সিনেমার পোস্টারে ধূমপানের দৃশ্য, নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না নির্মাতারা

বিনোদন

সিনেমা প্রচারের অন্যতম মাধ্যম পোস্টার। দর্শকের কাছে সিনেমাকে আকর্ষণীয় করতে বড় ভূমিকা রাখে পোস্টার। তবে সিনেমার এসব পোস্টার তৈরিতে মেনে চলতে হয় কিছু বিধিনিষেধ। অথচ সেই সব নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নির্মাতা-প্রযোজকেরা দেদার ব্যবহার করছেন ধূমপানের দৃশ্য। সাম্প্রতিক সময়ের বেশির ভাগ সিনেমার ক্ষেত্রেই এমনটা দেখা গেছে। দর্শকের সামনে নায়ককে মারাদাঙ্গা অ্যাকশনে কিংবা ভিন্ন লুকে উপস্থাপনের জন্য অনেক পোস্টারেই দেখা যাচ্ছে ধূমপানের দৃশ্য।

এ মাসের শুরুতেই শাকিব খানকে নিয়ে যৌথভাবে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চরকি, আলফা আই ও ভারতের এসভিএফ। ‘তুফান’ নামের সিনেমাটি বানাবেন রায়হান রাফী। সেই অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয় সিনেমার ফার্স্টলুক পোস্টার। সেখানে দেখা যাচ্ছে দুই হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ও ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন শাকিব খান। মুহূর্তেই ভাইরাল হয় পোস্টারটি।

এ ছাড়া কয়েক দিন ধরে ফেসবুকে ট্রেন্ডে আছে মেহেদী হাসান পরিচালিত ‘শেষ বাজি’ সিনেমার পোস্টার। বিজয় দিবসের রাতে প্রকাশিত ফার্স্টলুক পোস্টারে দেখা যাচ্ছে, সিনেমার নায়ক সাইমন সাদিকের চোখে কালো সানগ্লাস, ঠোঁটে ধরা সিগারেটে আগুন জ্বালাচ্ছেন। প্রকাশের পর থেকেই ফেসবুকে সয়লাব শেষ বাজি সিনেমার পোস্টারটি। দুটি পোস্টারের কোনোটিতেই ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা সংবিধিবদ্ধ কোনো সতর্কীকরণ বার্তা পাওয়া যায়নি।

গত রোজার ঈদে মুক্তি পাওয়া সিনেমার পোস্টারেও দেখা গেছে ধূমপানের দৃশ্য। হিমেল আশরাফের ‘প্রিয়তমা’ সিনেমার পোস্টারে শাকিব খানের ঠোঁটে ছিল জ্বলন্ত সিগারেট। সেই সময়ে মুক্তি পাওয়া প্রিয়তমা ও রায়হান রাফীর ‘সুড়ঙ্গ’ সিনেমায় ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন লঙ্ঘন হয়েছে বলে নিন্দা জানিয়ে লিখিত বিবৃতি দেয় বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোট। এর আগে ২০২২ সালে কোরবানির ঈদে মুক্তি পাওয়া রায়হান রাফীর ‘পরাণ’ সিনেমার দুটি পোস্টারে শরিফুল রাজের ঠোঁটে দেখা গেছে জ্বলন্ত সিগারেট। একই রকম ধূমপানের দৃশ্য পাওয়া গেছে সরকারি অনুদানে নির্মিত অনম বিশ্বাস পরিচালিত ‘দেবী’ সিনেমার পোস্টারেও।

২০০৫ সালের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত বা লভ্য ও প্রচারিত, বিদেশে প্রস্তুতকৃত কোনো সিনেমা, নাটক বা প্রামাণ্য চিত্রে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের দৃশ্য টেলিভিশন, রেডিও, ইন্টারনেট, মঞ্চ অনুষ্ঠান বা অন্য কোনো গণমাধ্যমে প্রচার, প্রদর্শন বা বর্ণনা করবেন না বা করাবেন না। তবে শর্ত থাকে যে, কোনো সিনেমার কাহিনির প্রয়োজনে অত্যাবশ্যক হলে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার দৃশ্য রয়েছে এমন কোনো সিনেমা প্রদর্শনকালে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে লিখিত সতর্কবাণী, বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে, পর্দায় প্রদর্শনপূর্বক তা প্রদর্শন করা যাবে।

সেন্সর বোর্ড সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিনেমার পোস্টারে তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বা এর ব্যবহার দেখানো যাবে না। এ ছাড়া সিনেমার পোস্টার প্রকাশের সময় সেন্সর বোর্ড থেকে অনুমতি নিতে হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ের সিনেমাগুলোর পোস্টার প্রকাশে থোড়াই কেয়ার করা হচ্ছে এসব নিয়ম। এমনকি সেন্সর বোর্ড থেকেও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার খবর শোনা যায়নি।

এ বিষয়ে কথা হয় সুড়ঙ্গ ও তুফান সিনেমার অন্যতম প্রযোজক শাহরিয়ার শাকিলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সিনেমায় ধূমপানের দৃশ্য থাকলে আমরা বিধিবদ্ধ সতর্ককরণ বাণী দিয়ে থাকি। তবে, ডিজিটাল পোস্টারের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিধিনিষেধ আছে বলে আমার জানা নেই। সিনেমার অফিশিয়াল পোস্টারের বেলায় সেন্সর বোর্ডের পারমিশন নিতে হয়, সেটা আমরা নিয়েই করি।’

নির্মাতা রায়হান রাফী বলেন, ‘শুধু পোস্টার নয়, সিনেমার ট্রেলারের জন্যও সেন্সর বোর্ডের অনুমোদন নিতে হয়। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত পোস্টারে চরিত্রের প্রয়োজনে ধুমপানের দৃশ্য আসতে পারে, সারা পৃথিবীর সিনেমার পোস্টারের বেলাতে আমরা সেটাই দেখি। তবে তুফান সিনেমার প্রচারে দেয়ালে বা সিনেমা হলে ব্যবহারের জন্য যে অফিশিয়াল পোস্টার সেটা আমরা অনুমোদন নিয়েই প্রকাশ করব।’ বাংলাদেশ তামাকবিরোধী জোটের বিবৃতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এমন কোনো বিবৃতি আসেনি।’

এ প্রসঙ্গে প্রযোজক সমিতির নেতা ও সেন্সর বোর্ডের সদস্য খোরশেদ আলম খসরু বলেন, ‘সিনেমার পোস্টারে কোনোভাবেই ধূমপানের দৃশ্য থাকার কথা নয়। এমন দৃশ্য থাকলে সেন্সর বোর্ড থেকে অনুমতি দেওয়া হয় না। যদি এমন কোনো পোস্টার কেউ প্রকাশ করে থাকেন তাহলে সেন্সর বোর্ডের অনুমতি না নিয়েই করা হয়েছে। এমনটা যদি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতে আসে তাহলে সেই সিনেমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে সেন্সর বোর্ড।’

সেন্সর বোর্ডের উপপরিচালক মো. মঈনউদ্দীন বলেন, ‘ধূমপানের দৃশ্যসংবলিত কোনো পোস্টার সেন্সর বোর্ড থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় না। অনেক সময় আমাদের অনুমতি না নিয়েই পোস্টার তৈরি হয়। ওসব সিনেমার পোস্টারে সেন্সর বোর্ডের কোনো লোগো সংযুক্ত থাকে না। ধূমপানের দৃশ্যসহ কোনো পোস্টার যদি আমাদের নজরে পড়ে, তাহলে সেই সিনেমার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

যদি কেউ সেন্সর বোর্ডের অনুমতি না নিয়ে এ ধরনের পোস্টার ব্যবহার করেন তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে বলেও জানান মো. মঈনউদ্দীন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যদি কেউ এমনটা করে থাকেন তাহলে আমরা প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করি। তাঁর উত্তর যদি আমাদের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে না হয়, তাহলে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আছে। সেই সিনেমা নিষিদ্ধ করারও নিয়ম আছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *