আন্তর্জাতিক অর্থায়নে টান

বাংলাদেশ

খরচ মেটাতে রোহিঙ্গাদেরও অংশগ্রহণ চায় জাতিসংঘ

খাদ্য সংকটে রয়েছেন নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। এ মাসের শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক খাদ্য সহযোগিতা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে পুষ্টির যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা যেন নিজেরাই জোগাড় করে নেয় এমনটিই চাচ্ছে জাতিসংঘ। তবে এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে দূরত্ব মিটিয়ে সংহতি অর্জনের যে চেষ্টা রয়েছে, তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছে সরকার। সার্বিকভাবে বিপর্যয়কর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

রোহিঙ্গারা আগে প্রতি মাসে ১২ ডলার করে খাদ্য সহযোগিতা পেত। গত ১ মার্চ থেকে ১০ ডলার দেওয়া শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি থেকে রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহযোগিতাটি আসত। সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মানবিক সংকট সৃষ্টি হওয়ায় প্রচলিত অর্থায়নগুলো কমিয়ে নিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম ইঙ্গিত দিয়েছে, এ মাসে রোহিঙ্গা রেশন ১৭ শতাংশ কমিয়ে দেবে। এপ্রিলের মধ্যে নতুন করে অর্থায়ন না হলে রেশন আরও কাটছাঁট হবে। এ পরিস্থিতি এড়াতে ১২ কোটি ডলারের অর্থায়ন দরকার বলছে জাতিসংঘ।

এদিকে, সহায়তা তহবিল কমে আসায় বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার কর্মসূচিও সংক্ষিপ্ত করেছে। এখানে যেসব রোহিঙ্গা কাজ করতেন, তাঁরাও বেকার হয়ে পড়েছেন। শিক্ষিত রোহিঙ্গারা কেউ কেউ জাতিসংঘের পরিচালিত শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে অর্থ উপার্জন করছেন। আর কিছু দক্ষ রোহিঙ্গারা পাটজাত দ্রব্য উৎপাদনের মাধ্যমে আয় করছেন। অনেকে ক্যাম্পের মধ্যে দোকানদারি করে জীবিকা অর্জনের চেষ্টা চালাচ্ছেন। তবে তাঁদের সংখ্যা খুবই কম। যুব রোহিঙ্গাদের একটি বড় অংশ বেকার অবস্থায় রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের অর্থায়ন কমে আসা চ্যালেঞ্জিং বলে জানিয়েছেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশের হেড অব অপারেশনস ইয়োকো আকাসাকা। তিনি বলেন, সামনের দিনগুলোতে রোহিঙ্গা অর্থায়ন আরও কমে আসার শঙ্কা রয়েছে। ফলে এখন আমাদের কর্মসূচি নিতে হবে সাশ্রয়ী ও অগ্রাধিকারমূলক। এ নিয়ে আমরা কিছু কাজ করেছি। আগে একটি খাতে ১০০ সংস্থা কাজ করত। সেটির পরিবর্তে এখন আমরা একটি বিশেষায়িত সংস্থা চাচ্ছি সেই খাতটিতে। এটির মাধ্যমে আমরা সাশ্রয়ী হয়ে উঠছি।

তহবিল কমে আসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু মানবিক সহায়তা দিয়ে সব সংকটের মোকাবিলা সম্ভব নয়। এ জন্য আমাদের ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। গত বছর সরকার দক্ষতা ও জীবিকা উপার্জন এবং স্বেচ্ছাসেবী-সংক্রান্ত দুটি কর্মসূচি নিয়েছে। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গারা উৎপাদন, আয় করা ও জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে।
চলতি বছরে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা তাঁদের বাংলাদেশ সফরে রোহিঙ্গা বিষয়ে তাঁদের প্রতিশ্রুতির কথা একাধিকবার গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। তাহলে ইউএসএআইডির তহবিল কমে আসা নিয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, প্রতিশ্রুতি দুই রকমের হয়ে থাকে– একটি আর্থিক, আরেকটি রাজনৈতিক। তবে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির জায়গায় তাদের কোনো ঘাটতি নেই। আর্থিক প্রতিশ্রুতির জায়গাতে তারা সরে এসেছে বলা যাবে না। কারণ তারা তহবিল সরিয়ে নেয়নি, তারা কিছুটা কমিয়ে নিয়ে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র আগেই জানিয়েছিল যে, তারা তহবিল কমিয়ে আনবে। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যও কমিয়ে এনেছে।

তহবিল কমে আসার প্রভাব জানতে চাইলে তিনি বলেন, একজনের খাবারের বাজেট কমে এলে তা পুষ্টিতে প্রভাব পড়বে। এমনিতেই রোহিঙ্গারা অপুষ্টিতে ভুগছে। সেই সঙ্গে এসব রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বের হয়ে কাজ খুঁজবে, যা বাংলাদেশের জন্য সংকট তৈরি হবে। রোহিঙ্গা ও স্থানীয়দের মধ্যে দূরত্ব মিটিয়ে সংহতি অর্জনের যে চেষ্টা তা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সরকারি ও জাতিসংঘের হিসাব মতে, বর্তমানে ক্যাম্পে ৯ লাখ ৫৪ হাজার ৭০৭ জন রোহিঙ্গা রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যার মধ্যে ৪৪ শতাংশ ১৮ থেকে ৫৯ বয়সী। তবে বিশ্বের অন্যতম ঘনবসিতপূর্ণ শরণার্থী ক্যাম্প কক্সবাজারে যুবক রোহিঙ্গাদের খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। তারা কর্মের সন্ধানে ক্যাম্প ছেড়ে বেরিয়ে গেছে।

রোহিঙ্গা ও স্থানীয়রা জানায়, বেশিরভাগ যুবক রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে রয়েছে। স্থানীয় হাট-বাজারগুলোতে প্রতি ৫ জনের ৪ জনই রোহিঙ্গা। বর্তমানে রোহিঙ্গারা নিজ পুষ্টি নিজেই জোগাড় করার চেষ্টায় রয়েছে। দৈনিক চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন রকম কর্মক্ষেত্রে যুক্ত তারা। আবার অনেকে সহজ আয়ের জন্য অপরাধমূলক কার্যক্রম মাদক চোরাচালান, মানব পাচার, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে, যা রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে আরও ভীতিকর স্থানে পরিণত করেছে।

রোহিঙ্গা সংকটের শুরুতে দিনরাত উন্নয়নকর্মীরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করতে পারতেন। তবে দিন দিন এ পরিধি ছোট হয়ে আসছে। বছরখানেক আগেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে উন্নয়নকর্মীরা ফেরত আসতেন। সেই সময়সীমা বর্তমানে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে।

জাতিসংঘ বলছে, খাদ্য সহায়তা কমে গেলে রোহিঙ্গারা আরও মরিয়া হয়ে উঠবে, যা ক্যাম্পগুলোতে আরও সহিংসতা এবং অস্থিরতা বাড়াতে পারে। এটি একটি মানবাধিকার রক্ষার উদ্বেগের দিকে নিয়ে যেতে পারে। মানব পাচারের উচ্চতর ঝুঁকি, বিশেষ করে শিশু ও মেয়েদের নিয়ে বিপজ্জনকভাবে সমুদ্র দিয়ে নৌকায় বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *