চট্টগ্রামে বে-টার্মিনাল নির্মাণ-ভূমি বন্দোবস্তের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে প্রকল্প

বাংলাদেশ

ভূমি বন্দোবস্ত নিয়ে জটিলতায় ঘুরপাক খাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর সম্প্রসারণে নেওয়া বে-টার্মিনাল প্রকল্প। প্রকল্প গ্রহণের সাত বছরেও অধিগ্রহণ করা যায়নি প্রয়োজনীয় জমি। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে দফায় দফায় চিঠি চালাচালি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সমাধানে আসা যায়নি। সম্প্রতি ভূমি মন্ত্রণালয়ের খাসজমি-১ অধিশাখা থেকে এই প্রকল্পের জমি বন্দোবস্তসংক্রান্ত তিনটি নথি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন নিয়ে চিন্তা বেড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জমি অধিগ্রহণ বা বন্দোবস্তের ব্যবস্থা না হলেও বে-টার্মিনালের মাস্টারপ্ল্যান এবং ব্রেক ওয়াটার নির্মাণের সমীক্ষা প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে। আগামী মার্চ ও জুনের মধ্যে এসব কাজ শেষ হওয়ার কথা। এই অবস্থায় ভূমির বিষয়টি নিষ্পত্তি না হলে ঝুলে পড়বে নকশা প্রণয়নসহ প্রকল্পের বাকি সব কাজ।

২০১৫ সালে সমুদ্র উপকূলে বে-টার্মিনাল প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে বে-টার্মিনাল প্রকল্পটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) পদ্ধতিতে বাস্তবায়নে অনুমোদন দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর লাগোয়া ডবলমুরিং এবং বন্দর থানাধীন চারটি মৌজায় ৮০৩ একর খাসজমি অধিগ্রহণ বা বন্দোবস্তের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। কিন্তু সাত বছরেও প্রকল্পের এসব জমি অধিগ্রহণ করে বন্দর কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিতে পারেনি জেলা প্রশাসন।

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সর্বশেষ গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর বে-টার্মিনালের জন্য অকৃষি খাসজমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিষয়ে এক আন্তমন্ত্রণালয়ের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ভূমিসচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় বন্দরের চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বে-টার্মিনালকে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার তিনটি নথি ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে নতুন করে বন্দোবস্তের প্রস্তাব প্রেরণের জন্যও বলা হয়। অর্থাৎ প্রকল্প গ্রহণের সাত বছর পর আবার নতুন করে শুরু করতে হচ্ছে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এডিসির (এলএ) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। উনি এই বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন।’ 
এরপর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) মো. আবু রায়হান দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বে-টার্মিনালের প্রস্তাবিত জমিগুলো নিয়ে বেশ কটি মামলা রয়েছে। হাইকোর্টে রিট আদেশও রয়েছে। এ জন্য অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এগোনো যাচ্ছে না।

বন্দর সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০১৬ সালের নভেম্বরে বে-টার্মিনালের জন্য ৮২০ একর খাসজমি বন্দোবস্তের আবেদন করা হয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কাছে। ২০১৭ সালের প্রথম দিকে দুটি বন্দোবস্ত মামলা করে জেলা প্রশাসন। এতে ১০ হাজার কোটি টাকা প্রাক্কলন তৈরি করে ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ২০২১ সালের জুন মাসে ভূমি মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসককে দেওয়া চিঠিতে এই প্রকল্পের জন্য ব্যক্তিমালিকানাধীন শূন্য দশমিক ৭৮৭৫ একর জমি এবং ৮০২ দশমিক ৩৮৩৫ একর খাসজমি অধিগ্রহণ করতে বলে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার আলোকে জেলা প্রশাসন উল্লিখিত জমিগুলো স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেয় এবং এ জন্য খাসজমির অধিগ্রহণ মূল্য হিসেবে বন্দরের কাছে ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা দাবি করে। কিন্তু নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় প্রতীকী মূল্যে ৮০২ একর খাসজমি বন্দোবস্ত দিতে ভূমি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে। এরপর ভূমি মন্ত্রণালয় সেই অধিগ্রহণ প্রস্তাব বাতিল করে বন্দোবস্তের প্রস্তাব প্রদানের নির্দেশনা দেয়, যাতে বে-টার্মিনাল নির্মাণে এ ক্ষেত্রে বেশি অর্থ ব্যয় না হয়। এবার জেলা প্রশাসন তিনটি বন্দোবস্ত মামলা করে ঠিকই, সেই সঙ্গে জমির সেলামি বাবদ ১১ হাজার কোটি টাকা দাবি করে বসে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে। পরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আবারও নামমাত্র মূল্যে জমি দেওয়ার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করে। এভাবে কেটে গেছে সাত বছর।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘কম মূল্যে বে-টার্মিনালের জমি পাওয়ার চেষ্টায় আছি। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মোতাবেক জমি বন্দোবস্তের আবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।’

উল্লেখ্য, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। বে-টার্মিনাল নির্মাণ হলে ১২ মিটার ড্রাফট এবং ৬ হাজার কনটেইনার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন ২৮০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের জাহাজ অনায়াসে ভিড়তে পারবে। বন্দরে জাহাজ ভেড়ার জন্য তখন জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করতে হবে না, ২৪ ঘণ্টা জাহাজ আসা-যাওয়া করতে পারবে। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *