হিন্দি সিনেমার আমদানি নিয়ে বাগ্‌যুদ্ধ

বিনোদন

বাংলাদেশে ভারতীয় সিনেমা আমদানির বিষয়ে কথার যুদ্ধ যেন থামছেই না। শাহরুখ অভিনীত বলিউডের আলোচিত ‘পাঠান’ সিনেমা মুক্তি ইস্যুতে আলোচনার পারদ যেন আরও ঊর্ধ্বমুখী। চলচ্চিত্রাঙ্গনের মানুষের চায়ের আড্ডার প্রধান অনুষঙ্গ এদেশে বিদেশি সিনেমার মুক্তি। দেশীয় প্রেক্ষাগৃহে সাফটা চুক্তির আওতায় ‘পাঠান’ সিনেমাটি বাংলাদেশে মুক্তি দিতে চাচ্ছে নির্মাতা অনন্য মামুনের একটি প্রতিষ্ঠান।

বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকে ইতিবাচক সাড়া এসেছে। তবে এখন পর্যন্ত ‘পাঠান’ মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেনি মন্ত্রণালয়। চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন বলেন, দর্শকদের আগ্রহ দেখতে আপাতত পরীক্ষামূলক সিনেমা আমদানির পক্ষে সমর্থন দিয়েছি। তাঁর মতে, তাতে করে সিনেমা হলগুলো রক্ষা হবে। তিনি আরও বলেন, ‘সিনেমার অভাবে দেশে এখন প্রায় ৯০ শতাংশ হল বন্ধ হয়ে গেছে। তাই হল বাঁচাতে এমন সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছি।’

অন্যদিকে চলচ্চিত্র অভিনেতা ডিপজল চলচ্চিত্রকে ধ্বংস করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে– অভিযোগ করে বলেন, ‘একটি চক্র চলচ্চিত্রকে ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছে। আমাদের দেশে ভালো সিনেমা তৈরি হচ্ছে। কয়েক মাস আগে থেকে সিনেমা হলে দর্শক ফিরছে। গল্প ভালো হলে অবশ্যই দর্শক হলে ফিরবে। আগে যখন সিনেমায় অস্থিরতা ছিল, তখন আমরাই টেনে নিয়ে গেছি বাংলা সিনেমাকে। হিন্দি সিনেমা সমাধান নয়। এ ধরনের চিন্তা করা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক নয়। হিন্দি সিনেমা নয়, বাংলা সিনেমা দেখতে চায় এ দেশের মানুষ।’

তার মতে, হিন্দি সিনেমা মুক্তি দেওয়ার ফলে নেপালের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি বিলীন হয়ে গেছে। এতেই প্রমাণিত হয় আমদানি করা সিনেমায় নিজেদের শিল্প রক্ষা সম্ভব নয়। অভিনেতা ডিপজলের মতো সমর্থন করে জায়েদ খান বলেন, ‘বাংলাদেশে কোনো হিন্দি ছবি মুক্তি দিতে চাইলে ভারতে আমার ছবি, আমাদের সংস্কৃতির ছবি মুক্তি দিতে হবে। আর সেটা না হলে এ দেশে কোনোভাবেই হিন্দি সিনেমার মুক্তির পক্ষে নই আমি।’

দেশে হিন্দি সিনেমা আমদানির শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছেন নির্মাতা দেলোয়ার জাহান ঝন্টু। তিনি রাস্তায়ও নেমেছেন। টিএসসিতে হিন্দি সিনেমা আমদানি বন্ধের দাবিতে মানববন্ধনও করেছেন। টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে হিন্দি সিনেমা আমদানির প্রতিবাদের ওই মানববন্ধনে বিভিন্ন দাবি উত্থাপন করেন বেশ কয়েকজন নির্মাতা ও কলাকুশলীরা।  

দেলোয়ার জাহান ঝন্টু বলেন, “হল মালিকরা হল ব্যবসায়ী। তাঁরা আমাদের সিনেমা নামিয়ে দিয়ে ‘পাঠান’ চালাতে চান। ‘পাঠান’ ৮০ শতাংশ উর্দু ভাষার সিনেমা। সেই সিনেমা আমাদের দেশে চলবে কেন? এই সিনেমা যাঁরা আনতে চাচ্ছেন তাঁরা রাজাকারের থেকেও খারাপ। এই ৮০ শতাংশ উর্দু ভাষার সিনেমা আমাদের দেশে চলবে না।”

আগামীকাল ৩ মার্চ শুক্রবার মুক্তির জন্য প্রস্তুত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক দুই সিনেমা খিজির হায়াত খানের ‘ওরা ৭ জন’ এবং ফাখরুল আরেফিন খানের ‘জে কে ১৯৭১’। শোনা যাচ্ছে, একই দিনে দেশে মুক্তি পেতে পারে শাহরুখ খান অভিনীত হিন্দি সিনেমা ‘পাঠান’। এ কারণেই হল বুকিং পেতে বেগ পেতে হচ্ছে দেশীয় দুই ছবির নির্মাতাদের।

পরিচালক খিজির হায়াত খান বলেন, “পাঠান’ মুক্তি পেলে স্বাভাবিকভাবেই হল মালিকরা চাইবেন ওই সিনেমাটি মুক্তি দিতে। স্বাধীনতার মাস মার্চে যেন হিন্দি ছবি মুক্তি না পায়, সে জন্য এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘খোলা বার্তা’ শেয়ার করেছি।”

 এদিকে ময়মনসিংহের ছায়াবাণী সিনেমা হলে ৩ মার্চ ‘পাঠান’ মুক্তি পাচ্ছে– এমন ঘোষণা দিয়ে বাংলায় ছাপানো পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে। ওই সিনেমা হলের ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম বলেন, “মুক্তির আগে প্রচারণার জন্য নিজেদের উদ্যোগেই পোস্টার লাগিয়েছি। প্রতিদিনই দর্শক এসে জানতে চায় ‘পাঠান’ কত তারিখ মুক্তি পাবে। ৩ মার্চ মুক্তি পাবে এই খবর জেনেছি। ইতিবাচক সংকেত পেয়ে পোস্টার লাগিয়ে রেখেছি।”

এখনও বাংলাদেশের সেন্সর বোর্ডে জমা পড়েনি ‘পাঠান’; ছাড়পত্র পাওয়ার আগে এ ধরনের প্রচারণা যুক্তিযুক্ত নয় বলে জানিয়েছেন বরেণ্য নির্মাতা কাজী হায়াৎ। এদিকে ‘পাঠান’ নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত হল মালিকরা। চলচ্চিত্রের ১৯ সংগঠনের নেতাদের ভরকেন্দ্র ‘সম্মিলিত চলচ্চিত্র পরিষদ’-এর সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাছান মাহমুদের বৈঠকের পর সপ্তাহ পেরোলেও এখনও হিন্দি সিনেমা মুক্তির ব্যাপারে মন্ত্রণালয় থেকে অফিশিয়াল চিঠি আসেনি। এতে হল মালিকদের একাংশ হতাশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পরিচালক সমিতির একজন নেতা জানিয়েছেন, ৩ মার্চ থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সিনেমা হল বন্ধের দাবি তুলেছে হল মালিকদের একাংশ।

‘পাঠান’ না আসা পর্যন্ত হল চালু করবে না তাঁরা। গত সোমবার বিষয়টি নিয়ে হল মালিকদের এক বৈঠক হয়েছে। সেখােন শেষ পর্যন্ত অনির্দিষ্ট কালের জন্য হল বন্ধের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আগামী শনিবার আবারও তারা আলোচনায় বসবেন। মিয়া আলাউদ্দিন বলেন, ‘চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে হলে হিন্দি সিনেমা আসা উচিত। আপৎকালীন সময়ের জন্য প্রথম বছর ১০টি ও দ্বিতীয় বছর ৮টি সিনেমা আনার ব্যাপারে চলচ্চিত্রের ১৯ সংগঠন মিলে মত দিয়েছে। বিদেশি সিনেমা আনার বিরুদ্ধে যাঁরা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, তাঁরা সব সময়ই করবেন। চাল, চিনি, তেলের অভাব পড়লে তা আনতে পারি, তাহলে চলচ্চিত্র আনতে পারব না কেন? হিন্দি সিনেমা এলে হল মালিকরা কিছুটা হলেও লাভের মুখ দেখেবন।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *