মুক্তিযোদ্ধার কোমরে রশি কেন?

মতামত

কয়েকজন মানুষের জটলার মাঝে কোমরে দড়ি আর হাতে হাতকড়া পরা অবস্থায় দাঁড়ানো একজন সত্তরোর্ধ্ব বয়সের আসামি। নরসিংদী জেলা আদালতের সামনে থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি তোলা এমনই একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় তুলে। প্রশাসনের এই বজ্র আঁটুনিতে বন্দি ব্যক্তিটি বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ছালেক রিকাবদার। তিনি শিবপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা নিয়ে চলছে সমালোচনা। আদর্শচ্যুত রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির চর্চাই যে দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে তা বর্তমানের সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন যে কোনো মানুষই বোঝেন।

এই ঘটনায় ফের সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পুলিশ। যে দেশে প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে তাদের হাত থেকে গ্রেপ্তার জঙ্গি সদস্য ছিনতাই হয়ে যায়, সে দেশে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে এমন কী গুরুতর অপরাধে ওভাবে কোমরে দড়ি বেঁধে আদালতপাড়ায় নেওয়া হলো এবং তা কতটা আইনসংগত? এ ক্ষেত্রে শিবপুর থানার ওসির নির্লিপ্ত উত্তর, ‘এ ব্যাপারে আমার কিছুই জানা নেই।’ ওসি সত্যই বলেছেন, আসলেই তিনি কিছু জানেন না। যদি জানতেন দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে কোন পর্যায়ের আসামিকে দড়ি দিয়ে বাঁধা হয় তাহলে অবশ্যই তাঁর অধীনরাও সেটা জানতেন। তবে তিনি যা-ই বলুন, একটি বিশেষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সদস্যদের খুশি করতেই সেখানকার পুলিশ প্রশাসনের এমন আয়োজন, তা বুঝতে পণ্ডিত হওয়ার দরকার নেই।

প্রশাসন বা তাঁদের এই দড়ির ব্যাপারে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। কারণ, এর অপর প্রান্তে যে তাদেরই হাত-পা বাঁধা, তা বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ততোধিকবার প্রমাণিত। চট্টগ্রামে একটি দুর্নীতিবাজ চক্রের টুঁটি চেপে ধরায় প্রশাসনের সবল একটি হাতকে কীভাবে উল্টো ভেঙে দেওয়া হলো। সাবেক এক দুদক কর্মকর্তার পরিণতিতে এর নজির দেখেছে বাংলাদেশ। যার কারণে এই দড়ির মাথায় আমরা দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সচরাচর দেশ ও দেশের সম্পদ লুটেরাদের দেখতে পাই না।

চলমান কয়েকটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের এই দড়ির বজ্র আঁটুনির গেরো আসলে কতটা ফসকা তা বেশ বোঝা যায়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে হানা দেওয়া এবং ওই প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী ও একটি সংবাদপত্রের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের দুই শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে নির্যাতন ও বিবস্ত্র করে তাঁর ভিডিও ধারণ ও প্রকাশ করার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের এই দড়ি দিয়ে বাঁধা যাচ্ছে না। বরং ন্যায্য দাবি আদায়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কখনও রাজপথে আবার কখনও রাতের আঁধারে হলে ঠিকই তৎপর প্রশাসন। আবার এই প্রশাসনই যখন এমন হানা দিয়ে কোনো বড় নেতার আদরের রাজপুত্রের শখের অবৈধ পিস্তল আর নিষিদ্ধ মাদক জব্দ করে, তখন ঠিকই সেই প্রশাসনিক প্রতিনিধিদের জম শায়েস্তা করা হয়।

মাত্র ক’দিন আগেই স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস পালিত হলো দেশে। বাস্তবতার আলোকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যায়, একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ‘স্বৈর’ নামক যে তন্ত্রের বলে ক্ষমতাসীন ছিল সেই গোষ্ঠীকে ক্ষমতাচ্যুত করে অপর একটি গোষ্ঠী ‘গণ’ নামক তন্ত্রের আধারে সাধারণ মানুষের দেশপ্রেমবোধ ও আবেগকে পুঁজি করে লড়াইয়ে নেমেছিল। যে লড়াইয়ে স্বৈরশক্তির প্রশাসনভিত্তিক ক্ষমতায়নের হাতিয়ার গণশক্তির প্রবল প্রতিরোধের মুখে ব্যর্থ হয়। আদতে উভয় গোষ্ঠী একই তন্ত্রের অনুসারী, ক্ষমতাতন্ত্র। যার প্রমাণ, সেদিনের যে বিজয়ী গোষ্ঠী, পর্যায়ক্রমে উভয়ের আমলেই ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া।

এভাবেই লেখা হচ্ছে- দেশের মানুষের সেবা ও নিরাপত্তার লক্ষ্যে যে প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিকভাবে সেই প্রশাসনকে হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহারের দীর্ঘ ইতিহাস। অপসংস্কৃতির আদর্শ ও নীতিবিচ্যুত চরিত্রই এজন্য দায়ী। দীর্ঘকালের চর্চায় যার অনেকটাই এখন প্রশাসনের চরিত্রেও পরিলক্ষিত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *