পাকিস্তান থেকে মাদক নিয়ে ড্রোন উড়ে আসছে ভারতে, বিএসএফের অভিযোগ

আন্তর্জাতিক

ভারতীয় সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) কর্মকর্তাদের অভিযোগ, পাকিস্তান থেকে মাদক বহনকারী ড্রোন উড়ে আসছে ভারতে। পাকিস্তানের এই ‘নজিরবিহীন ড্রোন হুমকির’ কারণে পাঞ্জাব রাজ্যে মাদকের সংকট বাড়ছে। সে সঙ্গে দেখা দিয়েছে গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে এ খবর।

সীমান্ত রাজ্য পাঞ্জাবের বিএসএফ কর্মকর্তারা গার্ডিয়ানকে বলেছেন যে,২০২৩ সালে তারা এ পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে আসা ৯০টি ড্রোন আটক করেছে। এর আগে কখনোই পাকিস্তানের এত ড্রোন আটক করেনি তারা। প্রতি মাসে এই সংখ্যা বাড়ছে। তারা বলেন, বেশির ভাগ ড্রোনেই থাকে আফিম এবং হেরোইনের চালান। এসব মাদক আফগানিস্তান থেকে আসে বলে ধারণা তাদের। কিছু ক্ষেত্রে পিস্তল এবং চীনে তৈরি অ্যাসল্ট রাইফেলের মতো অস্ত্রও পাওয়া যায়।

‘হেক্সাকপ্টার’ নামে পরিচিত এই ড্রোনগুলোতে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা সংযুক্ত রয়েছে। ভারত সীমান্তের ১২ কিলোমিটার দূরেও এই ড্রোনকে শনাক্ত করা হয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছোট বস্তা বা কোকাকোলার বোতলে মাদক বহন করা হয়।

পারমাণবিক ক্ষমতাসম্পন্ন এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে রয়েছে বৈরিতার দীর্ঘ ইতিহাস। ভারত-পাকিস্তান একে অপরের বিরুদ্ধে চারটি যুদ্ধ করেছে। এ প্রেক্ষিতে, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভারতে পাকিস্তান থেকে প্রবেশ করা ড্রোনের সংখ্যা কেবল বাড়তে থাকাকে দেশের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বিএসএফ কর্মকর্তারা।

পাঞ্জাবে বিএসএফের ইন্সপেক্টর জেনারেল অতুল ফুলজেলে বলেন, ‘ভারতে বৈধ প্রবেশাধিকার নেই এমন যেকোনো কিছুই আমাদের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ। মাদক বহন ছাড়াও বেশ কয়েকবারই আমরা ড্রোন থেকে অস্ত্র ফেলতে দেখেছি। এতে ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে।’

পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে গত কয়েক দশক ধরেই চোরাচালান হয়ে আসছে। সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়েও চলছে এই তৎপরতা। উট, কবুতর থেকে শুরু করে মানব পাচারকারী এমনকি, ভূগর্ভস্থ পাইপের ভেতর দিয়েও মাদক এবং অন্যান্য পণ্যের চোরাচালান হচ্ছে এই সীমান্ত দিয়ে। ২০১৯ সালে পাঞ্জাবে প্রথম ড্রোন দেখা গিয়েছিল। বিএসএফ কর্মকর্তারা বলেন, এরপর থেকে ড্রোনগুলোই পাকিস্তান থেকে মাদক পাচারের প্রধান পদ্ধতি হয়ে উঠেছে। কিছু সপ্তাহে পাঁচ বা ছয়টি ড্রোনও আটকানো হয়েছে।

বিএসএফ বলেছে, ২০২৩ সালে পাঞ্জাব রাজ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ মাদক চোরাচালানের জন্য দায়ী ছিল ড্রোন। এতে ভারতের সীমান্ত রক্ষার চ্যালেঞ্জেও নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অতুল ফুলজেলে বলেন, ‘আমরা আগে কেবল মাটির দিকেই নজর রাখতাম। কিন্তু এই ড্রোন আমাদের কাছে নতুন এক চ্যালেঞ্জ। তবে আমাদের বিশ্বাস, আগামী বছরের মধ্যে এই হুমকিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হব।’

পাকিস্তান সীমান্ত রক্ষীদের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই বলে জানান এক বিএসএফ কর্মকর্তা। তবে যে মাত্রায় ভারতে ড্রোন প্রবেশ করছে তাতে সেই কর্মকর্তার ধারণা, পাকিস্তান সীমান্ত রক্ষীরা এসব দেখেও না দেখার ভান করছে। ড্রোন প্রযুক্তি সস্তা এবং কেনা সহজ হওয়ায় এই সমস্যা আরও গাঢ় হচ্ছে। বিএসএফ জানিয়েছে, তাদের আটক করা বেশির ভাগ ড্রোন চীনে তৈরি।

পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী প্রতিটি গ্রাম এবং রাজস্থানেও এই ঘটনা ঘটছে বলে জানান এক বিএসএফ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘ড্রোনের ওপর নজর রাখার জন্য আমাদের বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে। কখনো গুলি করে, কখনো ড্রোন বিধ্বংসী প্রযুক্তি ব্যবহার করি। এ ছাড়া, আমাদের হাতে এমন প্রযুক্তিও আছে যার মাধ্যমে ড্রোন নিক্ষিপ্ত হওয়ার স্থান শনাক্ত করা সম্ভব।’

তবে এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে বলে জানায় বিএসএফ। আগে শব্দ বা আলো থেকে ড্রোন শনাক্ত করা যেত। এখন প্রায় ১ কিলোমিটার উঁচু থেকে বা প্রায় নীরবে নিক্ষিপ্ত হওয়া ড্রোনকে শনাক্ত করা বেশ কঠিন বলে জানায় বিএসএফ। শীতের শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা বাড়ায় ড্রোন শনাক্ত করা আরও কঠিন হচ্ছে তাদের কাছে।

পাঞ্জাবের আটারির কাছে বসবাসকারী ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নির্মল সিং বলেন, ‘আমরা এতে খুব ভীত। আমাদের আশঙ্কা আছে যে, কেবল মাদক বহন করেই এই ড্রোনগুলো থামবে না। অস্ত্র বা বিস্ফোরক পাঠিয়ে এখানে সহজেই সমস্যা সৃষ্টি করা যাবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *