চো’ গেল পাখীরে

আড্ডা

কল্লোল যুগটা হয়ে উঠেছিল লেখকদের মিলনমেলা। কত ধরনের লেখক স্রোতের মতো বেরিয়ে এল, তার হিসাব রাখবে কে? সেই তাঁদের মধ্যেই ছিলেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। আরও কারও কারও মতো শৈলজানন্দও নাম লিখিয়েছিলেন সিনেমায়। প্রেমেন্দ্র মিত্র, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়দের মতো তিনিও হয়ে উঠলেন পরিচালক, চিত্রনাট্যকার।

শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় চেয়েছিলেন তাঁর সব সিনেমার মিউজিক ডিরেক্টর হবেন নজরুল। কিন্তু নজরুল তখন এইচএমভি গ্রামোফোন কোম্পানির ট্রেনার এবং গীতিকার। ব্যস্ততার শেষ নেই। আর শৈলজানন্দকেও তো সিনেমা করার জন্য টাকা দেন ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। তাঁরাই ঠিক করে দেন কে হবেন গীতিকার, কে হবেন সুরকার। সিনেমার গান লেখাও খুব সহজ কাজ নয়। সিচুয়েশনের সঙ্গে পরিচিত হয়ে নায়ক-নায়িকার অভিব্যক্তি বোঝানো, আবহসংগীত কেমন হবে, তা নিয়ে ভাবা ইত্যাদি যে ব্যাপারগুলো আছে, সেগুলো করার জন্য নজরুলের সময় কই?

তারপরও একদিন শৈলজা গেছেন এইচএমভিতে নজরুলের কাছে। সে সময়ের খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীরা ছিলেন নজরুলকে ঘিরে। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তরুণ শচীন দেববর্মনও। সদ্য গানের দুনিয়ায় তখন তিনি ঢুকেছেন। নজরুলের গানে আর সুরে মুগ্ধ ছিলেন শচীন। সে সময় ‘নন্দিনী’ নামে একটি ছবি নির্মাণ করছিলেন শৈলজা। নজরুল গান তৈরি করেই রেখেছিলেন, ‘চোখ গেল পাখীরে…’। ঠিক হলো, শচীনকে দিয়ে গাওয়ানো হবে গানটি। কিন্তু বিড়ম্বনা বাধল ত্রিপুরার রাজকুমারের উচ্চারণে। তিনি ‘চোখ’কে বারবার বলছিলেন ‘চো’; অর্থাৎ ‘চো গেল’, ‘চো গেল’।

নজরুল বলেন, ‘চোখ গেল’, সুরে সুরে শচীন বলেন, ‘চো গেল’। যেদিন রেকর্ডিং হবে, সেদিন ঠিক হলো সুরসাগর হিমাংশু দত্তও উপস্থিত থাকবেন। নজরুল এলেন। একমাথা বাবরি চুল দুলিয়ে বললেন, ‘এসেছি, সুরসাগর কোথায়, চাটগেঁয়ে এসেছে তো?’

নজরুল শচীনকে চাটগেঁয়ে বলতেন। সেটাই ছিল শৈলজানন্দের ছবিতে শচীনের প্রথম ফিডব্যাক। কিন্তু ওই ‘চোখ’ আর ‘চো’র সংকট তখনো কাটেনি। একনাগাড়ে আধঘণ্টা চেষ্টার পর শচীন উচ্চারণ করতে পারলেন ‘চোখ’।

সে সিনেমায় নজরুলের ‘চোখ গেল পাখীরে’র পাশাপাশি ‘ও পদ্মার ঢেউরে…’ গানটিও গেয়েছিলেন তিনি। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *