কয়লার দামে ‘ছাড় দিতে রাজি’ আদানি

বাংলাদেশ

ভারতের আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার দাম বেশি ধরা হচ্ছে। কয়লার দাম বেশি হলে বিদ্যুৎ কিনতে বেশি খরচ হবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি)। তাই কয়লার দর পর্যালোচনার জন্য আদানিকে চিঠি দিয়েছে পিডিবি। এর পরিপ্রেক্ষিতে কয়লার দরে ছাড় দিতে ভারতীয় কোম্পানিটি রাজি বলে সূত্র জানিয়েছে। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য চলতি মাসে আদানি প্রতিনিধি দলের বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে।

ঝাড়খন্ডের গোড্ডার ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা আমদানির জন্য ভারতে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে ডিমান্ড নোট ইস্যুর জন্য সম্প্রতি পিডিবিকে চিঠি দিয়েছে আদানি। ওই চিঠিতে প্রতি টন কয়লার দর ৪০০ মার্কিন ডলার ধরা হয়েছে। পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, এই মানের কয়লার বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ২৫০ ডলারের বেশি নয়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দেখতে যায়। এ সময় কয়লার দাম নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর পিডিবি কয়লার দর পর্যালোচনা করার বিষয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।

বিদ্যুৎ ক্রয়সংক্রান্ত চুক্তি অনুসারে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে জ্বালানির দাম যুক্ত হয়। অর্থাৎ জ্বালানি যে দামেই কেনা হোক, তা শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দিতে হয়। পিডিবির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কয়লা কেনার ক্ষেত্রে একাধিক সূচক রয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এসব সূচক অনুসারে অধিক পরিমাণে উন্নতমানের কয়লা কেনার ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় পায়। বিভিন্ন বেসরকারি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পিপিএতে এই ছাড়ের বিষয়টি উল্লেখ আছে। ফলে কয়লার দর কম হয়। কিন্তু আদানির সঙ্গে স্বাক্ষরিত পিপিএতে এই বিধান নেই। ফলে আদানির কয়লার দাম বেশি পড়ছে। বিদ্যুতের দামও বেশি হবে।

রোববার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ সাংবাদিকদের বলেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে আদানির চুক্তি অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হবে। প্রতিযোগিতামূলক দামেই কয়লা পাওয়া যাবে। কয়লার দাম অস্বাভাবিক বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। সূত্র জানায়, কয়লার দর নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ আদানির নজরে এসেছে।

আদানি বলছে, বাংলাদেশের অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্র যে দামে কয়লা আমদানি করে, তার সঙ্গে তাদের দামের পার্থক্য খুব বেশি হবে না। এ ক্ষেত্রে ছাড় দিতে তারা প্রস্তুত। কারণ, বাংলাদেশের সঙ্গে আদানি দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবসা করতে আগ্রহী। তবে আদানি অন্য বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর কয়লার দাম জানতে আগ্রহী।

ছাড় দিলেও দাম বেশি হতে পারে: পাওয়ার সেলের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের চারটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে আদানির বিদ্যুতের দাম বেশি পড়ছে।
পটুয়াখালীর পায়রায় নির্মিত চীন-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াটের পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ইউনিটপ্রতি ২ টাকা ৮৩ পয়সা। কেন্দ্রটিতে ব্যবহূত ৫ হাজার ৪০ ক্যালরিফিক মানের আমদানি করা কয়লার দাম পড়ছে ২৪৫ ডলার। ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বর্তমানে ১৩ টাকা ৩৭ পয়সা।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে এস আলম গ্রুপের ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট কেন্দ্রের প্রতি ইউনিটের ক্যাপাসিটি চার্জ ৪ টাকা ৭১ পয়সা। কেন্দ্রটিতে ব্যবহূত ৪ হাজার ৬০০ ক্যালরিফিক মানের কয়লার প্রতি টনের দাম ধরা হয়েছে ২৫৪.৩৮ ডলার। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় হবে ১৮ টাকা ৩৯ পয়সা।

বাগেরহাটের রামপালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ উদ্যোগের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ৫ টাকা ১৯ পয়সা। ৪ হাজার ৬০০ ক্যালরিফিক মানের কয়লার প্রতি টনের দাম ধরা হয়েছে ২৫৪.৩৮ ডলার। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় হবে ১৮ টাকা ৩৯ পয়সা।
বরগুনার বরিশাল ইলেকট্রিক পাওয়ারের ৩০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রটির জন্য ৪ হাজার ৬০০ ক্যালরিফিক মানের কয়লার দাম ২৭০ ডলার। কেন্দ্রটির ক্যাপাসিটি চার্জ ইউনিটপ্রতি ধরা হয়েছে ৩ টাকা ৯৪ পয়সা। বিদ্যুতের দাম পড়বে ১৮ টাকা ৮৪ পয়সা।
আদানি তার ঝাড়খন্ডের ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট কেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ধরেছে প্রতি ইউনিটে ৪ টাকা ৫৫ পয়সা। তারা ৪ হাজার ৬০০ ক্যালরিফিক মানের কয়লার দাম দেখাচ্ছে প্রতি টন ৩৪৬ ডলার। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে ২৪ টাকা ২৮ পয়সা।

সংশ্লিষ্ট একাধিক প্রকৌশলী সমকালকে বলেন, বর্তমানে আদানি কয়লার যে দর দেখাচ্ছে, তাতে ছাড় দিলেও বিদ্যুতের দাম বেশি হবে। কারণ, পায়রা বা রামপালের কয়লা বিদেশ থেকে সমুদ্রপথে এসে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংশ্নিষ্ট জেটিতে খালাস হয়। কিন্তু আদানির ঝাড়খন্ডে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লা তাদেরই মালিকানাধীন অস্ট্রেলিয়ার কারমাইকেল খনি থেকে সমুদ্রপথে আনা হবে। এরপর আদানির নিয়ন্ত্রণাধীন উড়িষ্যার ধামারা সমুদ্রবন্দরে খালাস হওয়ার কথা রয়েছে। সেখান থেকে রেলপথে ৭০০ কিলোমিটার দূরে ঝাড়খন্ডের গোড্ডায় নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে নেওয়া হবে। এতদূর পথ কয়লা পরিবহন খরচের পাশাপাশি একাধিক রাজ্যের অভ্যন্তরীণ ট্যাক্স-ভ্যাট ইস্যু রয়েছে। সব মিলিয়ে কয়লার চূড়ান্ত দর বেড়ে যাবে।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) এক প্রতিবেদনেও এ কথা বলা হয়েছে। আদানি ভারতে যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালায়, এগুলো অধিকাংশই সমুদ্রের কাছে; যাতে সড়ক অথবা রেলে কয়লা পরিবহনের খরচ কমানো যায়। কিন্তু গোড্ডার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্দর থেকে বেশি দূরে হওয়ায় কয়লা পরিবহনে বাড়তি ব্যয় বিদ্যুতের দাম বাড়াবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *