গৃহকর্মীরা পরিবারের অংশ হোক

মতামত

গৃহকর্মীরা আমাদের গৃহাস্থলি কাজে প্রধান সহযোগী। তাঁরা আমদের পরিবারের সঙ্গে বাস করে। দিনের বেশিরভাগ সময় তাঁরা গৃহকর্মীর কাজে কাটিয়ে দেন। একটা গবেষণায় দেখা যায়, গৃহকর্মীরা দৈনিক ১০-১৪ ঘণ্টা কাজ করেন। কিন্তু কর্মঘণ্টা অনুয়ায়ী তাঁদের পারিশ্রমিক খুবই সামান্য। অনেক ক্ষেত্রে গৃহকর্মীদের সাপ্তাহিক কোনো ছুটিও নেই। তার ওপর রয়েছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। 

গৃহকর্মী নির্যাতনের সংখ্যা বাড়লেও কমছে মামলার সংখ্যা। অনেকে গৃহকর্ত্রীর হুমকির ভয়ে চুপ করে থাকছেন। অনেকে আবার মামলা করলেও উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে বিচার হচ্ছে না। ২০১৩ সালে শিশু গৃহকর্মী ‘আদুরি’কে নির্যাতনের মামলার বিচার হলেও অন্যন্য বিচার থমকে আছে।

মানবেতর জীবনযাপন যেন গৃহকর্মীদের নিত্যসঙ্গী। অনেক গৃহকর্মী বসার রুম কিংবা রান্নাঘরের মতো খোলা জায়গায় ঘুমান। দূরপাল্লায় ভ্রমণের সময় বাসে কিংবা ট্রেনে প্রায়ই দেখা যায়, গৃহকর্মীদের জন্য আলাদা কোনো টিকিট কাটা হয় না। তাঁরা পায়ের নিচে জড়সড় হয়ে বসেই পুরো পথটা পাড়ি দিয়ে দেন। কাজে আসতে দেরি হলে বেতন কাটা হয়। 

১৩ ফেব্রুয়ারি সমকাল পত্রিকায় ৬৭ শতাংশ গৃহকর্মী মানসিক নির্যাতনের শিকার শিরোনামে রিপোর্ট করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ৯১ শতাংশ গৃহকর্মী জেন্ডার সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। গৃহকর্মীদের মাসিক আয় গড়ে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার, যেখানে তাদের মাসিক ব্যয় হয় গড়ে প্রায় ১১ হাজার টাকা। 

গৃহকর্মীদের প্রায় শতভাগ নারী এবং শিশু। তাদের অনেকেই নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয়। এই সুযোগটা নিয়ে থাকেন গৃহমালিকরা। গবেষণায় দেখা যায়, গৃহকর্মীদের প্রায় ৯৯ শতাংশ ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি’ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। এর ফলে নিজেদের অধিকার ও চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে তাঁরা অবগত নন। 

গৃহকর্মীদের কল্যাণ ও সুরক্ষার জন্য সরকার ২০১৬ সালে ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি-২০১৫’ আইন পাস করে। গৃহকর্মীর পারিশ্রমিক নির্ধারণের ব্যাপারে উক্ত আইনের ৭নং ধারায় বলা হয়েছে- গৃহকর্মীর মজুরি এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে গৃহকর্মীর পরিবার সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারে। গৃহকর্মীর কর্মঘণ্টা, ছুটি, বিশ্রাম ও বিনোদন সম্পর্কে একই ধারায় বলা হয়েছে- গৃহকর্মীর কর্মঘণ্টা এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে তিনি পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম চিত্তবিনোদন ও প্রয়োজনীয় ছুটির সুযোগ পান। ওই ধারায় গৃহকর্মীদের চিকিৎসা খরচ গৃহমালিকদের বহন করার কথা বলা হয়েছে। 

গৃহকর্মীদের সুরক্ষার জন্য গৃহমালিক ও পরিবারের সদস্যদের মনোভাবে পরিবর্তন আনা যেমন জরুরি তেমনি আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর তৎপরতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতনের যে চিত্র সংবাদমাধ্যমে পাই, তা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, গৃহকর্মীদের প্রতি আমরা কতটুকু মানবিক। তাদের প্রতি অমানবিক আচরণ করা যাবে না। গৃহকর্মীরাও তো আমাদের মতো মানুষ। তাঁদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা প্রয়োজন। গৃহকর্মীদের নিজের পরিবারের অংশ মনে করলে আর কোনো গৃহকর্মী নির্যাতনের খবর পাওয়া যাবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *