ভালো নেই অনলাইনের নারী উদ্যোক্তারা

অর্থনীতি

‘যে রংটা ৮০ টাকায় কিনতাম, এখন সেটা ১২০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। যে কাপড়টা ২২০ টাকায় পেতাম, এখন এর জন্য ৩৫০ টাকা গুনতে হচ্ছে। আবার দাম বাড়িয়ে বিক্রি করলে ক্রেতা পাচ্ছি না।’ বলছিলেন দেশীয় পণ্য বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান মিরা অ্যাটায়ারের স্বত্বাধিকারী পূর্ণিমা ত্রিপুরা পিউ। তিনি জানান, গত বছরের তুলনায় এবার ফাল্গুনে তাঁর পণ্যের বিক্রি ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। অথচ করোনার বিধিনিষেধ না থাকায় এবার ফাল্গুনে বেশি বিক্রি হওয়ার কথা ছিল। পূর্ণিমা ত্রিপুরা একা নন, দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করা বেশির ভাগ নারী উদ্যোক্তা বলছেন, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তাঁদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কাঁচামালের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়া এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘হুর নুসরাত’-এর স্বত্বাধিকারী নুসরাত আক্তার লোপা বলেন, ‘বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার ফাল্গুনে বিক্রি ৪০ শতাংশের মতো কমেছে। দেশীয় পণ্যের অবস্থা এখন খুব খারাপ। আমরা এবার গত বছরের সমপরিমাণ প্রোডাকশনই করতে পারিনি। এমন অনেকে আছেন, যাঁরা এবার নতুন কোনো পণ্যই আনতে পারেননি।’

নুসরাত মনে করেন, ভারত-পাকিস্তান থেকে আসা পণ্যের কাছে এখন দামের দিক থেকে দেশীয় পণ্য মার খাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই সস্তায় ভারত-পাকিস্তান থেকে আনা জামাকাপড় বিক্রি করছেন। কিন্তু দেশীয় পণ্যগুলো এত কম দামে বিক্রি করা যাচ্ছে না।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) তথ্যমতে, করোনাকালে অনলাইন ব্যবসায় যুক্ত হওয়া ৩০ শতাংশ নারীই ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছেন। নারী উদ্যোক্তারা বলছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দক্ষতায় ঘাটতি, বড় অঙ্কের ঋণ না পাওয়া, পণ্য রপ্তানিতে জটিলতা ও বাজার সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের।

বুটিক হাউস অপরাজিতার স্বত্বাধিকারী সুমাইয়া সাফিনাজ অন্যা বলেন, ‘আমাদের পণ্যের বেশির ভাগ ক্রেতাই মধ্যবিত্ত শ্রেণির। শখের বশে তারা আমাদের পণ্য কেনে। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই শ্রেণির ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। তারা এখন অত্যাবশ্যকীয় জিনিস কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে। শখ পূরণের বিষয়টি বাদই রাখতে হচ্ছে। সেই প্রভাব পড়ছে আমাদের ব্যবসায়ের ওপরে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভরশীল নারী উদ্যোক্তারা জানান, ফেসবুকে নানা জটিলতার কারণেও অনেকে ক্রেতা হারাচ্ছেন। ফাহমিদা দিনা নামের একজন এফ-কমার্স উদ্যোক্তা বলেন, ‘কয়েক মাস ধরে ফেসবুক পেজের রিচ হঠাৎ করেই কমে যাচ্ছে। ফেসবুকের নানা নীতির কারণে আমরা অনেকেই এই সমস্যার সম্মুখীন হই। আমাদের ব্যবসাটা ফেসবুকনির্ভর। তাই রিচ কমে গেলে আমাদের অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়।’

নারী উদ্যোক্তা ও ই-কমার্সের ফেসবুকভিত্তিক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘উই’ যাত্রা শুরু করে ২০১৭ সালে। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা ১৩ লাখ। এই অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সহায়তায় দেশের প্রায় ৪ লাখ নারী উদ্যোক্তা হয়েছেন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হোলসেল অ্যান্ড রিটেইল ট্রেড সার্ভে-২০২০ অনুসারে, দেড় দশকে দেশে নারী উদ্যোক্তা বেড়েছে ৮২৯ শতাংশ। ২০০২-০৩ অর্থবছরে নিবন্ধিত খুচরা ও পাইকারি প্রতিষ্ঠানে নারী উদ্যোক্তা ছিলেন মাত্র ২১ হাজার ৮৬৭ জন। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এ সংখ্যা ৮৯ হাজার ৮৪৮ জনে পৌঁছায়। আর ২০১৯-২০ অর্থবছরে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা হয় ২ লাখ ৩ হাজার ১৮৯ জন।

নারী উদ্যোক্তা উম্মে হাবিবা বলেন, ‘নতুন নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সরকার অনুদান, প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছে। কিন্তু নতুন উদ্যোক্তা তৈরির চেয়ে পুরোনো উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার বিষয়ে আরও বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত। বিদেশে আমাদের পণ্যের ভালো চাহিদা আছে। এ জন্য আমাদের ঋণ নেওয়া ও বিদেশে পণ্য পাঠানোর প্রক্রিয়াটা একটু সহজ করা উচিত। তাহলে আমরা এই বাজারটা ধরতে পারব।’

এ বিষয়ে ই-ক্যাবের উইমেন্স এন্ট্রাপ্রেনিউর্স ফোরাম-সম্পর্কিত স্ট্যান্ডিং কমিটির প্রেসিডেন্ট নাজনীন নাহার বলেন, ‘এখন প্রতিযোগিতা অনেক বেশি। এ কারণে অনেক উদ্যোক্তারই বিক্রি কমেছে। উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়া এবং ক্রস বর্ডার সেলের (বিদেশে পণ্য পাঠানো) ব্যাপারে এসএমই ফাউন্ডেশনের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা স্মারকের কাজ চলছে। মৌখিকভাবে তারা কিছু বিষয়ে সম্মতিও দিয়েছে। এটা হয়ে গেলে নারী উদ্যোক্তাদের কিছু বিষয়ে জটিলতা কেটে যাবে।’ 

নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অধীনে থাকা জয়িতা ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ইয়াসমিন আখতার বলেন, ‘পুরো বিশ্বেই এখন একটা খারাপ সময় যাচ্ছে। এর আঁচ আমাদের দেশেও পড়েছে। নারী উদ্যোক্তারাও এর বাইরে নয় ৷ আমাদের সব সময়ই চেষ্টা থাকে তাদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। আমরা নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। তারা যেন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে সে জন্য তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *