ফিরে দেখা-খরচে মধ্যবিত্তের কাটছাঁট, নিম্নবিত্তের নাভিশ্বাস

বাংলাদেশ

কেউ দেখেছে সমৃদ্ধির স্বপ্ন, কেউ শুধু চেয়েছে দুবেলা খেয়ে-পরে বাঁচতে—২০২৩ সালটা এভাবেই শুরু করেছিল দেশের মানুষ। কিন্তু ন্যূনতম এই চাওয়াগুলো পূরণও কঠিন করে তুলেছে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বমুখী বাজার। চলতি বছরের পুরো সময়টাই ‘কাল কী খাব’—সেই চিন্তা করে কেটেছে নিম্ন আয়ের মানুষের। আর মধ্যবিত্তদের বছর গেছে খরচের খাতায় কাটছাঁট করে।

বছরটা কেমন কেটেছে—জানতে কথা হয় পেশায় গৃহকর্মী পারুল আক্তারের সঙ্গে। তাঁর সোজাসাপ্টা উত্তর—‘মাছ-মাংস খাবার কথা চিন্তা করি না। শাকসবজিই তো জুটাইতি পারি না।’ পারুল আরও জানান, বছরখানেক আগেও পান্তা খেয়ে সকাল শুরু করতে পারতেন, এখন সেটুকুও জুটছে না। তাই সকাল-দুপুর মিলে একবেলা খান তিনি।

পেনশনের টাকায় বাজার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা জাকির হোসেনকে। পাঁচ সদস্যের পরিবার তাঁর। এক বছরের ব্যবধানে পরিবারের মাসিক খাওয়ার খরচ ৩৫-৪০ শতাংশ বেড়ে গেছে জানিয়ে জাকির হোসেন বলেন, ‘শাকসবজি কিনতেই সাত-আট শ টাকা শেষ। এমন অবস্থা জীবনে দেখি নাই। বন্যা নাই, ঝড় নাই তবু হঠাৎ করে একেকটা জিনিসের দাম বেড়ে যাচ্ছে। আমাদের আয় লিমিটেড। দামের সাথে পেরে উঠছি না।’

পারুল ও জাকির হোসেন দুজন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির দুই প্রতিনিধি। তাঁদের কথাতেই উঠে এসেছে সবার ‘নুন আনতে পান্তা ফুরানোর’ গল্প। নিত্যপণ্যের ভুতুড়ে মূল্যবৃদ্ধিতে বছরজুড়েই নাকাল হতে হয়েছে মানুষকে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, মসলা, ডিম, মাছ, মাংস, এমনকি আলুর মতো সবজির দামও অস্বাভাবিক বেড়েছে এ বছর। অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য এতটাই বেড়েছে যে সরকার ন্যূনতম মূল্য বেঁধে দিয়েও কোনো কোনো পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। বারবার সামনে এসেছে সিন্ডিকেটের কারসাজি, তাদের কাছে অসহায় ছিলেন স্বয়ং বাণিজ্যমন্ত্রীও।

বাজারে মাছের দাম এতটাই বেশি যে ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ কথাটা এখন রূপকথার গল্পের মতো শোনায়। মাছের বাজারে ঢুঁ মেরে ফেরত আসা মানুষ বিকল্প আমিষের খোঁজে মুরগি-ডিমের দোকানে যেত। এ বছর সেই সুযোগটাও বন্ধ করে দিতে বসেছিল সিন্ডিকেট। গত বছরের ডিসেম্বরে যে মুরগির দাম ছিল ১৫০-১৫৫ টাকা কেজি, এ বছর ফেব্রুয়ারিতে সেই মুরগির কেজি ২২০ টাকায় পৌঁছায়। আর এক ডজন ডিমের দাম ছোঁয় দেড় শর কোঠা। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত ডিম আমদানির অনুমতি দিতে হয়েছে সরকারকে। 

২০২৩ সালে গরুর মাংসের বাজারে ভেলকি দেখেছে দেশের মানুষ। মার্চ-এপ্রিলের দিকে মাংসের কেজি ৮০০ টাকায় পৌঁছায়। এতে কমে যায় ক্রেতাও। এ অবস্থায় ক্রেতা ফেরাতে সম্প্রতি রাজধানীতে ৬০০ টাকা কেজি মাংস বিক্রি শুরু করেন কয়েকজন বিক্রেতা। এতে নড়েচড়ে বসে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। পরে মাংস বিক্রেতা সমিতি ৬৫০ টাকায় গরুর মাংস বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয়। 

গত বছর ২০-২৫ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে প্রতি কেজি আলু। কিন্তু এবার আলুর দামে রেকর্ড হয়েছে। চাহিদা ও উৎপাদনের হিসাবে বাজারে উদ্বৃত্ত আলু থাকলেও সিন্ডিকেটের কারসাজিতে ৮০ টাকায় উঠেছে এই পণ্যটির দাম। এখন নতুন আলু বাজারে উঠলেও দাম কমার কোনো লক্ষণ নেই।

চলতি বছর পেঁয়াজের ডাবল সেঞ্চুরি দেখেছে দেশের মানুষ। ৮ ডিসেম্বর সকালে যে পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল, সন্ধ্যা পেরোতেই তার দাম দুই শ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করছে—এই এক খবরে বিক্রেতারা পেঁয়াজের দাম বাড়িয়ে দেন। সরকারি হিসাব বলছে, বছরের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে ১৯৩ শতাংশ।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (বাজার সংযোগ-১) প্রণব কুমার সাহা বলেন, কিছু পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের ভূমিকা থাকতে পারে। যেমন, ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করবে, এ খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকা বেড়ে গেল। আমরা ধারণা করি এ সব ক্ষেত্রে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট থাকতে পারে। 

ভরা মৌসুমে আলুর দামের রেকর্ড সম্পর্কে তিনি বলেন, বেশি দাম পাওয়ার আশায় অনেকেই খেত থেকে আগাম আলু তুলেছিল। সেটা বেশি দামে বাজারে বিক্রি হয়েছে। তা ছাড়া এবার বীজের দামও একটু বেশি ছিল। পণ্য পরিবহনের খরচও কিছুটা বেড়েছে। তবে এক বছরের ব্যবধানে আলুর দাম ২০-২৫ টাকা থেকে ৮০ টাকায় উঠে যাওয়াটা অস্বাভাবিক।

চিনি নিয়ে ছিনিমিনি নতুন নয়। তবে এবারের মাত্রাটা ছিল নতুন। জুন মাসে বাজার থেকে উধাও হয়ে যায় প্যাকেটজাত চিনি। সংকট দেখা দেয় খোলা চিনিরও। প্রতি কেজি চিনির দাম ১৫০ টাকায় গিয়ে ঠেকে। অথচ তখন সরকার-নির্ধারিত দাম ছিল ১২০ থেকে ১২৫ টাকা। বছরের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে ২৬ শতাংশ।

মাছ-মাংসের নাগাল ছুঁতে না পারা স্বল্প আয়ের মানুষ সবজিতেই শেষ ভরসাটা খুঁজে নিত। এ বছর সবজির বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির ছোঁয়া লেগেছে। বছরজুড়ে বাড়তি ছিল সবজির দাম। এখন শীতকাল, সবজির ভরা মৌসুম। কিন্তু দাম কমছে না। শিম, টমেটো ৭০-১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একটি মাঝারি সাইজের ফুলকপির দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা, যা অন্যান্য বছর এই সময় ২০ থেকে ২৫ টাকায় নেমে আসে। 
চালের দামও বেড়েছে চলতি বছর। গত বছর ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে মোটা চালের দাম ছিল কেজি ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা। এ বছর সেটা ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় পৌঁছেছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ‘করোনার ধাক্কা, ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, ডলার-সংকটসহ নানা কারণে গত বছর থেকেই নিত্যপণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি শুরু হয়। এ বছর সারা বিশ্বে অনেক পণ্যের দাম কমতে শুরু করলেও আমরা সেটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। মুদ্রাস্ফীতির লাগাম টানা না গেলে বাজার মনিটরিং, পণ্যের দাম বেঁধে দেওয়া—এসব করে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *