’ বিষয়ক একটি প্রচার কর্মশালার আয়োজন করে রামরু।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ডক্টর কামাল উদ্দিন আহমেদ, প্রধান অতিথি ছিলেন রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারপারসন ড. তাসনীম সিদ্দিকী।

ড. তাসনীম সিদ্দিকী গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, মৃত নারী অভিবাসী কর্মীদের ৬৯ শতাংশের মৃত্যু স্বাভাবিক। তবে সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ২৪ শতাংশ মৃত্যুর কারণ আত্মহত্যা।

গবেষণায় দেখা গেছে, অস্বাভাবিক মৃত্যু শুধু শ্রম গ্রহীতা দেশগুলোতে রেকর্ড করা হয়। কিন্তু অভিবাসী শ্রমিক নেয় না এমন এশীয় এবং উন্নত পশ্চিমা দেশগুলোতে অস্বাভাবিক মৃত্যুর কোনো খবর নেই।

সরেজমিনে কথা বলে গবেষকেরা দেখেছেন, অভিবাসী পরিবারগুলো মৃত অভিবাসীর অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন। ৫৬ শতাংশ মৃত্যুর পাঁচ দিনের মধ্যে পরিবারের সদস্যরা মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে।

এই গবেষণায় অংশ নেওয়া পরিবারের সদস্যদের ৪৮ শতাংশ বলেছেন, মৃত্যুসনদে উল্লেখিত মৃত্যুর কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন না।

ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ড. তাসনীম সিদ্দিকী বলেন, মৃতদেহ গ্রহণ করাও একটা ঝক্কির কাজ। কীভাবে প্রক্রিয়াগুলো সম্পন্ন করতে হবে পরিবারের সদস্যদের সে ব্যাপারে খুব কমই ধারণা থাকে।

মৃতদেহ কার কাছ থেকে গ্রহণ করতে হবে সে ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য থাকে না। অস্থায়ী ব্যবস্থাপনায় মৃতদেহগুলো রাখা হয়। নথিপত্র ও প্রত্যয়নপত্র বিভিন্ন জায়গায় দেখাতে হয়। একটি যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পরিবারগুলোর বেশ পরিশ্রম করতে হয়।

অনুষ্ঠানে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ, ‘এ ধরনের গবেষণা প্রশংসনীয়। কারণ এ কাজের মাধ্যমে দুর্বল অভিবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার স্বীকৃতি পেয়েছে। এই গবেষণাটি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সকল নারীর লাশ আসার পর সেটি পুনঃতদন্তের প্রয়োজন রয়েছে। তাদের নিরাপত্তা দেওয়া আমাদের দরকার। এ জন্য সরকার ও অন্যান্য দায়িত্বশীল লোকদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তবেই আমরা তাদের জন্য কিছু করতে পারব।’

আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে অভিবাসন বিষয়ক সংসদীয় ককাসের চেয়ারম্যান সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, ‘গবেষণাটি খুবই সময়োপযোগী উদ্যোগ। এ সময় আমাদের এজেন্সিগুলোকে চাপ দিতে হবে তারা যেন গন্তব্য দেশগুলো থেকে মৃত্যুর কারণ বের করার চেষ্টা করে। পাশাপাশি আমাদের বিমানবন্দরে একজন মহিলা পুলিশ কর্মকর্তা বা ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। যে নারীর অভিবাসন কর্মীর লাশ আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রাথমিক পোস্টমর্টেম করে দেখবে এটি স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি অস্বাভাবিক মৃত্যু। এ ছাড়া কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য বিদেশে নারীদের সাপ্তাহিক যোগাযোগের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাহলে নারীরা কিছুটা হলেও নিরাপদ অবস্থানে থাকতে পারবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *