ইমরান খান ও আদালতের খেলা

মতামত

টুইটারে ‘ইমরান খান নতুন প্রভাবশালী’ শিরোনামে একটি মন্তব্য আমার নজর কেড়েছে। কে এই টুইট করেছেন, তাঁর নাম আমি স্মরণ করতে পারছি না। যা হোক, গত এপ্রিলে জাতীয় পরিষদে অনাস্থা ভোটে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। উল্লিখিত টুইটটি বিপরীতার্থক মনে হচ্ছে। কারণ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী, যিনি প্রভাবশালীদের ক্রোধের শিকার, তিনি কীভাবে নিজেই ‘প্রভাবশালী’ হতে পারেন? তা ছাড়া ফাওয়াদ চৌধুরীর মতো পিটিআই নেতারা প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীর অরাজনৈতিক হয়ে ওঠার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

এর অর্থ– ওই টুইটের দাবি অনর্থক ছিল? এই মন্তব্য কোথা থেকে এসেছে, তা বোঝার জন্য গত ৪৫ বছরে দুটি প্রধান সংস্থা, সামরিক এবং বিচার বিভাগের ভূমিকা পরীক্ষা করা দরকার। বেঞ্চ কীভাবে গঠন করা হয়, তা নিয়ে ‘মাস্টার অব দ্য রোস্টার’ তথা প্রধান বিচারপতির ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে ভুল ধারণা তৈরি করা হচ্ছে। আপাতত ১৯৭৭ সালে জেনারেল জিয়াউল হকের অভ্যুত্থান এবং তার পর জেনারেল পারভেজ মোশাররফের ১৯৯৯ সালের সামরিক ক্ষমতা গ্রহণের ঘটনায় যাওয়া যাক। উভয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ ঘটনা হলো, উভয়কেই দেশের সর্বোচ্চ আদালত অনুমোদন দিয়েছেন। পরে সামরিক শাসককে এমনকি সংবিধান সংশোধনের অধিকারও দেওয়া হয়েছিল।

আমি নিশ্চিত, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থই জ্যেষ্ঠ বিচারকদের দখলদারদের উদ্ধারে অনুপ্রাণিত করেছে। সামরিক প্রধানের মতো যাঁরা সংবিধান রক্ষার শপথও নিয়েছিলেন। এদিকে জেনারেল জিয়া একটি সাক্ষাৎকারে সংবিধানকে একটি মূল্যহীন কাগজ বলেছিলেন; বিচারকরা তখন বলেছিলেন, তিনি সঠিক। যখন তাঁরা জিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপকে সমর্থন করেছিলেন, তখন তাঁরা সংবিধানকে কার্যত ছিন্নভিন্ন করে ফেলেছিলেন। যথেষ্ট খারাপ উদাহরণ হলো, তাঁরা একটি অভ্যুত্থানকে সমর্থনও করেছিেলন। কারণ ক্ষমতা বন্দুকের নল থেকে প্রবাহিত হয়। এমনকি তাঁরা আনন্দের সঙ্গে একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ফাঁসির আদেশও তৈরি করেছিলেন। মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পক্ষে থাকা একজন বিচারপতি পরে দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, এ সিদ্ধান্তটি আইনের নয়; জিয়ার চাপে তৈরি করা হয়।

১৯৮৮ সালে যখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা হয়েছিল, তখন সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীদের ক্ষমতাচ্যুত করা এবং পরবর্তী ৯ বছরে প্রায় তিনবার সংসদ ভেঙে দেওয়াকে সমর্থন করেন। কুখ্যাত এই সামরিক-সমর্থিত ৫৮-২(বি) অনুচ্ছেদ জেনারেল জিয়া সংবিধানে সন্নিবেশিত করেছেন। এমনকি পারভেজ মোশাররফের অভ্যুত্থানকেও সুপ্রিম কোর্ট আন্তরিকভাবে সমর্থন করেছিলেন। তাঁকে সংবিধান সংশোধন করার অধিকারও দেওয়া হয়েছিল এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তিন বছর সময় দেওয়া হয়েছিল। সংসদ পুনরুদ্ধার হলেও তার ক্ষমতায়ন ইউনিফর্মধারী প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় সেভাবে হয়নি। জিজ্ঞাসা করতে পারেন, কেন আমি এসব স্মরণ করছি? কারণ, প্রত্যেকের অন্তত আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাস সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার। তা ছাড়া এই উপলব্ধিটি তুলে ধরা– সামরিক বাহিনী যতটা সম্ভব অরাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে; কিন্তু উচ্চতর আদালত হয়তো সেই পথ অনুসরণ করেননি।

ঘড়ির কাঁটায় পাঁচ বছরের বেশি পেছনে ঘুরিয়ে দেখার দরকার নেই। দেখুন, কীভাবে সাবেক সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য পরপর দু’জন সাবেক প্রধান বিচারপতির অধীনে উচ্চতর আদালতের রায়গুলোতেও তার প্রভাব বিস্তার করা হয়েছে। এর ফলে অস্থিতিশীলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলো এবং সমাজে বিভক্তি আরও বাড়ল। গভীর বিভাজন, মেরূকরণের প্রভাবে অর্থনৈতিক দুর্দশা একটি প্রকাশ মাত্র। গত বছরের সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ফ্লোর-ক্রসিং ধারাটি এভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল, যাকে অনেক সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও আইনজীবী বলেছিলেন, এটি সংবিধান পুনর্লিখনের সমতুল্য।

মামলার শুনানির জন্য বেঞ্চগুলো কীভাবে গঠন করা হবে এবং কারা সেগুলোতে বসবেন, সে প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতির কর্তৃত্ব নিয়েও দ্বিধা তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাংবিধানিক/রাজনৈতিক আমদানির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিচারকদের দল ৭০টি মামলার শুনানি করেছেন; যেখানে একই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের অন্য বিচারক মাত্র ৯টি শুনানি করেছেন। এটি হয়তো অবৈধ নয় কিংবা বিচারকের আইনি দক্ষতাও থাকতে পারে। তার পরও যাতে সন্দেহের সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন। সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ প্রাসঙ্গিক। সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে, মুখ্যমন্ত্রী কর্তৃক পার্লামেন্ট ভেঙে গেলে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। পাকিস্তান নির্বাচন কমিশনের তারিখ ঘোষণায় বিলম্ব হওয়ায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা গ্রহণ করেন সুপ্রিম কোর্ট। কিন্তু সাংবিধানিক গুরুত্বের বিষয় হওয়া সব সদস্যের সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আদালত গঠিত হয়নি। বিলুপ্তির পর নির্বাচনের সময়সীমা কত, তা সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। তার পরও আমি সন্দেহ করি, পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, সেখানে সিদ্ধান্ত ভিন্ন হবে। এ কারণেই ধারণা তৈরি করা হচ্ছে, আদালতের মামলায় হাজির না হয়ে দ্রুত জামিন পাওয়াসহ সব ধরনের সুবিধা পাওয়ায় ইমরান খানকে প্রভাবশালী বলে মনে হচ্ছে। এটি শুধু একটি মত হতে পারে, কিন্তু এটি সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *