ফিরে দেখা-মার্কিন অস্বস্তিতে বছর পার

মতামত

মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে দুই বছর আগে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি বিরক্ত হতে শুরু করেছিলেন কেউ কেউ। দেশটির রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার হাস ঢাকায় পৌঁছান ২০২২ সালের মার্চের প্রথম দিন। নিষেধাজ্ঞায় তৈরি হওয়া উদ্বেগ তখনো থিতিয়ে আসেনি। তারপরও নানা উপায়ে তাঁকে অভিনন্দন জানানোর চেষ্টায় পিছিয়ে থাকার ঝুঁকি নেননি অনেকে। যেখানেই গেছেন, প্রায় সবার আগ্রহের কেন্দ্রে ছিলেন অনেকের কাছে শান-শওকতের দেশটির এই প্রতিনিধি।

দেশের কূটনীতিকেরা বলছেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত মে মাসে আমেরিকা ভিসা নিষেধাজ্ঞার কথা বলার পরপরই অস্বস্তির মাত্রা বেড়ে যায়। মাস চারেকের মধ্যেই গত সেপ্টেম্বরে ভিসা নীতি কার্যকর করার পর এই অস্বস্তি আরও গভীরতর হতে থাকে। আর নভেম্বরে বাংলাদেশকে উল্লেখ করে শ্রমনীতি ঘোষণার পর সম্পর্ক বলতে গেলে একেবারে তলানির দিকেই পৌঁছে যায়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সরকারের ওপরের দিককার অনেকেই প্রকাশ্যে দেশটির সমালোচনায় মুখর হয়ে ওঠেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য মনে করে, মার্কিনদের সঙ্গে সম্পর্কের এই বিষয়গুলো বৈশ্বিক, আঞ্চলিক রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সব সময় যেসব ঝুঁকি মোকাবিলা করে, সেগুলোর অংশমাত্র।

পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বড় ধরনের অর্থনৈতিক শক্তি না হওয়া, রপ্তানি পণ্য সীমিত হওয়া এবং জ্বালানির জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশকে অনেক ক্ষেত্রেই ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয়।’

চীন ও ভারতের উল্লেখ না করে গত বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশকে সবার সঙ্গেই কাজ করতে হয়, ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়।

পররাষ্ট্রসচিবের মতে, একেক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক একেক রকম। প্রতিটি দেশের অগ্রাধিকার ভিন্ন। কিন্তু কাউকে না খেপিয়ে বিষয়গুলো সামাল দেওয়ার জন্য কোনো জাদুমন্ত্র নেই। তাই সবার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, কারও কোনো উদ্বেগ থাকলে তা দেখা এবং নিজেদের বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলা—এগুলো নিয়মিত করা হচ্ছে।

মার্কিন ভিসা নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব বলেন, এই নিষেধাজ্ঞা প্রধানত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সরকার শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু কোনো ব্যক্তি সহিংসতায় জড়ানোর পর তাঁর ওপর নিষেধাজ্ঞা এলে তা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যাচ্ছে, এটা ভাবা ঠিক নয়। 
মার্কিনদের সঙ্গে অস্বস্তি ও টানাপোড়েনের মধ্যেও চলতি বছর বৈদেশিক সম্পর্কে কিছুটা স্বস্তি ছিল ইউরোপ ও জাপানের ক্ষেত্রে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ও রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের ঢাকা সফর, ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্লোবাল গেটওয়ে ফোরামে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া এবং তা থেকে প্রথমবারের মতো ৪০ কোটি ইউরো সহায়তা পাওয়াকে সাফল্য মনে করছেন এখানকার কূটনীতিকেরা।

দিল্লিতে নিযুক্ত ছিলেন এমন কয়েকজন কূটনীতিক বলছেন, ভারতের সঙ্গে অম্ল-মধুর সম্পর্কে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে পাশের দেশটি থেকে নিত্যপণ্য আসা বন্ধ হয়ে গেলে। পরপর দুই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ও নরেন্দ্র মোদির আশ্বাসে ভরসা কমিয়ে দেয় বিএসএফের গুলিতে সীমান্তে লাশ পড়লে। আর শেখ হাসিনা সরকারের জন্য রাজনৈতিক মাইনাস পয়েন্ট আছে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি ভাগাভাগির চুক্তি সই হওয়ার বিষয়টি ঝুলে থাকায়।

মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের দেশটিতে ফেরানোর ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগটি ঝুলে থাকা চীনের সঙ্গে সম্পর্কে একটি নেতিবাচক দিক মনে করেন স্থানীয় কূটনীতিকেরা। মিয়ানমারে চীন নিজের প্রভাব পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছে কি না, এমন প্রশ্নও উঠছে।

সরকার অবশ্য মনে করে, এসব ঝুটঝামেলা সামাল দিতে আগামী দিনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, জাপান, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত ও বহুমুখী করার ক্ষেত্রে জোর দেওয়ার বিকল্প নেই।

বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে প্রচলিত শ্রমবাজারের পাশাপাশি ইতালিসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে কর্মী যেতে শুরু করেছে। এ বছরের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত ১২ লাখ কর্মী গেছেন, যা গত বছর ছিল ১১ লাখ ৩৫ হাজার।

অবশ্য সাধারণ অদক্ষ কর্মীর বদলে সব দেশে দক্ষ কর্মী পাঠানোর ওপর জোর দেন পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন।

পররাষ্ট্রসচিব বলেন, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বর্তমানে অনুসৃত অনেক নীতি ও পন্থা ২০২৬ সালের পর আর তেমন কাজে না-ও আসতে পারে। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কৌশল বদলাতে হতে পারে।

কূটনীতিকেরা বলছেন, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কৌশলগত পর্যায়ে আছে। এখন ফ্রান্সসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশ, যুক্তরাজ্য, জাপান, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কে গুণগত পরিবর্তন আনায় নজর সরকারের।

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত কয়েকটি দেশ, যুক্তরাজ্য ও জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক কৌশলগত অথবা সমন্বিত সম্পর্কের পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা চলছে বলে জানান পররাষ্ট্রসচিব।

অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র থেকে মুখ ফিরিয়ে ইউরোপ, জাপান ও চীনমুখী হওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, তাতে কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে করেন না কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবির শুক্রবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, বর্তমানে দেশের যে কূটনৈতিক সক্ষমতা, তা দিয়ে এটা সম্ভব নয়।

চীন ও আমেরিকার মধ্যে বিভাজনের কূটনীতির দিকে না গিয়ে দেশের ভেতরে যে সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে, তা উত্তম পন্থায় সামাল দেওয়ার ওপর জোর দেন আমেরিকায় বাংলাদেশের সাবেক এই রাষ্ট্রদূত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *