বাংলা-উর্দু বিতর্ক

আড্ডা

বাঙালি মুসলমান দীর্ঘকাল নিজেকে বাঙালি পরিচয়ে পরিচিত হয়নি। হতে চায়নি। হিন্দু-মুসলমান দ্বন্দ্বের কথা আমরা বলেছি। এই দুই সম্প্রদায়ই পরস্পরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়িয়েছে। আবার গ্রামের দরিদ্র হিন্দু-মুসলমান তাদের আচার-ধর্ম পালন করে গেছে নিজেদের মতো করেই। রাজনৈতিক সংঘাতের সময়ও তারা ছিল নির্বিকার।

এবার বাঙালি মুসলমানের মনোভঙ্গির দিকে তাকানো যাক। বাঙালি মুসলমান তার আত্মপরিচয়ের সন্ধানে কল্পনার জগতে ভ্রমণ করতেই পছন্দ করেছে বেশি। বাঙালি হিন্দু নিজেদের হিন্দু পরিচয়ের পরও বাঙালি পরিচয়কে বড় করে দেখত। বাঙালি মুসলমান নিজেকে খুঁজেছে বহিরাগত মুসলিমদের মধ্যে। নিজেরা এই মাটির সন্তান হলেও তারা ভেবেছে, তাদের শিকড় এখানে নয়, আছে আরব বা ইরানে। নিজেদের মাটি-বিচ্ছিন্ন ভাবার কারণে তারা এই দেশের ইতিহাসে আত্মপ্রতিষ্ঠ হতে চেষ্টাও করেনি। আমরা বাংলা শাসন করা মুসলমানদের মধ্যে বাঙালি কি খুব একটা খুঁজে পাচ্ছি? বাঙালি মুসলমান কি মসনদে বসার চেয়ে বহিরাগত এবং পরে বাঙালিদের সঙ্গে মিশে যাওয়া মুসলমান শক্তির ওপরই বেশি নির্ভর করেনি? ফলে সৃষ্টিশীল কর্মকাণ্ডে বাঙালি মুসলমানকে খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল।

দীনতা ছিল বাঙালি মুসলমানের। কারণ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আশপাশে বাঙালি মুসলমান যায়নি বা যেতে পারেনি। তাদের মূল আবাসস্থল ছিল গ্রামে। কিন্তু বাঙালি বলে তাদের গোষ্ঠীচেতনা জন্মায়নি। তাই বাঙালি মুসলমান তার মুসলমান পরিচয় নিয়েই সন্তুষ্ট ছিল, বাঙালি পরিচয়টি তাকে আকৃষ্ট করেনি। বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস লিখতে গেলে অবাঙালি আরব-ইরান-তুরস্ক থেকে আগত মুসলমানদের ইতিহাসই লেখা হয়েছে। সে সময় বাঙালি হওয়াটাকেই তারা অপরাধ বলে মনে করেছে। সাহিত্যকর্ম করতে গিয়েও বাঙালি মুসলমান চেষ্টা করেছে আরব বা ইরানের প্রচলিত কিংবদন্তির শরণাপন্ন হতে। বাঙালি মুসলমানের আরেকটি প্রবণতা প্রবলভাবে ছিল, এখনো আছে—তারা নিজেদের আরব বা ইরানিদের উত্তরপুরুষ বলে ভাবতে স্বচ্ছন্দবোধ করে। খেয়াল করলেই দেখা যাবে, খানদান বলতে বহিরাগত সংস্কৃতির ধারক-বাহকদেরই বোঝা হতো। বাঙালি পরিচয় যেন গ্লানিকর। হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের পর নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের জন্মের আগপর্যন্ত বাঙালি মুসলমান তার মুসলমান পরিচয়ের পাশাপাশি বাঙালি পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেনি।

পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে একই রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার পরই বাঙালি মুসলমান নিজের বাঙালি পরিচয়ের দিকে নজর দিল। ওরাও মুসলমান, আমরাও মুসলমান। কিন্তু ওরা শোষক, আমরা শোষিত—এই উপলব্ধি যখন এল, তখন থেকেই বাঙালি মুসলমান তার নিজস্ব মাটিতে ফিরে আসা শুরু করল। আর তখনই জেগে উঠল জাতীয়তাবোধ। ধর্মীয় পরিচয় ভেদ করে বেরিয়ে এল তার জাতীয়তার পরিচিতি। এই বিন্দুতে দাঁড়িয়েই ভাষা আন্দোলনকে দেখতে হবে।

আরবি, উর্দু, বাংলা—এই তিন ভাষা নিয়ে সংশয়ে পড়েছিল বাঙালি মুসলমানরা। একটা সময় পর্যন্ত বাংলা যে মাতৃভাষা হতে পারে, সে কথা তারা ভাবতেও পারেনি। উর্দুই হবে মাতৃভাষা এবং জাতীয় ভাষা—এ রকমই ছিল তাদের অভিমত। আর আরবি হবে ধর্মীয় ভাষা। জীবিকার প্রয়োজনে ইংরেজিকেও তারা ঠাঁই দিয়েছিল ভাবনায়। কিন্তু বাংলাকে নয়। এই ত্রিধারার ঘূর্ণিতেই আসলে ভাষাপ্রসঙ্গটি জোরদার হয়ে ওঠে।

উর্দুকে বাঙালি মুসলমানের ঘরে প্রতিষ্ঠা করার ষড়যন্ত্র কিন্তু শুরু হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই। তৃতীয় বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে মাওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ বলেছিলেন, ‘কোনো দেশের বা প্রদেশের মুসলমানদিগের দ্বারা কথিত ভাষা সেইসকল স্থানীয় মুসলমানদিগের জাতীয় ভাষা বলিয়া গৃহীত হইতে পারে না। মুসলমানদিগের জাতীয় ভাষা যে আরবি, এ কথা ভুলিলে মুসলমানের সর্বনাশ হইবে।’

এর প্রতিবাদে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়, ‘জাতি অর্থ কোনো বিশিষ্ট ধর্ম সম্প্রদায় নহে। … এই হিসাবে বাঙ্গালা ভাষা বাঙ্গালা দেশের সমগ্র অধিবাসীর জাতীয় ভাষা। … আমরা আরবি ভাষাকে আমাদের ন্যাশনাল ল্যাঙ্গুয়েজ বলিতে কিছুতেই রাজি নহি।’

চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এক মুসলমান ছাত্র সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ বলেছেন, ‘তোমরা কেবল ছাত্র নও, তোমরা বাঙালি। তোমরা বাঙালি মুসলমান।’ নূর পত্রিকার সম্পাদকীয়টি দেখলেও বোঝা যাবে, ভাষাপ্রসঙ্গটি তখন কতটা বিতর্ক তৈরি করেছিল। লেখা হচ্ছে সে সম্পাদকীয়তে, ‘বাঙ্গালার মাটি হইতে উর্দুকে নির্বাসিত করিতে না পারিলে বাঙ্গালা ভাষা বাঙ্গালী মুসলমান সমাজের মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে পারিবে না। মাতৃভাষার বিপুল ও তুমুল চর্চা ব্যতীত কোনও জাতির মুক্তি ও কল্যাণ লাভ কদাপি সম্ভবপর নহে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *