রোহিঙ্গা নীতি-কৌশল আমূল পাল্টানো দরকার

মতামত

রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছে প্রায় ৬৬ মাস হলো। এসেছিল প্রায় ১০ লাখ। এখন ১১-১২ লাখে পরিণত হয়েছে। ইতিমধ্যে নতুন মুখ যুক্ত হয়েছে আরও প্রায় দেড় লাখ। প্রতিদিন নতুন করে প্রায় ৯০টি রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হচ্ছে। শিবিরগুলো ক্রমে উপচে পড়ছে মানুষে। সেখানে রক্তাক্ত সংঘাত-সংঘর্ষ দেখা যাচ্ছে।

আবার আরাকান সীমান্তও আগের চেয়ে বেশি উত্তপ্ত এখন। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রত্যাশাও আমূল বদলে গেছে। পাশাপাশি বেগবান হয়ে উঠছে সাগরপথে রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা। প্রশ্ন উঠেছে, এত সব খারাপ প্রবণতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এখন কী করবে? এই সমস্যা থেকে রেহাই পেতে বিকল্প কিছু গুরুত্বের সঙ্গে ভাবার সময় হয়েছে কি না?

তমব্রু সংঘাত কি কোনো মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত?
ভাসানচরকে আলাদা রাখলে রোহিঙ্গা শিবিরের সংখ্যা ৩৩টি। এসব শিবিরের চারদিকে আপাতদৃষ্টিতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা। কিন্তু ভেতর থেকে প্রতিনিয়ত সংঘাত-সংঘর্ষ-খুনোখুনির সংবাদ মেলে। সেখানে অনেকগুলো গ্যাং তৈরি হয়েছে। বহুমুখী চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। ক্যাম্পগুলোর ভেতরে গড়ে ওঠা মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে। মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বিবাদ আছে। স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা নতুন সামাজিক নেতৃত্ব ক্রমাগত আক্রান্ত হয় এসব ক্যাম্পে। মুহিবুল্লাহর মতো সুপরিচিত এবং প্রভাবশালী রোহিঙ্গা কণ্ঠস্বরকে উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া শিবিরে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে নির্মমভাবে খুন হতে দেখা গেছে। তারপরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে কমই। চোরাগোপ্তা গ্যাংগুলোর নৃশংসতা থামানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছিল। এর মাঝেই ঘটেছে গত ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে তমব্রু সীমান্তের সংঘর্ষ। রোহিঙ্গাদের নিজেদের মধ্যে গত পাঁচ বছরে এটাই সবচেয়ে বড় উপদলীয় সংঘাত। এতে ‘আরসা’ নামে পরিচিত সশস্ত্র দলটি তমব্রু থেকে বিতাড়িত হয় বলে জানা গেছে। সেখানকার বসতিগুলো রীতিমতো পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ কাজে অপরপক্ষে ছিল ‘আরএসও’ নামে পরিচিত এক রোহিঙ্গা শক্তি, যারা এই আক্রমণে ‘বিভিন্ন উৎস’ থেকে মদদ পেয়েছিল বলে স্থানীয় ভাষ্য মেলে।
আপাতদৃষ্টিতে আরএসওর প্রতিরোধে আরসাকে তমব্রু ছাড়তে হলেও এ ঘটনা ‘শুরুর শেষ, নাকি শেষের শুরু’—তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু এই দিনের পর রোহিঙ্গা জনপদে পরিস্থিতি আর আগের মতো নেই।

গুরুতর এই সংঘাতের দুটি বিপরীতমুখী সম্ভাব্য পরিণতি অনুমান করা যায়: প্রথমত, আরসা প্রতিশোধ নিতে পারে। তাতে সংঘাতের দুষ্টচক্র চালু থাকবে। দ্বিতীয়ত, ক্যাম্পগুলোতে এত দিনকার চোরাগোপ্তা হামলা কমে আসবে, আরসার অনুসারীরা যেসব হামলা করত বলে অভিযোগ আছে। যদিও তার সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার সুযোগ ছিল না।

সীমান্তের প্রায় শূন্যরেখায় তমব্রু শিবির সরকার স্বীকৃত কোনো ‘ক্যাম্প’ নয়। ৫০০-৬০০ রোহিঙ্গা পরিবার এখানে থাকত। অনিবন্ধিত এই ক্যাম্পের সংঘর্ষ সব নিবন্ধিত ক্যাম্পের পুরো জনগোষ্ঠীকে ভাবাচ্ছে এখন। ক্যাম্প বাসিন্দারা পরিস্থিতির একটা মোড় পরিবর্তনের অপেক্ষায় আছে। আরসার পিছু হটা কৌশলগত দিক থেকে বাংলাদেশের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও তার স্থায়িত্ব নিয়ে আশ্বস্ত হতে পারছে না স্থানীয় লোকজন।

রোহিঙ্গা নীতি-কৌশল কি পাল্টাবে?
এতে সন্দেহ করার সুযোগ নেই যে বাংলাদেশ সরকার গত ৬৬ মাস রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে সব উপায়ে চেষ্টা করেছে। 
কিন্তু এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ যেসব কৌশল নিয়েছিল তা যে সামান্যই ইতিবাচক ফল দিয়েছে, সেটাও এখন অনেকখানি স্পষ্ট।

সংগত কারণেই নীতিনির্ধারকদের সামনে পুরোনো নীতি-কৌশল পরিবর্তনের একটা চাপ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের এত দিনকার রোহিঙ্গা নীতির প্রধান দিক ছিল দুটি। প্রথমত, আন্তর্জাতিকভাবে চীন ও ভারতের ওপর নির্ভর করে প্রত্যাবর্তনের জন্য বৈশ্বিক সমর্থন জোরদার করা। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ভেতর রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক-সামাজিকভাবে সংগঠিত হওয়ার যেকোনো চেষ্টাকে নিয়ন্ত্রণ করা। শেষোক্ত কৌশলের কারণে ১০ লাখ রোহিঙ্গা পাঁচ বছরে একপ্রকার ক্যাম্পবন্দী। শিক্ষা এবং আয়ধর্মী কাজেও তাদের যুক্ত করা হয়নি খুব একটা। তারপরও অবশ্য অনেক রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নভাবে ক্যাম্পের বাইরে যায় কাজের খোঁজে। অনেকে অল্পবিস্তর ক্যাম্পের বাইরের জগতেও মিশে যাচ্ছে। তমব্রু সংঘাতের পর সেখানকার আশ্রয়শিবিরের প্রায় দুই হাজার লোককে একইভাবে এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ রকম সব খবরই বেশ হতাশাজনক। তবে ঢাকাকে সবচেয়ে বেশি হতাশ করেছে বেইজিং এবং নয়াদিল্লি। রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভরসায় তাদের সক্রিয় ভূমিকা পাওয়া গেছে সামান্যই।
এটা অবশ্যই বাংলাদেশের ভুল ধারণা ছিল যে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে চীন-ভারত নেপিডোর জেনারেলদের চাপ দেবে। এ রকম হওয়ার কোনো কারণ ছিল না এবং এখনো নেই। চীন-ভারতের জন্য মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে সে দেশে। ভূরাজনৈতিক বিবেচনায়ও মিয়ানমার এশিয়ার ওই দুই পরাশক্তির কাছে অতি প্রয়োজনীয়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিভ্রমে থাকার উপায় নেই।

আমরা দেখেছি, চীন বহুবার বলেছে, তারা রোহিঙ্গা বিষয়ে প্রয়োজনীয় সমাধানে কাজ করছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আন্তর্জাতিক পরিসরে তারা ওখানকার জান্তাকে প্রশ্নহীনভাবে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, ভারতও নেপিডোর শাসকদের কখনো অপ্রিয় রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ তুলে বিব্রত করেছে বলে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। আরাকানে ভারতের বিপুল বিনিয়োগ এবং মণিপুর-নাগাল্যান্ড সীমান্তে স্থানীয় বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর অনিবার্য সহযোগিতা নয়াদিল্লির দরকার। এই সব মিলিয়ে ভারতও রোহিঙ্গা প্রশ্নে শক্তভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়নি; অর্থাৎ এই দুই ‘বন্ধু’র ওপর ভরসা করে বাংলাদেশ পুরোদস্তুর ঠকেছে।

এই বাস্তবতায় রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কর্মনীতি যে আমূল পাল্টানো দরকার, তা এখন সময়ের দাবি। চীন ও ভারতের সঙ্গে অন্যান্য বিষয়ে বিদ্যমান বন্ধুত্ব রেখেও রোহিঙ্গা বিষয়ে বাংলাদেশের শক্তিশালী আন্তর্জাতিক বন্ধু খুঁজে পেতে হবে। তার সুযোগও আছে। নতুন ঠান্ডাযুদ্ধ সেই সুযোগ তৈরি করছে। বাংলাদেশ সেই সুযোগ নেওয়ার হিম্মত দেখাতে না পারলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো অধরা এক কূটনৈতিক লক্ষ্য হয়েই থাকবে।

রোহিঙ্গাদের সংগঠিত হতে দিলে সমস্যা কী?
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হলে তাদের সংগঠিত হতেও দিতে হবে। এটা প্রয়োজন। নিজ মাতৃভূমিতে রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার সংগ্রাম পুরোটা বাংলাদেশের কাঁধে নেওয়ার সুযোগ নেই, প্রয়োজনও নেই। এটা তাদের সমস্যা। সমাধান খুঁজে পেতেও তাদের যুক্ত 
হতে হবে।

সন্দেহ নেই যে মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনীর তুলনায় আপাতত রোহিঙ্গারা অসহায় জনগোষ্ঠী। কিন্তু সংগঠিত হওয়ার ভেতর দিয়েই কেবল অসহায়রা বিশ্বসমাজের কাছে বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে। এ রকম সংগঠিত হওয়ার প্রক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই চূড়ান্ত রকমের অহিংস হবে। বাংলাদেশ সে ক্ষেত্রে নজরও রাখবে। কিন্তু আরাকানে ফেরার সংগ্রামকে রোহিঙ্গাদের নিজেদের কাঁধে নেওয়ার সময় হয়েছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রোহিঙ্গা তরুণেরা সে দায়িত্ব নিতেও আগ্রহী। ফলে তাদের একতাবদ্ধ হতে দিতে বাংলাদেশের আপত্তি থাকার কী কারণ থাকতে পারে, তা বোঝা মুশকিল। মানবাধিকারসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধানের আলোকেই সেটা সম্ভব।

বাংলাদেশ যে একক চেষ্টায় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে পাঠাতে পারবে না, সেটা গত পাঁচ বছরে অতি স্পষ্ট। এটা তিক্ত সত্য। কিন্তু এই সত্য মেনে নেওয়াই ভালো হবে। এ-ও অবশ্যই মানতে হবে, অল্পমাত্রায় হলেও রোহিঙ্গারা ক্রমে বাংলাদেশের সমাজে মিশে যাচ্ছে, যদিও তারা নিজেদের দেশেই ফিরতে আগ্রহী। আগামী এক-দুই বছরের মধ্যে যদি এই জনগোষ্ঠীকে তাদের পুরোনো বসতিতে ফেরত পাঠানো না যায়, তাহলে সেটা দেশে-বিদেশে একটা খারাপ বার্তা ছড়াবে। একই সঙ্গে তার পরিণতিও হবে খারাপ।

এ বছরই মিয়ানমারে এক দফা নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানকার সামরিক সরকার জনপ্রতিরোধের মুখে যদি এই নির্বাচন করে নিতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সে আরও অবজ্ঞা করতে শুরু করবে।

অন্যদিকে, রোহিঙ্গা শিবিরগুলোকে 
বর্তমান ধাঁচে, বর্তমান অবস্থায় রেখে মিয়ানমার থেকে মাদকের আগ্রাসন এবং সাগরপথে মানব পাচারের আধিক্য কমানোও কঠিন। এটা ঠিক নয় যে মিয়ানমারের দিক থেকে বাংলাদেশ যে মাদকযুদ্ধের শিকার, তার কারণ রোহিঙ্গারা। কিন্তু বাস্তবতা হলো সীমান্তজুড়ে বিপুল রোহিঙ্গার উপস্থিতি এই সমস্যা নিয়ন্ত্রণে কাঠামোগত উদ্যোগ নেওয়া দুরূহ করে ফেলেছে।

সাম্প্রতিক আরেক বিপজ্জনক প্রবণতা হলো উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পগুলোকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমতে শুরু করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ অব্যাহত থাকার মুখে ইউরোপে শরণার্থী সমস্যা বাড়ায় এশিয়ার শরণার্থীদের জন্য পুরোনো ধারায় আর সহায়তা পাওয়া যাবে না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও অনেকগুলো খারাপ উপাদান উদীয়মান। এসব বিবেচনায় রোহিঙ্গা বিষয়ে বিদ্যমান নীতি-কৌশলে দ্রুত পরিবর্তন আনা জরুরি। সময় দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরের ভুলগুলো পুনরায় ঘটতে দেওয়া হবে বিপর্যয়কর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *