দুর্নীতি দমন কমিশনে বেড়েছে জনবল-কাজের সূচক তলানিতে

বাংলাদেশ

দুর্নীতিবাজদের দমনে দেশের একমাত্র সংবিধিবদ্ধ সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাজের বেশিরভাগ সূচকই নিম্নগামী। কয়েক দফায় প্রতিষ্ঠানটির জনবল বাড়লেও কাজের ধার বাড়েনি। উলটো প্রভাবশালীদের কাছে অনেকটা অসহায় দুদক কর্মকর্তারা।

গত তিন বছরে উল্লেখ করার মতো কেনো রাঘববোয়াল জালে তুলতে পারেনি সংস্থাটি। উলটো জাল কেটে বেরিয়ে গেছে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা দেড় হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। অনুসন্ধান শেষে তাদের দায়মুক্তি বা ‘ক্লিনচিট’ দেওয়া হয়েছে। এদের কারও কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তথ্যপ্রমাণ ছিল বলে জানা গেছে। এরপরও নানা প্রভাবে দায়মুক্তি দিয়ে তাদের শরীর থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে দুর্নীতিবাজের তকমা।

এদিকে, গত পাঁচ বছরে দুদকে জমা অভিযোগের সংখ্যা ক্রমশই বেড়েছে (করোনাকালীন দুই বছরে অভিযোগ জমার হার একটু কমে ছিল)। বিপরীতে এসবের অনুসন্ধান, মামলা ও চার্জশিটের সংখ্যা কমেছে। গত ৫ বছরে মামলার সূচকে উঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। সম্পদ সংক্রান্ত অনুসন্ধান কার্যক্রমের পরিসংখ্যানেও দেখা গেছে নিম্নগতি।

ফাঁদ মামলার সংখ্যা কমে তলানিতে ঠেকেছে। পাঁচ বছরে দুদকের দায়ের করা শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ মামলার আসামি খালাস পেয়েছে। তিন বছরে প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দায়মুক্তি বা ক্লিনচিট পেয়েছে। এদের অধিকাংশই প্রভাবশালী। দুদকের কাজের প্রায় সব ধরনের সূচক তলানিতে ঠেকায় সংস্থাটির গতি-প্রকৃতি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ ও যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে এসব তথ্য।

জানতে চাইলে দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন যুগান্তরকে বলেন, ‘করোনার কারণে দুই বছর আমাদের স্বাভাবিক কাজ ব্যাহত হয়েছে। তখন দুদক অফিস বন্ধ না থাকলেও কাজ পুরোদমে চলেনি। যার প্রভাব বার্ষিক পরিসংখ্যানে পড়েছে। তবে কাজের সূচক প্রতিবছর ধারাবাহিকভাবে একই রকম থাকবে সেটাও ঠিক নয়। আর যে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে সুফল পেতে আরও সময় লাগবে।’ দেড় হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়মুক্তির নথি হাইকোর্টের তলব সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কমিশন এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। এ সংক্রান্ত আপডেট কোনো তথ্য আমার কাছে নেই।’

তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, ‘অনেক সময় প্রভাবের কারণে দুদকের কাজের গতি কমে। তবে যেহেতু প্রশাসন ও আমলাতন্ত্রের মধ্যে দুর্নীতির প্রবণতা বেশি সেহেতু তাদের রক্ষার চেষ্টা দুদকের ভেতরে রয়েছে কিনা-তাও ভাবনার বিষয়। এমনিতেই দুদকের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আমলাতন্ত্রের হাতেই বেশি। তাই অনেক সময় অভিযোগ পাওয়ার পরও দুদক তা এড়িয়ে যায় কিনা-সে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক।’

দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে অভিযোগ জমা পড়ে ১৬ হাজার ৬০৬টি। এরমধ্যে পর্যবেক্ষণ ও যাচাই-বাছাই শেষে অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয় ১২৬৫টি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে ব্যবস্থা নিতে পাঠানো হয় ১ হাজার ৪০৪টি। ২০১৯ সালে জমা ২১ হাজার ৩৭১টি অভিযোগের মধ্যে অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয় মাত্র ১ হাজার ৭১০টি। ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় ৩ হাজার ৬২৭টি।

২০২০ সালে জমা পড়ে ১৮ হাজার ৪৮৯টি। এরমধ্যে অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয় মাত্র ৮২২টি। আর ২ হাজার ৪৬৯টি অভিযোগের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দায় মেটায় দুদক। জমা বাকি ১৫ হাজার ১৯৮টি অভিযোগ চলে যায় বাতিলের খাতায়। ২০২১ সালে (করোনা মহামারির বছর) জমা ১৪ হাজার ৭৮৯টি অভিযোগ থেকে অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয় মাত্র ৫৩৩টি। আর ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় ২ হাজার ৮৮৯টি।

২০২২ সালে জমা পড়া অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৩৩৮টিতে। এগুলো থেকে অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করা হয় ৯০১টি। আর বাকি ৩ হাজার ১৫২টি অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করে দুদক। গত ৫ বছরের প্রাপ্ত অভিযোগ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালে সর্বাধিক সংখ্যক অভিযোগ জমা পড়ে। এই বছরই সর্বোচ্চ সংখ্যক অভিযোগের অুনসন্ধান নিজেরা না করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থায় পাঠিয়ে কাজ শেষ করে কমিশন।

এদিকে গত ৫ বছরে মামলার সূচকে উঠানামা লক্ষ্য করা গেছে। ২০১৮ সালে ২৭৩টি, ২০১৯ সালে ৩৬৩টি, ২০২০ সালে ৩৪৮টি ও ২০২১ সালে মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৩৪৭টিতে। আর গেল বছর অভিযোগ জমার সংখ্যা, অনুসন্ধান ও মামলা সবই বেড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পুঞ্জীভূত আকারে ২০২২ সাল পর্যন্ত দুদকের হাতে মোট অনুসন্ধান ফাইল ছিল ৪ হাজার ৪০৩টি। একই সালে কমিশন ১ হাজার ১১৯টি অনুসন্ধান নিষ্পত্তি করেছে। নিষ্পত্তি হওয়া এসব অভিযোগের মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৪০৬টি। বাকি অভিযোগগুলোর অসুসন্ধান কাজ পরিসমাপ্তির (নথিভুক্ত) মাধ্যমে বা অন্যান্যভাবে (বিভাগীয় ও দাপ্তরিক ব্যবস্থা নিতে প্রেরণ) নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে বার্ষিক প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্পদ সংক্রান্ত অনুসন্ধান কার্যক্রমের পরিসংখ্যানেও দেখা গেছে নিম্নগতি। ২০২১ সালে এ সংক্রান্ত অনুসন্ধানের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৭৯৬টি। এরমধ্যে ৪১৮টি অনুসন্ধান সম্পন্ন করা হয়। অনুসন্ধান শেষে মামলা করা হয় ১৫৭টি। পরিসমাপ্তির (নথিভুক্ত) মাধ্যমে ২১১টি এবং অন্যান্য ভাবে (বিভাগীয় ও দাপ্তরিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ) আরও ৫০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে মামলা ছাড়া সব সূচকই নেতিবাচক।

গেল বছর সম্পদসংক্রান্ত অনুসন্ধানের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫৭১টি। এরমধ্যে ৩৯৫টি অনুসন্ধান কাজ শেষে মামলা হয়েছে ১৭২টি। এছাড়া পরিসমাপ্তির মাধ্যমে ২১৩টি এবং ২৪টি অভিযোগ অন্যান্যভাবে নিষ্পত্তি করা হয়।

গত পাঁচ বছরে মামলার বিপরীতে চার্জশিট অনুমোদনের পরিসংখ্যানও নিম্নমুখী। দুই বছর চার্জশিটের সংখ্যা সামান্য বাড়লেও তিন বছরই কমেছে। ২০১৮ সালে ২৩৬টি, ২০১৯ সালে ২৬৭টি, ২০২০ সালে ২২৮টি, ২০২১ সালে ২৬০টি এবং ২০২২ সালে ২২৪টি চার্জশিট অনুমোদন দিয়েছে কমিশন।

জানা গেছে, এক সময় ফাঁদ পেতে দুর্নীতিবাজ ও ঘুসখোর সরকারি কর্মকর্তাদের ধরতে দুদকের পদক্ষেপটি বেশ আলোচিত ছিল। গত পাঁচ বছরের ব্যবধানে ফাঁদ মামলার সংখ্যা কমে তলানিতে ঠেকেছে। ২০১৮ সালে এ সংক্রান্ত ১৫টি, ২০১৯ সালে ১৬টি, ২০২০ সালে ১৮টি, ২০২১ সালে ৬টি ও ২০২২ সালে মাত্র ৪টি মামলা করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দুদকের দায়ের করা শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ মামলার আসামি খালাস পেয়েছে। সাজা পেয়েছে শতকরা ৬০ ভাগ মামলার আসামি। এক্ষেত্রে বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর চেয়ে এগিয়ে আছে কমিশন। ব্যুরোর মামলার সাজার হার শতকরা ৩০ থেকে ৫০ ভাগের মধ্যে ছিল।

দুদকের কাজের এই নিম্নগতির কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। তারা বলেছেন, নামে স্বাধীন সংস্থা হলেও কার্যত পরাধীন দুদক কর্মকর্তারা। দুদকের ওপর বিরাগভাজন হতে পারে এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর (প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, পুলিশ, প্রশাসন, বিচার বিভাগ) বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ জমাই দিতে পারেন না। আবার গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশিত খবর আমলে নিয়ে নিজ উদ্যোগে অভিযোগ ফাইল করার কাজে কমিশন আগ্রহী না হওয়ায় অনুসন্ধানের সংখ্যা কমছে।

এছাড়া অভিযোগ আমলে নিতে যাচাই-বাছাই কমিটির অদক্ষতা ও অনীহাকেও কারণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও তদবির বাণিজ্যের বাইরে রাখতে পারলেই শুধু দুদককে শক্তিশালী ও কার্যকর করা সম্ভব। এছাড়াও গত ৫ বছরের জমা পড়া অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত করলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, তদবির ও রাজনৈতিক প্রভাবেই প্রতিবছর অসংখ্য অভিযোগ নথিভুক্ত হয়। অভিযোগের সত্যতা থাকার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন না দিয়ে ক্লিনচিট দেওয়া হয়। গত তিন বছরে এ ধরনের প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান দায়মুক্তি বা ক্লিনচিট পেয়েছে। এদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, সরকারদলীয় সংসদ-সদস্য, মেয়র, সচিব, পুলিশ, ব্যাংক কর্মকর্তা, ওয়াসা, রাজউক, গণপূর্ত, বাপেক্স, তিতাসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন।

এদের বেশিরভাগই প্রভাবের কারণে দায়মুক্তি পেয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। এদের অনেকের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে তথ্য-উপাত্তসহ প্রতিবেদন প্রচার-প্রকাশ হয়েছে। এরপরও অনুসন্ধানে সত্যতা খুঁজে পায়নি দুদক। তবে এদের কিভাবে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে তা জানতে এরইমধ্যে নথি তলব করেছেন হাইকোর্ট।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুদকের সেগুনবাগিচার প্রধান কার্যালয়ে বর্তমানে কর্মরত ৫৮৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এখানে শূন্য পদ আছে ৬১৫টি। বিভাগীয় কার্যালয়ে কর্মরত আছেন ৭৯ জন। পদ খালি ৪১টি। সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে কর্মরত আছেন ৫১২ জন। পদ খালি আছে ৩১৬টি। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে দুদকের সব অফিস মিলিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ১ হাজার ১৭৪ জন। দুই বছর আগেও এই সংখ্যা অর্ধেকের কিছু বেশি ছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *