টেন্ডার মূল্যায়নের তথ্য ফাঁসে দায়ী চসিকের ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারী

বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালককে মারধর

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রকল্প পরিচালক মো. গোলাম ইয়াজদানী যখন ঠিকাদারদের হাতে মারধরের শিকার হচ্ছিলেন, তখন পাশের কক্ষেই ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. আকবর আলী। এত বড় ঘটনা ঘটলেও তিনি সহকর্মীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি। শুধু তিনি নন, সিটি করপোরেশনের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী এগিয়ে আসেননি। 

অন্যদিকে টেন্ডার কার্যক্রম সম্পন্নের আগে টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিষয় ফাঁস হওয়ায় সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলীসহ ছয়জন দায়ী। প্রকল্প পরিচালককে মারধরের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। 

বুধবার রাতে সিটি মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর হাতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কমিটি। তিন পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ১০ ঠিকাদারকে ঘটনার জন্য অভিযুক্ত করা হয়। ঘটনার কারণ হিসেবে কাজ না পাওয়া থেকে ঠিকাদারদের ক্ষোভ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে ঠিকাদারদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণসহ ১০ দফা সুপারিশ করা হয়েছে। 

এ প্রসঙ্গে তদন্ত কমিটি প্রধান চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা সৈয়দ শামসুল তাবরীজ সমকালকে বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন মেয়রকে দিয়েছি। তিনি পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। পাঁচটি কার্যপরিধি নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী তদন্তে যা পেয়েছি তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি।’

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়কসমূহ উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের ২২০ কোটি ৩৭ লটের দরপত্র আহ্বান করা হয়। নির্বাচিত ঠিকাদারদের কার্যাদেশ দেওয়ার আগেই ফাঁস হয়ে যায়- তিনটি প্রতিষ্ঠান পাচ্ছে ৩৪টি লটের কাজ। ৩৭টি লটের কাজ পেতে প্রায় এক হাজার ঠিকাদার অংশ নিয়েছিলেন। তদন্ত কমিটি সিটি করপোরেশনের ২৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর সাক্ষর গ্রহণ করেছেন। তাতে প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কমিটিকে জানিয়েছেন, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির চূড়ান্ত অনুমোদনের আগেই ঠিকাদাররা এই গোপনীয় তথ্য জানার কোনো সুযোগ নেই- যদি প্রকৌশল দপ্তর থেকে এই গোপনীয় তথ্য কেউ সরবরাহ না করে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এজন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালক, উপ-প্রকল্প পরিচালক, প্রধান প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, উপ সহকারী প্রকৌশলী, কম্পিউটার অপারেটর কাম অফিস সহকারী সম্পূর্ণরূপে দায়বদ্ধ।

এগিয়ে আসেননি সহকর্মীরা

প্রকল্প পরিচালককে মারধরের ঘটনা চলাকালে সিটি করপোরেশন ভবনে উপস্থিত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীই ঘটনাস্থলে এগিয়ে আসেননি বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আকবর আলী পাশের কক্ষে থাকলেও তিনি ঘটনা জানতেন না বলে তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন। পরবর্তীতে নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থলের দিকে আসেননি বলে জানান। এছাড়া ঘটনার পর প্রকল্পটির একমাত্র সহকারী প্রকৌশলী তাসমিয়া তাহসিন তদন্ত কমিটির শুনানি চলাকালে পুরো সপ্তাহজুড়ে ছুটিতে থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছে কমিটি। তবে তাসমিয়া তাহসিন সমকালকে জানান, তিনি ঘটনার পর নয়, গত ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে পারিবারিক অনুষ্ঠান থাকায় ছুটি নিয়ে শ্বশুরবাড়ি গোপালগঞ্জে ছিলেন। তাই ফোনে শুনানিতে অংশ নিয়েছেন।

দায়ী ১০ ঠিকাদার

এ ঘটনায় যে ১০ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা হয়েছে সেগুলো হলো- মেসার্স মাহমুদা বিল্ডার্স ও এস জে ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারি মুহাম্মদ সাহাব উদ্দিন, মেসার্স বাংলাদেশ ট্রেডার্সের সঞ্জয় ভৌমিক কংকন, মেসার্স মাসুদ এন্টারপ্রাইজের মোহাম্মদ ফেরদৌস, মেসার্স জয় ট্রেডার্সের সুভাষ মজুমদার, মেসার্স খান করপোরেশনের হাবিব উল্লাহ খান, মেসার্স নাজিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের নাজিম, মেসার্স রাকিব এন্টারপ্রাইজের মো. নাজমুল হোসেন, ইফতেখার এন্ড ব্রাদার্সের মো. ইউসুফ, জ্যোতি এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স দীপা এন্টারপ্রাইজের আশীষ কুমার দে ও হ্যাপী দে, মেসার্স তানজিল এন্টারপ্রাইজের আলমগীর। ইতিমধ্যে এসব ঠিকাদারদের বিরুদ্ধে মামলা ও তাদের কালোতালিকাভুক্ত করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন।

ঘটনার কারণ

তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকল্প পরিচালককে মারধর ও তার কক্ষ ভাঙচুরের ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকল্পটির যতগুলো টেন্ডার হয়েছে তার কোনোটির কাজ না পাওয়া এবং টেন্ডারের জামানত হিসেবে পাওয়া তাৎক্ষণিক ফেরত না পাওয়া। এছাড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একাধিক কাজ পাওয়ায় ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিলে বলে উল্লেখ করা হয়।

চসিকে অনাকাঙ্খিত ঘটনা রোধে পদক্ষেপ

ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা রোধে প্রকল্প গ্রহণ, প্রাক্কলন ও টেন্ডার কার্যক্রমের প্রত্যেক ফাইল প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে মেয়রের অনুমোদন, টেন্ডার চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনো তথ্য যেন ফাঁস হতে না পারে সেজন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যত্নবান হওয়া, প্রত্যেক টেন্ডার প্রক্রিয়ায় গোপনীয়তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ও পদবী উল্লেখ করে লিখিতভাবে তালিকা করে দায়বদ্ধতার দায়িত্ব দেওয়া ও সম্পূর্ণ টেন্ডার প্রক্রিয়া চলাকালে ঠিকাদার ও তাদের লোকজনকে অফিস এলাকায় অপ্রয়োজনীয় অনুপ্রবেশ সংরক্ষিত করা।

চসিকের নিরাপত্তা জোরদারে ১০ সুপারিশ

প্রত্যক কর্মকর্তার রুমে ইমার্জেন্সি অ্যালার্ম সুইচ স্থাপন, সিটি করপোরেশনের প্রধান ফটকে প্রবেশকারীদের নাম-ঠিকানা লিপিবদ্ধ করা, প্রত্যেক ফ্লোরে দুইজন নিরাপত্তাকর্মী রাখা, সিটি করপোরেশনের সেবাগ্রহীতাদের প্রবেশে সময়সীমা নির্ধারণ, টেন্ডারের তথ্য ফাঁস হওয়া রোধে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যত্নবান হওয়া, অফিস চলাকালে অফিসের সামনের রাস্তায় বহিরাগতদের চলাচল নিয়ন্ত্রণে চেকপোস্ট বসানো, চসিকের নিরাপত্তা বিভাগে কর্মরত কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, টেন্ডার প্রক্রিয়া চলাকালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ও সহকর্মীদের সঙ্গে পারস্পরিক সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বৃদ্ধি করা।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ জানুয়ারি বিকালে নগরের টাইগারপাসে সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী প্রধান কার্যালয়ে নিজের দপ্তরে প্রকল্প পরিচালক মো. গোলাম ইয়াজদানীকে মারধর করেন ঠিকাদাররা। এ সময় তার কক্ষ ভাঙচুর করা হয়। এ ঘটনায় ১১ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছে সিটি করপোরেশন। এ মামলায় প্রধান আসামিসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলাটি নগর গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *